অন্য কোনো রাজা বা সম্রাটের এমন নকশার ভবন বা কক্ষ নেই জাহাপনা। এটা সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব পরিকল্পনা। আপনি কি এতে সন্তুষ্ট?
বোধহয় আমি সন্তুষ্ট…কিন্তু কেন্দ্রস্থলের এই স্তম্ভটি, মনে হয় এটি কাঠ দিয়ে তৈরি করা হবে এবং সেটা চন্দন কাঠ?
না জাহাপনা। সেতুগুলির ভার সহ্য করার জন্য আমাদেরকে এটি বালুপাথর দিয়ে তৈরি করতে হবে।
অসম্ভব! এর নকশা অত্যন্ত জটিল।
আমার ভিন্ন মতের জন্য দুঃখিত জাঁহাপনা, কিন্তু আমি নিশ্চিত ভাবে জানি এই জটিল নকশা বালুপাথর দিয়েই তৈরি করা সম্ভব। হিন্দুস্তানের কারিগররা এতোই দক্ষ যে তারা বালুপাথরকে কাঠের মতোই কেটে বা খোদাই করে নকশা সৃষ্টি করতে পারবে-কোনো নকশাই তাঁদের জন্য কঠিন নয়।
তোমার কারিগররা যদি সত্যিই তা করতে পারে তাহলে সমগ্র রাজপ্রাসাদের প্রতিটি স্তম্ভ, ঝুলবারান্দা, জানালা এবং প্রবেশ পথ বালুপাথর (স্যাণ্ডস্টোন) দিয়ে তৈরি করা হোক। আমরা এমন একটি গোলাপ লাল শহর তৈরি করবো যা সমগ্র জগতের মাঝে একটি বিস্ময় হয়ে থাকবে… মনের দৃষ্টিতে ইতোমধ্যেই আকবর তার নতুন রাজধানী দেখতে পাচ্ছিলেন, একটি গহনার বাক্সের মতোই সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত, বালুপাথরের সুদৃঢ় গাঁথুনীতে বলিষ্ঠ। এটি কেবল শেখ সেলিম চিশতির উপযুক্ত শ্রদ্ধার্ঘই হবে না বরং মোগল শ্রেষ্ঠত্বের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেও অমর হয়ে থাকবে।
*
তুহিন দাশকে আকবর শিক্রির নির্মাণ কাজের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেও নিযুক্ত করেছেন। সে জানিয়েছে ইতোমধ্যেই ত্রিশ হাজার নির্মাণ শ্রমিক সেখানে কাজ করছে এবং এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। প্রতিদিন জ্বলন্ত সূর্যের নিচে অসংখ্য পুরুষ এবং কতিপয় নারীর লম্বা রেখা মালভূমি পর্যন্ত প্রসারিত বিশেষভাবে তৈরি মাটির রাস্তা দিয়ে প্রয়োজনীয় মালালাম চূড়ায় নিয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন বর্জ ও পাথরকুচি ঝুড়িতে করে মাথায় নিয়ে নেমে আসছে। দূর থেকে তাঁদের দেখতে অনেকটা পিঁপড়ের সারির মতো লাগে যারা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অন্তহীন ধৈর্য এবং পরিশ্রমের সঙ্গে চলমান। তাঁদের পরিধানে অপ্রতুল পোষাক-পুরুষদের পরনে ময়লা ধূতি অথবা নেংটি এবং মহিলাদের পরনে সুতির শাড়ি। কোনো কোনো মহিলার পিঠে আবার তাঁদের দুগ্ধপোষ্য শিশু ঝুলিয়ে বাঁধা রয়েছে। মেটেবর্ণের বস্ত র আচ্ছাদনের নিচে পাতা মাদুরে রাতে তাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা এবং সেখানেই তারা ঘুঁটে দিয়ে ডাল, সজি এবং হাতে বানানো চ্যাপ্টা গোলাকৃতির রুটি বানিয়ে আহার করে।
আকবর যখন ঘোড়ায় চড়ে নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করছিলেন তখন তাঁর মনে হলো এ যেনো তাঁর নেতৃত্বাধীন একটি ভিন্ন ধরনের সেনাবাহিনীর যুদ্ধরত অবস্থা। তিনি তুহিন দাশকে নিয়ে প্রায়ই নির্মাণ কর্ম পরিদর্শনে আসেন। তুহিন দাশ সন্তুষ্টিপূর্ণ দৃষ্টিতে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছিলো। দেখুন জাঁহাপনা ইতোমধ্যেই কতোটা অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ভূমি সমতল করা শেষ এখন তা ভবন নির্মাণের জন্য প্রস্তুত। শীঘ্রই আমরা প্রথমিক ভিত্তিপ্রস্তর গুলি খুড়তে পারবো।
আর বালুপাথর আহরণের কাজের অগ্রগতি কতোটা?
