সম্রাট এসেছেন! তার একজন রক্ষী চিৎকার করে জানান দিলো, যখন তারা আশ্রমের তোরণের সামনে উপস্থিত হলেন। অম্বর থেকে আগত কমলা পাগড়ি পরিহিত রাজপুত সৈন্যরা পাহারায় ছিলো। বর্তমান অবস্থায় তাদের রাজকন্যার নিরাপত্তা প্রদানের জন্য আকবর তাঁদের অনুমতি দিয়েছেন। সৈন্যরা সোজা হয়ে দাঁড়ালো এবং তাদের দলনেতা এগিয়ে এলো।
স্বাগতম জাহাপনা।
আকবর ঘোড়া থেকে নামলেন এবং নিজের কোর্চির দিকে লাগামটা ছুঁড়ে দিয়ে প্রবেশ পথ দিয়ে একটি স্বল্প আলোকিত উঠানের দিকে অগ্রসর হলেন। আবার কেউ চিৎকার করে ঘোষণা দিলো, সম্রাট এসেছেন! এবারে হীরাবাঈ এর একজন রাজপুত সেবিকা ছায়ার মধ্য থেকে প্রদীপ হাতে এগিয়ে এলো।
আমাকে আমার স্ত্রীর কাছে নিয়ে চলো।
হীরাবাঈ নীল রঙের তাকিয়ার ঠেস দিয়ে নিচু বিছানায় শুয়ে ছিলো। সেলিম তার বুকের দুধ পান করছিলো এবং আকবর হীরাবঈ এর চেহারায় এমন একটি তৃপ্তির ভাব লক্ষ্য করলেন যা তিনি আগে কখনোও প্রত্যক্ষ করেননি। সেটা এতোই অপ্রত্যাশিত যে তাকে তার কাছে অচেনা মনে হলো। কিন্তু যখন সে আকবরের দিকে তাকালো, তার চেহারা থেকে সেই পরিতৃপ্তির আভা অদৃশ্য হলো। আপনি কেনো এসেছেন? আপনারতো এখন ভোজ সভার অতিথিদের সঙ্গ দেয়ার কথা।
হঠাৎ আমার পুত্রের মুখ দেখতে ইচ্ছা হলো…এবং আমার স্ত্রীকে।
হীরাবাঈ কিছু বললো না, কিন্তু সেলিমকে স্তনের বোঁটা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তার পরিচারিকার কোলে দিলো। হঠাৎ দুধ পান করা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিশুটি কাঁদতে লাগলো, কিন্তু হীরাবাঈ ইঙ্গিতে তাকে আকবরের কাছে নিয়ে যেতে বললেন।
হীরাবাঈ, আমি শেষ বারের মতো তোমার কাছে আবেদন করতে এসেছি। জীবনের বাকি সময়টা সেলিম আমাদের মাঝে রক্ত-মাংসের সংযোগ সূত্র হয়ে থাকবে। আমরা কি অতীতকে ভুলে তার জন্য আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করতে পারি না? আমি চাই আমার বাকি সন্তানদেরও তুমি ধারণ করো যাতে পরবর্তী জীবনে তারা পরস্পরকে সহযোগীতা করতে পারে আপন ভাই হিসেবে।
আমার দায়িত্ব শেষ হয়েছে। আমি আপনাকে আগেই বলেছি আমাকে একা শান্তিতে থাকতে দিতে। আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন পুত্র সন্তান উপহার দিলে আপনি তা করবেন। আপনার বাকি সন্তানদের বাবা হওয়ার জন্য অন্য নারীদের গ্রহণ করুন।
সৎভাই থাকলে ভবিষ্যত সম্রাট হিসেবে সেলিমের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। সৎ ভাইরা তার প্রতি কম বিশ্বস্ত থাকবে। তুমি কি সেটা বিবেচনা করেছো? তোমার পুত্রের অবস্থান যথাসম্ভব শক্তিশালী করার জন্য তোমার কি কোনোই দায়বদ্ধতা নেই?
