আকবর ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন, তিনি দেখলেন সংখ্যা গরিষ্ঠ মোগলদের প্রচণ্ড আক্রমণে ধীরে ধীরে গুজরাটিরা পিছু হটছে এবং অনেকে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়ে আহমেদাবাদ এর প্রাচীরের নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছে। আকবর একদল পলায়নরত প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করতে চাইলেন কিন্তু তার হাঁপ ধরা স্ট্যালিয়নটি প্রথমে তেমন সাড়া দিলো না। সেই মুহূর্তে ফসলে জলসেচের নালা ঘোড়া সহ লাফিয়ে পার হওয়ার সময় এক গুজরাটির ঘোড়া ভেজা মাটিতে পিছলে পড়ে গেলো। ক্রমান্বয়ে আরো তিন জন ঘোড় সওয়ার প্রথম জনের পিছনে ধারাবাহিক ভাবে হোঁচট খেয়ে পড়লো। পড়ে যাওয়া একজন যোদ্ধা অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করলো কিন্তু গলায় আকবরের একজন দেহরক্ষীর তলোয়ারের কোপ খেয়ে নালার মধ্যে পড়ে গেলো। তার ক্ষত থেকে উৎক্ষিপ্ত লাল রক্ত নালার সবুজ পানিতে ছড়িয়ে পড়লো। বেশ কয়েকজন গুজরাটি তাদের ঘোড়ার গতি কমিয়ে ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে যাওয়া সঙ্গীদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলো। আকবর তাদের একজনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। নিজেদের জীবন বাঁচাও। আমার দেহরক্ষীরা তোমাদের ঘিরে ফেলেছে এবং উত্তম লড়াই এর পর আত্মসমর্পণ করার মাঝে কোনো লজ্জা নেই। আকবর প্রতিপক্ষের যোদ্ধাটিকে চিৎকার করে বললেন। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করতে করতে সে তার আশেপাশে থাকা অবশিষ্ট সঙ্গীদের পর্যবেক্ষণ করলো, তার গালে সৃষ্ট ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে-তারপর নিজের তলোয়ারটি হাত থেকে ফেলে দিলো। তার সঙ্গীরাও তাকে অনুসরণ করলো।
আকবরের রক্ষীরা যখন যুদ্ধবন্দীদের বাঁধছিলো তখন তিনি দেখলেন মোহাম্মদ বেগ কিছু সৈন্য নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁদের মধ্যে একজন সৈন্য একটি ছাই রঙের ঘোড়ার লাগাম ধরে রয়েছে। ঘোড়াটির পিঠে ছিপছিপে গড়নের একজন অল্পবয়সী তরুণ বসা। সে সাদা আলখাল্লার উপর চুনি খচিত বক্ষবর্ম পড়ে আছে। এটি ইত্তিমাদ খান জাঁহাপনা। আমরা তাকে তার মৃত ঘোড়ার পাশে শস্য ক্ষেতের মধ্যে লুকানো অবস্থায় আবিষ্কার করেছি। তার দেহরক্ষীরা তাকে ত্যাগ করে পালিয়েছে।
তুমি কি সত্যিই ইত্তিমাদ খান? আকবর জিজ্ঞেস করলেন।
জ্বী এবং আমি আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করছি, তরুণটি মাটির দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে বললো।
তুমি কি তোমার সৈন্যদের লড়াই বন্ধ করার আদেশ দিতে প্রস্তুত এবং আহমেদাবাদ সহ তোমার নিয়ন্ত্রিত গুজরাটের অন্যান্য অঞ্চল আমার অধীনে ছেড়ে দিতে রাজি আছো? যদি এতে সম্মত হও তাহলে তোমাকে এবং তোমার অধীনস্ত লোকদেরকে প্রাণে মারবো না এবং তোমার পছন্দ মতো গুজরাটের কোনো একটি ছোট রাজ্যে তোমাকে পুনর্বাসিত করবো।