দুইহাজার অমসৃণ প্রস্তর খণ্ড ইতোমধ্যেই কাটা সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে সেগুলি বলদটানা গাড়িতে করে এখানে নিয়ে আসা শুরু হবে। তারপর এখানে কারিগররা সেগুলিকে আকৃতি প্রদানের কাজ শুরু করবে।
আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এসেছে যার ফলে কাজের গতি আরো দ্রুততর হবে। আমাদের হাতে সব নির্মিতব্য ভবনের বিস্তারিত নকশা রয়েছে। তাই পাথর সংগ্রহের স্থানেই প্রধান খণ্ডগুলি কেটে প্রতিটি ভবনের আকৃতি প্রদান করা যায়। তারপর সেগুলিকে শিক্রিতে এনে যথাস্থানে জুড়ে দিলেই হবে।
চমৎকার বুদ্ধি জাহাপনা। এর ফলে ভবনগুলি অল্প সময়ের মধ্যে সন্নিবেশিত করা সম্ভব হবে এবং নির্মাণ এলাকার হট্টগোল ও ভিড় হ্রাস পাবে।
আমি চাই সকল শ্রমিককে উত্তম পারিশ্রমিক দেয়া হোক। ঘোষণা দাও আমি তাদের দৈনিক মজুরী দ্বিগুণ করে দিচ্ছি এবং কাজ যদি ভালো গতিতে আগায় তাহলে সপ্তাহে একদিন রাজশস্যভাণ্ডার থেকে তাদের বিনামূল্যে শস্য সরবরাহ করা হবে। আমি চাই প্রতিদিন শ্রমিকরা চাঙ্গা ভাব নিয়ে কাজে যোগ দিক এবং আমি আরেকটি উত্তম উদাহরণ সৃষ্টি করতে চাই।
কীভাবে জাঁহাপনা?
আমাকে পাথর সংগ্রহের স্থানে নিয়ে চলল। আমার প্রজাদের সঙ্গে আমি পাথর কাটতে চাই এবং তাঁদের দেখাতে চাই যে তাঁদের সম্রাট কঠোর শারীরিক পরিশ্রমকে ভয় করেন না।
দুই ঘন্টা পরের ঘটনা। আকবরের নগ্ন গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। তিনি দৃঢ় মনোযোগের সঙ্গে পথরের উপর গাঁইতি চালাচ্ছিলেন। ঠিক লড়াই এর সময় তিনি যেমন করে যুদ্ধকুঠার বা বর্শা চালান তেমনি অব্যর্থ লক্ষে গাইতির চোখা অগ্রভাগ পাথরের সঠিক অবস্থানে আঘাত হানছিলো। সেটা ছিলো প্রচণ্ড দৈহিক শক্তির কাজ। আগামীকাল তার শরীরের পেশীগুলি তেমনই আড়ষ্ট হয়ে পড়বে যেমনটা হয়ে থাকে যুদ্ধের কঠিন লাড়ই এর পর। কিন্তু কদাচিৎ তিনি এমন আনন্দবোধ করেন। নিয়তি তাঁর জন্য অনেক মহান কর্ম নির্ধারণ করে রেখেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে একজন সাধারণ মজুরের মতো কঠোর পরিশ্রম করতে তাঁর মোটেই খারাপ লাগছিলো না, যৌবনের শক্তিতে গৌরবান্বিত এবং ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা মুক্ত হয়ে।
২.৩ ধূসর সাগর
১১. ধূসর সাগর