আমার পুত্রের শিরায় রাজপুত রক্ত প্রবাহিত। সে যে কোনো বিরোধীতা ধূলায় পদদলিত করবে। হীরাবাঈ চিবুক উঁচু করে বললো।
হীরাবাঈ এর এমন নিরুদ্বেগ একগুঁয়ে অহমিকা এবং দুনিয়া সম্পর্কে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী আকবরকে ভীষণ হতাশ করলো। একবার তার মনে হলো ভবিষ্যত সম্পর্কে সুফির নেতিবাচক অনুমানের কথা হীরাবাঈকে জানাবেন। কিন্তু তিনি অনুভব করলেন সে তাতে মতো পরিবর্তন করবে না। তবে তাই হোক, কিন্তু তিনি এমন মেয়ের কাছে তাঁর পুত্রের লালন পালনের ভার অর্পণ করবেন না।
ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু তুমি যা করতে চাচ্ছ তার একটি মূল্য তোমাকে দিতে হবে। তোমার যখন ইচ্ছা হবে তুমি সেলিমকে দেখতে পারবে, কিন্তু তাকে আমি আমার মায়ের তত্ত্বাবধানে রাখবো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মোগল যুবরাজরা তাদের আপন মায়ের বদলে বয়োজ্যষ্ঠ রাজমাতাদের তত্ত্বাবধানে লালিত হয়। আমার মা ওর জন্য একজন দুধ-মা নিযুক্ত করবেন যা মোগল রীতিরই অংশ। আমার পুত্র রাজপুত নয় বরং মোগল রাজপুত্র হিসেবে মানুষ হবে।
হীরাবাঈ আকবরের দিকে তাকালো। কিন্তু তার মাঝে কষ্টবোধ বা প্রতিবাদের কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না। সামান্য শক্ত হয়ে উঠা চোয়াল থেকেই তার একমাত্র প্রতিক্রিয়া বুঝা গেলো। আপনি সম্রাট। আপনার কথাই আইন। তার কণ্ঠস্বর কিছুটা উদ্ধত শোনালো। আকবর এসেছিলেন একটা শেষ চেষ্টা করতে যদিও তিনি আগেই অনুভব করেছিলেন হীরাবাঈ এর মনের বন্ধ দরজা কিছুতেই উন্মুক্ত করা সম্ভব নয়।
.
১০. জগতের একটি বিস্ময়
আপনি আমাকে ব্যাপক সম্মান প্রদান করলেন এবং আমার উপর অত্যন্ত বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করলেন জাহাপনা।
আমি জানি তুমি নিষ্ঠার সঙ্গে তোমার দায়িত্ব পালন করবে আবুল ফজল। আমি চাই আমার শাসন আমলের ঘটনাপঞ্জি পরবর্তী প্রজন্মগুলির জন্য অনুসরণীয় গ্রন্থ হয়ে থাকুক। এতে ভালো বা মন্দ সব ঘটনার সত্য বিবরণ তুমি লিপিবদ্ধ করবে। কখনোই আমার তোষামোদ করবে না।
আমি অকৃত্রিমতার ঘ্রাণযুক্ত কলম দিয়ে প্রতিটি শব্দ লিপিবদ্ধ করবো জাহাপনা।
আকবর তাঁর সদ্য নিয়োগকৃত প্রধান ঘটনাপঞ্জিলেখকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। যদিও তাঁর অন্য একাধিক অনুলেখক ছিলো তবুও তিনি এমন একজন লেখকের প্রয়োজন অনুভব করছিলেন যে তাঁর প্রদান করা বক্তব্যের চেয়েও বেশি কিছু লিখতে পারবে-যে বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাঁর রাজত্ব কালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সমূহ লিপিবদ্ধ করবে যখন তিনি বেঁচে থাকবেন না তখনো। আবুল ফজল একজন বৃষস্কন্ধ এবং বক্র পা বিশিষ্ট লোক এবং বয়সে তার চেয়ে সামান্য ছোট। তার পিতা শেখ মোবারক যিনি একজন ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিত, কয়েক বছর আগে পারস্য থেকে সপরিবারে মোগল রাজ দরবারে আগমন করেন। একজন উপদেষ্টা এবং রাজনীতিক বিশ্লেষক হিসেবে আবুল ফজলের দক্ষতা ইতোমধ্যেই আকবরের নজর কেড়েছে। কিন্তু তাঁর উজির জওহর এর সুপারিশে তিনি তাকে প্রধান ঘটনাপঞ্জিলেখকের পদে নিয়োগ করলেন। জওহর বলেছিলো যদিও আবুল ফজল একজন নিষ্ফল এবং নির্লজ্জ তোষামোদকারী তবুও তার মধ্যে চাতুর্য এবং বিশ্বস্ততা রয়েছে। ঘটনা সমূহের কেন্দ্রে অবস্থান করায় সে সেগুলিকে মহিমান্বিত করে তুলবে এবং তুলনামূলকভাবে সংযত এবং অবসরগামী লেখকদের চেয়ে কাজটি অধিক দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারবে। আবুল ফজলের পরিচ্ছন্নভাবে কামানেনা মুখের বিগলিত হাসি দেখে আকবর অনুমান করতে পারছিলেন এমন একটি আস্থানির্ভর কাজের দায়িত্ব পেয়ে সে কতোটা কৃতজ্ঞ বোধ করছে।