ইত্তিমাদ খানের মসৃণ মুখে স্বস্তি ফিরে এলো। আমি স্বেচ্ছায় আপনার আদেশ পালন করবো। আপনি যদি আটককৃত, ঐ বন্দীদের কয়েকজনকে মুক্তি দেন তাহলে আমি তাঁদের দূত হিসেবে পাঠাতে পারি।
আকবরের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে তার কয়েকজন রক্ষী বন্দীদের মুক্ত করতে এগিয়ে গেলো কিন্তু তাদের বাধন খোলার আগেই ইত্তিমাদ খান আবার কথা বলে উঠলো। জাহাপনা, আপনাকে জানাতে চাই যে ক্যাম্বে ও সুরাত বন্দরের উপকূল এবং তাদের পশ্চাত্বর্তী অঞ্চল সমূহ আমার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। আমার বিদ্রোহী চাচাতো ভাই ইব্রাহিম হোসেন ঐ সব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। ইত্তিমাদ খান একটু থামলো, তারপর আবার নিচু স্বরে বলতে লাগলো, এছাড়াও আশঙ্কা করছি আমি আত্মসমর্পণের আদেশ দেয়া সত্ত্বেও আমার কতিপয় সেনাপতি হয়তো আমার হুকুম মানবে না।
আমি উপকূল এলাকার পরিস্থিতি জানি এবং শীঘ্রই সেখানে হামলা করে হিব্রাহিম হোসেনকে পরাস্ত করবো। আর তোমার সেনাপতিরা তোমার অদেশ পালন করলেই ভালো করবে। আমার পক্ষ থেকে তাদের কাছে নির্দেশ পাঠাও যে তারা একবার মাত্র আত্মসমর্পণের সুযোগ পাবে। এই সুযোগ যদি কাজে না লাগায় তাহলে নিশ্চিত ভাবে তারা মৃত্যুবরণ করবে। ইত্তিমাদ খান সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। আকবর ঘোড়া ঘুরিয়ে অন্য দিকে রওনা হলেন। ইত্তিমাদ খানের করুণ পরিণতি তাকে কিছুটা বিব্রত করেছে। আকবর অনুভব করছিলেন এমন লজ্জাকর পরিস্থিতির শিকার হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর মতো পর্যাপ্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট এবং শক্তি তার রয়েছে এবং এজন্য তিনি কৃতজ্ঞও বোধ করলেন। যখন তাঁর পুত্র এবং তাদের পুত্ররা আবুল ফজলের লিখিত ঘটনাপঞ্জি পাঠ করবে তখন তারা তার যুদ্ধাভিযানে এমন লজ্জাকর দুর্বলতা বা ব্যর্থতার নিদর্শন পাবে না, বরং তার বিজয় এবং ক্ষমতার প্রতিপত্তি প্রত্যক্ষ করে উল্লাসিত হবে।
*
সাগর তখন শান্ত, ছোট ছোট ঢেউ গুলি কমলা বর্ণের বালুতীরে ধীরে অছড়ে পড়ছে। সৈকত ঘিরে থাকা নারকেল গাছের পাতা মৃদুমন্দ উত্তরা বাতাসে দুলছে। আকবর দেখতে পাচ্ছিলেন সোয়া মাইল দূরে উপকূল রেখা বরাবর সাগরের দিকে বর্ধিত হয়ে থাকা উচ্চভূমিতে (শৈলান্তরীপ) অবস্থিত ছোট আকারের একটি দূর্গের ভিতরে এবং বাইরে ইব্রাহিম হোসেনের সৈন্যরা সন্নিবেশিত হচ্ছে। ঐ দূর্গটি সমুদ্র বা স্থলপথে ক্যাম্বেতে আগতদের প্রতিরোধ করার লক্ষে নির্মাণ করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি জাহাজ উচ্চভূমি সংলগ্ন বন্দরে নোঙর করা রয়েছে। আকবর আহমেদ খানের দিকে ফিরলেন। আপনি তো আমার বাবার সঙ্গে ক্যাম্বেতে এসেছিলেন, বলতে পারেন ঐ জাহাজ গুলো কিসের জন্য ওখানে নোঙর করা?
