এটা হেরেম সারা-আপনার নির্দেশ অনুযায়ী পাঁচশো নারী যাতে তাদের পরিচারিকাদের নিয়ে আরামে বসবাস করতে পারে তেমন বড় করে এর কাঠামো অঙ্কিত হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশেরই এই প্রাসাদে কক্ষ থাকবে, এর নাম পাঁচমহল। তুহিন দাশ একটি উঁচু পাঁচতলা ভবনের নকশা আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন। আমি পারস্য ভ্রমণের সময় যে সব ভবন দেখেছি তার অনুকরণে এর নমুনা তৈরি করেছি। পারসিকরা অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে ভবন গুলিতে ঠাণ্ডা বায়ু প্রবাহের জন্য জাফরি এবং সুরঙ্গের ব্যবস্থা রেখেছে এবং আমিও এই ভবনটিতে একই ব্যবস্থা রেখেছি। আমি এই প্রাসাদের সৌন্দর্যের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছি-এই দেখুন, প্রতিটি তলা কেমন সরু স্তম্ভের উপর ভর করে আছে। একদম উপরের তলায় অঙ্কিত হয়েছে হাওয়া মহল-এখানে গম্বুজ আকারের আচ্ছাদনের নিচে প্রচুর হাওয়া বাতাসের মধ্যে মহিলারা বসে সময় কাটাতে পারবে।
ভালো, আকবর বললেন। তাঁর স্ত্রী এবং রক্ষিতাঁদের উপযুক্ত বিলাসিতার ব্যবস্থা থাকা উচিত। সংখ্যায় ক্রমবর্ধমান রক্ষিতাদের মধ্যে এখনোও তিনি মায়ালার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, কামনার চেয়ে এতোদিনের ভালোবাসাই বোধহয় এর কারণ। যদিও অন্যরা আরো অধিক দৈহিক আকাক্ষা সৃষ্টি করতে পারছে। নবাগত একটি রুশ দেশীয় মেয়ে-যাকে এক ধনী মোগল সওদাগর উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে-মেয়েটি তার নীলা সদৃশ চোখ, ফ্যাকাশে চামড়া এবং সূর্যালোকের বর্ণে বর্ণিল চুল নিয়ে ইদানিং আকবরের অধিক মুনোযোগ কাড়ছিলো।
এই যে ভবনগুলির নকশা দেখছেন, এগুলি আপনার মাতা, ফুফু এবং প্রধান স্ত্রীদের জন্য নির্ধারণ করেছি জাঁহাপনা।
আকবর তুহিন দাশের অঙ্কিত কতিপয় অভিজাত প্রাসাদের নকশার উপর চোখ বুলালেন। রানী হীরাবাঈ এর জন্য তুমি কোনো প্রসাদটি প্রস্তাব করছো?
এটি জাহাপনা। দেখুন, এর ছাদের উপর একটি ছত্রী রয়েছে যেখানে তিনি চাঁদ দেখার জন্য যেতে পারবেন এবং পূজা অর্চনাও করতে পারবেন।
আকবর সতর্কতার সঙ্গে নকশাটি দেখলেন। যদিও তিনি কদাচিৎ হীরাবাঈ এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তবুও প্রথম স্ত্রী এবং বড় ছেলের মা হিসেবে তার উপযুক্ত মর্যাদা প্রদানের দিকে তার মনোযোগ ছিলো।
চমৎকার! কিন্তু আমার প্রাসাদ কোনটি?
এই যে, হেরেমের পাশেই এর অবস্থান। এটি ছাদ বিশিষ্ট হাঁটাপথ এবং ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গের মাধ্যমে হেরেমের সঙ্গে যুক্ত। আপনার প্রাসাদের সম্মুখের বিশাল উঠানটিতে থাকছে অনুপ তালাও বা অতুলনীয় জলকুণ্ড। এটি বার ফুট গভীর এবং হ্রদের সঙ্গে একাধিক জলনালী দ্বারা সংযুক্ত, ফলে সর্বদা আপনি জল প্রবাহের সতেজ কলধ্বনি শুনতে পাবেন।
সমগ্র শহরে সরবরাহ করার মতো যথেষ্ট পানি হ্রদটিতে থাকবে, এ বিষয়ে তুমি কি নিশ্চিত?
