নিশ্চয়ই জাহাপনা। আল্লাহ্ তাঁর ঐশ্বরিক আলো আপনার উপর বর্ষণ করেছেন।
শিশুদের গাড়িটা উঠানের অন্য প্রান্তে পৌঁছে থেমে গেছে এবং মুরাদ সেটায় চড়ার চেষ্টা করছে, সন্দেহ নেই এবার তার পালা। সেই মুহূর্তে সুফির সতর্কবাণীর কথা মনে পড়তেই আকবরের পরিতৃপ্তভাব বাধাগ্রস্ত হলো। তাদেরকে একাগ্রচিত্তে পর্যবেক্ষণ করতে করতে আকবর ভাবলেন তাঁকে তাদের শিক্ষার জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে এবং তাঁদের মধ্যে হিংসা বা বৈরিতার কোনো লক্ষণ দেখা যায় কি না সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু দেখা গেলো সেলিম হাসতে হাসতে মুরাদকে গাড়িতে বসার জায়গা ছেড়ে দিলো। তারা এখনো অনেক ছোট….তিনি বোকার মতো চিন্তা করছেন। তার ভাবনার অবকাশ সৃষ্ঠি হতে এখনো বহু বছর বাকি আছে- যদিওবা কোনো দুশ্চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি হয়। তিনি তাদের কাছে এগিয়ে যেতে নিলেন কিন্তু সেই সময় কোৰ্চি তাঁর দিকে এগিয়ে এলো।
জাহাপনা, শিক্রির নির্মাণ পরিকল্পনা আলোচনা করতে স্থপতিরা এসেছেন।
চমৎকার। আমি এখনই আসছি। তুমিও আমার সঙ্গে এসো আবুল ফজল। আমি চাই এই প্রকল্পের সবকিছু তুমি জানো। শেখ সেলিম চিশতিকে দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী আমি শিক্রিতে একটি নতুন রাজধানী নির্মাণ করতে যাচ্ছি, এই সুফি সাধক আমার তিন পুত্রের জন্মের ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন। স্থাপত্যশিল্পের প্রতি আপনার আগ্রহের কথা সর্বজনবিদিত জাহাপনা। দিল্লীতে আপনার পিতার সমাধিটি সারা হিন্দুস্থানের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ স্থাপনা।
এই প্রথম বারের মতো আবুল ফজল বাড়িয়ে বলছিলো না। আকবর ভাবলেন। বালুপাথর এবং মার্বেল পাথরে তৈরি হুমায়ূনের অষ্টভুজ সমাধিটি সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। এর দ্বিতল গম্বুজ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ রুচিশীল বিন্যাস সমরকন্দে অবস্থিত তৈমুরের সমাধির কথা মনে করিয়ে দেয়, যার অঙ্কন চিত্র আকবর দেখেছেন।
তোমাকে এর বিস্তারিত বিবরণ ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করতে হবে আবুল ফজল। শিক্রির গঠন শৈলী সবকিছু থেকে ভিন্ন মাত্রার হবে-এ পর্যন্ত আমার, আমার পিতার অথবা আমার পিতামহের দ্বারা হিন্দুস্তানে যা কিছু নির্মিত হয়েছে তার তুলনায়। আমি আমার হিন্দু প্রজাদের নির্মাণশৈলীতে শহরটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই জন্য আমি হিন্দু স্থপতিদের নির্বাচন করেছি। ইতোমধ্যে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আমি বহু ঘন্টা ব্যয় করেছি। নির্দেশনা পাওয়ার জন্য তাঁদের কাছে প্রাচীন অনেক গ্রন্থ রয়েছে যাতে সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। কীভাবে উত্তম ইট তৈরি করতে হয় তার থেকে শুরু করে স্থাপনার অবস্থান কেমন হলে এর অধিবাসীদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে, এর সবকিছু।
আকবরের সম্মেলন কক্ষে দুইজন স্থপতি অপেক্ষা করছিলো। তাঁদের একজন লম্বা এবং মধ্যবয়সী এবং অপরজন অনেক তরুণ এবং তার বগলে কিছু লম্বা আকারের পেচানো কাগজ দেখা যাচ্ছিলো। তারা আকবরকে কুর্ণিশ করলো। আকবর তাঁদের মধ্যে যে বয়োজ্যেষ্ঠ তাকে সম্বোধন করলেন। স্বাগতম তুহিন দাশ, তোমার পরিকল্পনা জানার জন্য আমি উদ্গ্রীব হয়ে আছি। তোমার ছেলের হাতের ঐ কাগজগুলিতে কি রয়েছে?
