জাঁহাপনা আপনি যখন গুজরাটের সমরাভিযান শেষ করে ফিরবেন ততোদিনে নতুন শহরের রক্ষাপ্রাচীরের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে, তুহিন দাশ আকবরকে বললো। আকবর, আবুল ফজল এবং তুহিন দাশকে নিয়ে ঘোড়ায় করে শিক্রির প্রতিরক্ষা প্রাচীর পরিদর্শন করছিলেন। বর্তমানে প্রাচীরটি ছয় ফুট উচ্চতায় পৌঁছেছে।
তোমার কথা তোমাকে রক্ষা করতে হবে, আকবর উত্তর দিলেন। আমার যুদ্ধাভিযান বেশি দীর্ঘ হবে না। আহমেদ খান এবং অন্যান্য সেনাপতিদের সাথে নিয়ে আমার পিতা প্রায় চল্লিশ বছর আগে গুজরাট জয় করেছিলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। শেরশাহ্ বলপূর্বক আমার পিতাকে গুজরাটের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করেছিলো। এইবার আমি গুজরাট জয় করার পর তা চিরকাল মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকবে।
ক্যাম্বে এবং সুরাত দিয়ে যে সব তীর্থযাত্রী আরবের উদ্দেশ্যে পবিত্র ধর্মযাত্রা করেন তারা যদি যাত্রা পথে নিরাপত্তা লাভ করেন, তাহলে তারা ব্যাপক ভাবে আপনার প্রশংসা করবেন জাহাপনা। গুজরাটের রাজ পরিবার গুলির অন্তঃকলহের ফলে সেখানে আইন-শৃক্ষলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে তার কারণে ভ্রমণকারীদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে, আবুল ফজল সুললিত কণ্ঠে বলে উঠলো। গুজরাজ আবার মোগলদের নিয়ন্ত্রণে এলে এর বন্দরগুলি থেকে যে কর আদায় হবে, আমি নিশ্চিত তা আমাদের রাজস্ব আয়ের একটি বিরাট অংশ পূরণ করবে।
তুমি ঠিকই বলেছো আবুল ফজল। গুজরাজ এখনোও একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। আমার ইচ্ছা শিক্রির অলংকরণের জন্য সেখান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ যুদ্ধ লুষ্ঠিত মালামাল নিয়ে আসা।
কথা শেষ করে আকবর সেখানে তুহিন দাশ ও আবুল ফজলকে রেখে ঘোড়া ছুটিয়ে মালভূমি পেরিয়ে নিচের সমতল ভূমির দিকে রওনা হলেন। সেখানে তার সৈন্যরা শিবির স্থাপন করেছে। আকবর যখন সেদিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন তিনি অনুশীলনরত সৈন্যদের গাদাবন্দুকের গুলিবর্ষনের ধোয়া দেখতে পেলেন। আরেক দিকে গোলন্দাজবাহিনী নতুন তৈরি করা ব্রোঞ্জের কামানের ধ্বংস ক্ষমতা পরীক্ষা করছিলো। আকবরের নিজের কারখানায় কামানগুলি নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন আবিষ্কার থেকে বেশি সুবিধা লাভের জন্য তিনি পরীক্ষামূলক ভাবে এমন বিশাল নলের কামান তৈরি করিয়েছেন যে আহমেদ খানের ধারণা সেটা স্থানান্তর করতে একহাজার ষাঁড় দরকার হবে। যদিও আকবর জানতেন আহমেদ খান বাড়িয়ে বলছেন তারপরও তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গুজরাট অভিযানে এই দানবাকৃতির অস্ত্রগুলি না নেয়ার। কারণ তাঁর ধারণা, অবরোধ সৃষ্টি করার বহু সময় পরেও দেখা যাবে ঐ অস্ত্র যথাস্থানে স্থাপন করে কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
আকবর দেখলেন আহমেদ খান এবং মোহাম্মদ বেগ একটি তাবুর পাশে দাঁড়িয়ে পরস্পরের সঙ্গে তর্ক করছে। আকবরকে ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসতে দেখে উভয়ে কুর্ণিশ করলো।
আপনারা দুজন কি বিষয়ে তর্ক করছেন?