প্রকৌশলীরা এ বিষয়ে আমাদের ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেছে জাহাপনা।
এটা কি? আকবর তার প্রস্তাবিত প্রাসাদের একপাশে বেশ বড় জায়গা নিয়ে তৈরি একটি আয়তক্ষেত্রাকার আকৃতি সামান্য বিভ্রান্তি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
এটা আপনার ব্যক্তিগত চত্বর জাঁহাপনা, তবে এর মেঝে সাধারণ পাথরের বর্গাকার খণ্ড বিছিয়ে তৈরি না করে দাবার ছকের মতো করে তৈরি করার প্রস্তাব করছি আমি। আপনি এবং আপনার সভাসদগণ এখানে বিশাল আকৃতির ঘুটি বসিয়ে দাবা খেলতে পারবেন অথবা বিশ্রাম নিতে পারবেন। চমৎকার। তুমি ব্যাপক উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছো তুহিন দাশ। আর এটা কি?
আমি এর নাম দিয়েছি দেওয়ান-ই-খাস, আপনার ব্যক্তিগত সভার স্থান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি দ্বিতল বিশিষ্ট ভবন কিন্তু বাস্তবে এটি একটি কক্ষ। মোহন তোমার অঙ্কন করা অভ্যন্তরীণ নকশাটা দেখাও।
এখন মোহনকে খানিকটা আত্মবিশ্বাসী মনে হলো। সে তার বাম কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ থেকে একটি কাগজের পাতা বের করে টেবিলের উপর মেলে ধরলো। আকবর সেখানে অঙ্কিত একটি উঁচু ছাদ বিশিষ্ট কক্ষ দেখতে পেলেন যার ঠিক মধ্যখানে করুকার্যখচিত স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভটির নিম্নাংশ সরু কিন্তু সেটা উপর দিকে প্রসারিত হয়ে বৃত্তাকার ঝুলবারান্দার ভর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে এবং ঝুলবারান্দার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কক্ষের চার দিকে প্রসারিত চারটি সেতু। সত্যিই আকর্ষণীয়, কিন্তু এটা কি ধরনের ঘর?
আমি ঠিক বুঝলাম না। অতো উঁচুতে অবস্থিত বরান্দা কি কাজে আসবে?
ঐ বারান্দায় সিংহাসনে বসে আপনি প্রজাদের বক্তব্য শ্রবণ করবেন জাহাপনা। আর আপনার সাম্রাজ্য যেহেতু পৃথিবীর একচতুর্থাংশ ভূখণ্ডে প্রসারিত তাই এই বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে সেতু চারটি স্থাপন করা হয়েছে। যে কেউ আপনার কাছে বক্তব্য পেশ করতে চাইবে সে ঐ সেতুগুলির একটি দিয়ে আপনার কাছে অগ্রসর হবে। বাকি সভাসদরা নিচে অবস্থান করে সবকিছু দেখবে ও শুনবে।
আকবর একাগ্রচিত্তে নকশাটি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। তিনি আশা করেছিলেন তুহিন দাশ সম্রাটের উপযুক্ত একটি সাধারণ সভা কক্ষের পরিকল্পনা করবে কিন্তু সে তার নিজের অবস্থানকে অতিক্রম করে গেছে। যতোই তিনি নকশাটি পাঠ করলেন এবং সেটার তাৎপর্য অনুধাবন করলেন ততোই বেশি তিনি সেটা পছন্দ করলেন।
তুমি এই ধারণা কোথায় পেলে? পারস্যের শাহ এর কি এমন কোনো স্থাপনা রয়েছে?