এগুলিতে কিছু প্রাথমিক অঙ্কন চিত্র রয়েছে জাঁহাপনা।
ওগুলি খুলে ধরো, আমি দেখতে চাই।
নিশ্চয়ই। মোহন, জাঁহাপনা যা বললেন করো।
আকবর অপেক্ষা করতে লাগলেন যখন মোহন টেবিলের উপর একটা একটা করে নকশা গুলি মেলে ধরে সেগুলির চারকোণায় পাথর চাপা দিতে লাগলো। তার আঙ্গুলের অগ্রভাগগুলি কালি মাখা এবং সেগুলি সম্ভবত উত্তেজনায় সামান্য কাঁপছিলো। মোহনের কাগজগুলি মেলে রাখার কাজ শেষ হওয়ার আগেই আকবর সাগ্রহে তার উপর ঝুঁকে পড়লেন। কাগজগুলি চতুর্ভুজ দাগ বিশিষ্ট যার বিভিন্ন অংশে স্থাপনাগুলি চিহ্নিত করা আছে।
জাহাপনা আমরা এই অঙ্কনটা দিয়ে শুরু করলে ভালো হয়। তুহিন দাশ সবচেয়ে বড় আকারের অঙ্কনটার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। এখানে আমি সমগ্র রাজপ্রাসাদের ভবনগুলির যৌগিক বিন্যাস অঙ্কন করেছি। আপনার নির্দেশ অনুযায়ী প্রধান শহরটিকে নিচে রেখে মালভূমির উপরে এর অবস্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এর তিন দিকে প্রাচীর থাকবে এবং উত্তর-পশ্চিম অংশে থাকবে বিশাল হ্রদ। এই হ্রদ শিক্রির নিরাপত্তাই শুধু রক্ষা করবে না বরং এর পানির চাহিদাও পূরণ করবে। আকবর সম্মতি সূচক মাথা নাড়লেন।
আমি প্রস্তাব করছি রাজপ্রাসাদ, মসজিদ এবং অন্য সকল ভবনগুলি অঙ্কিত ঢালের শীর্ষে অবস্থিত এই রেখা বরাবর নির্মাণ করা হোক যা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রসারিত। কিন্তু দয়া করে মনে রাখতে হবে জাহাপনা, যদিও আমরা আপনার ইচ্ছা বাস্তবায়নের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি তবুও এই অঙ্কনগুলি আমাদের প্রাথমিক ধারণার বাস্তবায়ন মাত্র।
এই নকশাটি আমাকে আরেকটু বুঝাও। আকবর বললেন।
রাজপ্রাসাদটি ধারাবাহিক ভাবে সংযুক্ত একাধিক উঠানের সংযোগে গঠিত হবে। আজ আমরা প্রসাদের প্রধান ভবন গুলির অঙ্কিত নকশা নিয়ে এসেছি। এগুলি আপনার পছন্দ হলে আপনাকে আরো স্পষ্ট ধারণা দেয়ার জন্য আমরা এদের কাঠের তৈরি ক্ষুদ্র সংস্করণ বানিয়ে আনবো।
এই জায়গাটা কি? আকবর অঙ্কন চিত্রের একটি বিশাল দেয়াল ঘেরা অংশ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