যুদ্ধ যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ এবং শস্য সংগ্রহের সময় নিয়ে জাহাপনা, আহমেদ খান বললেন।
আমি এক মাস দেরি করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম জাঁহাপনা, মোহাম্মদ বেগ বললেন, এই সময়ের মধ্যে আমরা যাতে পর্যাপ্ত শস্য সংগ্রহ করতে পারি।
কিন্তু জাহাপনা, আমার বক্তব্য হলো-আমরা যদি কম মালামাল নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হতে পারি তাহলে আমাদের অপেক্ষাকৃত কম রসদ প্রয়োজন হবে। আবার অন্যদিকে গুজরাটের রাজপরিবারের ভিন্নমতাবলম্বী সদস্যরা বিশেষ করে মির্জা মুকিম এর উপর আমরা নির্ভর করতে পারি প্রয়োজনীয় রসদের জন্য।
আমি আপনার সঙ্গে একমত আহমেদ খান, আকবর বললেন। যুবরাজ মুকিম আমার হস্তক্ষেপ কামনা করে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তার জন্য আমাদের গুজরাট আক্রমণ অধিক বৈধতা লাভ করবে এবং তার কাছ থেকে আমি সৈন্য ও রসদ সহায়তা নেবো। সেক্ষেত্রে আমরা কবে রওনা হতে পারি?
এক সপ্তাহের মধ্যেই জাহাপনা, মোহাম্মদ বেগ বললেন।
ঠিক আছে, তাহলে আমরা এক সপ্তাহের মধ্যেই রওনা হচ্ছি।
*
জাহাপনা, আপনি কি দিগন্তের ঐ ধূলার মেঘ দেখতে পাচ্ছেন? নিশ্চয়ই বহু সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে যাত্রা করেছে, আকবর এবং আহমেদ খান একদল অগ্রবর্তী সৈন্য নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তারা গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরের কাছাকাছি অবস্থিত পাকতে থাকা শস্যের মাঠ অতিক্রম করছেন। আকবর তার ধাতব দস্তানা পরিহিত হাতের সাহায্যে চোখের উপর ছায়া সৃষ্টি করে ধূলার তরঙ্গের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালেন। ওটা নিশ্চয়ই গুজরাটের স্বঘোষিত শাহ্ ইত্তিমাদ খানের বাহিনী। মির্জা মুকিমের অনুমানই সঠিক। তার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সে বলেছিলো আকবর যদি দ্রুত অগ্রসর হোন তাহলে আহমেদাবাদের কাছে মোগল বাহিনী ইত্তিমাদ খানের মুখোমুখী হতে পারে। আমি নিশ্চিত ওটা ইত্তিমাদ খানের বাহিনী। যদি তাই হয়, তহলে আমরা ওদের চমকে দেয়ার সুবিধা পাবো।
আমরা শীঘ্রই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারবো জাঁহাপনা। আমি কি আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আদেশ দেবো?
নিশ্চয়ই।
কয়েক মিনিট পর কালো স্ট্যালিয়নের পিঠে সওয়ার আকবর একদল ঘনবিন্যস্ত সৈন্যকে নেতৃত্ব দান করে পাকা ফসলের ক্ষেত মাড়িয়ে ধূলি মেঘের দিকে অগ্রসর হলেন। আকবরের মাথায় ময়ূর পুচ্ছ যুক্ত গম্বুজাকৃতির শিরোস্ত্রাণ, দেহে সোনার পাত মোড়া বক্ষবর্ম এবং হাতে উন্মুক্ত তলোয়ার আলমগীর। তার ঠিক পেছনেই দুইজন কোৰ্চি সবুজ মোগল পতাকা বহন করছে ঘোড়ায় চড়ে। তাঁদের ঘোড়ার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে গুজরাটি অশ্বারোহীদের অবয়ব অধিক স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আকবর পরিষ্কার বুঝতে পারলেন যে শত্রুপক্ষ তাঁর বাহিনীকে চিনতে পেরেছে এবং পিছিয়ে গিয়ে আহমেদাবাদ এর প্রাচীরের আড়ালে আশ্রয় নেয়ার পরিবর্তে তারা সোজা তদের দিকে ধেয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ ছাপিয়ে আকবর চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলেন, ওরা সংখ্যায় কতো জন হবে আহমেদ খান?
