সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থায় আমি যে সংস্কার করতে যাচ্ছি তার বিবরণ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তোমাকে লিপিবদ্ধ করতে হবে। ঘটনাপঞ্জি লিপিবদ্ধ করার একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো আমার উত্তরসূরিদের নির্দেশনা প্রদান করা।
নিশ্চয়ই জাঁহাপনা। তড়িৎ বেগে হাত নেড়ে আবুল ফজল একজন পরিচারককে ইঙ্গিত করলো। পরিচারকটি একটি উঁত কাঠের তৈরি ছোট আকারের ঢালু লেখার টেবিল তার সামনে রাখলো এবং কাগজ, কলম ও কালি সরবরাহ করলো।
তাহলে শুরু করা যাক। আকবর উঠে তার কক্ষের মধ্যে পায়চারী শুরু করলেন। আমি ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রথমত আমি আমার সকল কর্মকর্তাদের একটি মাত্র ক্রমবিভক্ত ধারায় সংগঠিত করতে চাই। তারা সেনাবাহিনীর সদস্য হোক বা না হোক প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্যের দলনেতা হিসেবে নিযুক্ত থাকবে। তোমাকে বিস্মিত দেখাচ্ছে আবুল ফজল, কিন্তু এমন বিশাল এবং অসম সাম্রাজ্যের জন্য আমাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। এমনকি এদের মধ্যে রাজকীয় রন্ধনশালার প্রধানও অন্তর্ভূক্ত হবে-সে ছয়শো সৈন্যের দলনেতা হিসেবে নিযুক্ত হবে। আমার উপদেষ্টা এবং ঘটনাপঞ্জিকার হিসেবে তুমি চার হাজার সৈন্যের দলনেতা হিসেবে নিযুক্ত হবে।
আবুল ফজলের মুখে সন্তুষ্টির হাসি দেখা গেলো এবং সে আবার নুয়ে লিখতে শুরু করলো যখন আকবর বলা শুরু করলেন। দ্বিতীয়ত আমার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত কিছু ভূমি রাজ সম্পত্তি হিসেবে অধিগ্রহণ করা হবে এবং আমার কর্মকর্তাগণ সেগুলির উপযুক্ত কর সংগ্রহ করে সরাসরি আমার কোষাগারে পাঠাবে। বাকি ভূখণ্ড একাধিক জায়গিরে বিভক্ত করা হবে-এবং সেগুলি আমার সভাসদ এবং সেনাপতিদের অধীনে শাসনের জন্য প্রদান করা হবে। সেখানকার কর আদায়ের দায়িত্ব তাঁদের এবং করের একটা অংশ তারা সিংহাসনের পক্ষে লড়তে আগ্রহী একটি সেনাবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাখতে পারে। এর ফলে যখন আমার যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন হবে তখন খুব কম সময়ের মধ্যে আমি একটি বৃহৎ আকারের সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী গঠন করতে পারবো।
জায়গিরের প্রশাসকরা কি তাদের সন্তানদের উক্ত জায়গির প্রদান করতে পারবে জাহাপনা?
না। তাদের মৃত্যু হলে জায়গির আমার তত্ত্বাবধানে ফেরত আসবে এবং আমার প্রমোদের ব্যয়ভার মেটানোর জন্য ব্যবহৃত হবে। আকবর থামলেন। আমার অধীনস্থ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সাম্রাজ্যের কর্মচারী(জায়গিরদার) হিসেবে নিযুক্ত হবে। গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের আমি জায়গির থেকে বিতাড়িত করবো এবং জায়গিরদারদের মৃত্যু হলে আমি সেই জায়গির বাজেয়াপ্ত করবো। এর ফলে আমার প্রশাসকরা আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে এবং আমার বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় করে বিদ্রোহ করতে পারবে না। আকবর থামলেন এবং কিছুক্ষণের জন্য কেবল আবুল ফজলের কলম চালানোর খস খস শব্দ শোনা গেলো। সব পরিস্কার ভাবে বুঝেছো? এতোক্ষণ যা বললোম তার সব কিছু ঠিক মতো লিখতে পেরেছো?
জ্বী জাহাপনা। আমি বিস্তারিত বিবরণ সহ সবকিছু অক্ষরে অক্ষরে লিপিবদ্ধ করেছি। যারা এই বিবরণী পাঠ করবে তারা আপনার মহান বিচক্ষণতা, অতুলনীয় দূরদৃষ্টি এবং সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পর্কে অধ্যয়ন করে সীমাহীন উপকার লাভ করবে।
আবুল ফজল এতো বেশি বকর বকর করে কেন? আকবর ভাবলেন। বোধহয় সে মনে করে লাগাতার চাটুকারীতা তার অধিক আস্থাভাজন হওয়ার একমাত্র পথ। পারসিকরা কি এরকম আচরণই করে? কিন্তু বৈরাম খান তো এমন ছিলেন না। তাঁর সাবেক অভিভাবকের স্মৃতি এবং তার প্রতি তাঁর আচরণের বিষয়টি এখনো তার জন্য বেদনাময় এবং আকবর জোর করে তাঁর মন থেকে এই চিন্তা সরিয়ে দিতে চাইলেন।
চলো আমরা বাইরে যাই। বাকি কথা আমরা সেখানে যেয়ে আলাপ করবো। আকবর তাঁর ব্যক্তিগত কক্ষ থেকে আবুল ফজলকে নিয়ে বাইরের উঠানে উপস্থিত হলেন। সেখানে তাঁর তিন পুত্র খেলা করছিলো। পাঁচ বছরের সেলিম একটি খেলনা গাড়িতে বসে ছিলো এবং তার থেকে এগারো মাসের ছোট মুরাদ গাড়িটা টানছিলো। অন্য জন দানিয়াল, তার বয়স সাড়ে তিন বছর। একটি নিম গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আকবর এবং আবুল ফজলের উপস্থিতি তারা টের পায়নি এবং খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলো। সেলিম দ্রুত বেড়ে উঠছিলো। তার দৈহিক গড়ন হীরাবাঈ এর মতো চিকন এবং ছিপছিপে। তার ঘন কালো চুল এবং লম্বা লম্বা চোখের পাপড়িও মায়ের মতোই। মুরাদ ওর কাছাকাছি লম্বা কিন্তু অধিক স্বাস্থ্যবান, অনেকটা আকবরের মতোই, কিন্তু জয়সলমিরের রাজপুত রাজকন্যা মায়ের মতো তামাটে চোখ তার। ছোট্ট দানিয়াল নাদুস নুদুস গড়নের, কিন্তু সে আকবর বা তার সুন্দরী পারসিক মায়ের চেহারা বা গড়ন পায়নি।
আকবর সন্তুষ্ট চিত্তে তাদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন যেমনটা তিনি সবসময় করে থাকেন। শেখ সেলিম চিশতি যেমন ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন তেমনটাই ঘটেছে, তিনি তিনটি বলিষ্ঠ পুত্র লাভ করেছেন। ওদেরকে দেখো আবুল ফজল, উত্তরসূরি হিসেবে ঐরকম তিনজন স্বাস্থ্যবান পুত্রের মতো সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপনের চেয়ে আমার সাম্রাজ্যের জন্য বেশি আর কি করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো? আল্লাহ্ আমার প্রতি অনেক সদয় হয়েছেন।
