তুমি যেতে পারো, আকবর পরিচারিকাটিকে আদেশ দিলেন। সে চলে যেতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সত্যিই কি তুমি মা হতে চলেছো?
হ্যাঁ। নিশ্চয়ই খাজানসারা আপনাকে এ কথা বলেছে।
আমি একজন সাধারণ স্বামীর মতো তোমার মুখ থেকেই সংবাদটি শুনতে চেয়েছিলাম। হীরাবাঈ-আমার ঔরসজাত সন্তান তোমার গর্ভে, হয়তো সে আগামী মোগল সম্রাট হবে। এই মুহূর্তে আমি কি এমন কিছুই করতে বা বলতে পারি না যাতে তুমি আমার প্রতি সদয় হতে পারো এবং নিজে খুশি হতে পারো?
একমাত্র অম্বরে আমাকে ফেরত পাঠালেই আমি খুশি হতে পারি, কিন্তু তা অসম্ভব।
শীঘ্রই তুমি একজন মা হবে। তোমার কাছে কি এর কোনো তাৎপর্য নেই? হীরাবাঈ ইতস্তত করলো। আমি সন্তানটিকে ভালোবাসবো কারণ তার শিরায় আমার স্বজাতীয়দের রক্তও প্রবাহিত হবে। কিন্তু আপনার প্রতি আমার যে ভালোবাসা নেই তার মিথ্যা অভিনয় আমি করতে পারবো না। আমি প্রার্থনা করি আপনি অন্য স্ত্রী গ্রহণ করে আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবেন।
আমাকে একটি সুস্থ্য পুত্র উপহার দাও, কথা দিচ্ছি তোমার সঙ্গে আর কোনো দিন আমি শোব না। হীরাবাঈ কিছু বললো না। আমি চাই আজ থেকে এক সপ্তাহ পর একটি ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য তুমি প্রস্তুত
আপনি আমাকে কোথায় পাঠাতে চান? প্রথম বারের মতো হীরাবাঈ এর শিথিল আচরণের মধ্যে খানিকটা উৎকণ্ঠার আভাস পাওয়া গেলো।
ভয়ের কিছু নেই। তোমাকে আমি একটি শুভ আশীর্বাদপূর্ণ স্থানে পাঠাতে চাই-শিক্রিতে। আমি তোমাকে আগে কথাটি বলিনি কারণ আমি জানি তুমি আমার ধর্মকে অবিশ্বাস করো, কিন্তু শিক্রিতে একজন মুসলিম সুফি বাস করেন। তিনি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে তুমি আমার জন্য একটি সন্তান ধারণ করবে এবং আমাকে বলেছিলেন তোমাকে সেখানকার একটি আশ্রমে পাঠাতে যেখানে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত তোমার পর্যাপ্ত যত্ন নেয়া হবে। আমার শ্রেষ্ঠ হেকিমদের তোমার সঙ্গে পাঠাবো এবং তুমি যে কয়জন ইচ্ছা পরিচারিকা সাথে নিতে পারো। সেখানকার আবহাওয়া খুবই ভালো-আগ্রার তুলনায় ঠাণ্ডা ও স্বাস্থ্যকর। এই সব সুবিধা তোমার এবং তোমার গর্ভের সন্তানের উপকারে আসবে। এছাড়া তুমি সেখানে তোমার ধর্মও চর্চা করতে পারবে।
হীরাবাঈ তার কোলের উপর ভাজ করে রাখা হাতের দিকে তাকালো। আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু হবে।
আমি কি তোমার ভাইকে খবরটা জানাবো?
হীরাবাঈ মাথা নাড়লো। সে আরো কিছু বলতে পারে এমন আশা করে আকবর কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করলেন। আমি সন্তানটিকে ভালোবাসবো, সে বলেছে, কিন্তু বাস্তবে কি তা হবে? সে যদি বাবাকে ঘৃণা করে তাহলে সন্তানটির জন্য তার কতোটুকু ভালোবাসা সৃষ্টি হতে পারে? সুফির সতর্কবাণী এক মুহূর্তের জন্য তার মনে এলো। তাঁর স্ত্রীর বৈরিতা কি সুফির প্রত্যক্ষ করা দূরবর্তী ছায়া গুলির একটি আরেকবার হীরাবাঈ এর আন্তরিকতাহীন চেহারা পর্যবেক্ষণ শেষে আকবর কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন এবং অনুভব করলেন তার মাঝে আবার আনন্দ উচ্ছ্বাস ফিরে আসছে। তিনি প্রথম বাবা হতে চলেছেন…
*
যে পবিত্র মানুষটি তোমার জন্মের ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন তাঁর নাম অনুসারে আমি তোমার নাম সেলিম রাখলাম।
মোচড়াতে থাকা সদ্য জন্মলাভ করা শিশুটিকে কোলে নিয়ে আকবর বললেন। শিশুটি তার বাম হাতে ধরা। এবার ডান হাতে একটি পিরিচ ভর্তি ছোট ছোট স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে তিনি খুব যত্নের সঙ্গে শিশুটির মাথায় ঢাললেন। সেলিম তার ক্ষুদ্র হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে এবং তার মুখ কুচকে গেলো কিন্তু সে কাঁদলো না। গর্বের হাসি দিয়ে আকবর সেলিমকে উঁচু করে ধরলেন যাতে সকলে তাকে দেখতে পায়। তারপর তিনি তার বয়স্ক উজির জওহর এর ধরে থাকা সবুজ মখমলের চওড়া গদিতে তাকে শুইয়ে দিলেন। এবার কালো পাগড়ি পরিহিত প্রধান ওলামা শেখ আহমেদ এর বক্তব্য প্রদানের পালা। একটি হিন্দু মায়ের গর্ভজাত সন্তানকে আশীর্বাদ করার ব্যাপারে তার মনোভাব কেমন হতে পারে? তার ঘন দাড়ি আচ্ছাদিত মুখ বৈশিষ্টহীন। তার মনের মধ্যে যাই থাকুক তা প্রকাশ পাচ্ছিলো না, যদিও তার অভিসন্ধিমূলক ফতোয়াকে ব্যর্থ করে দিয়ে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে।
সেলিমের জন্মের জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে ওলামা বয়ান শুরু করলেন: এই ভুবন আলো করা শিশুটির মঙ্গলময় আগমনকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি ওলামা সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যাদের মহানুভব সম্রাট শিক্রিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত করেছেন। যুবরাজ সেলিম, আল্লাহ আপনাকে পথপ্রদর্শন করুন এবং এক সমুদ্র ঐশ্বরিক ঐশ্বর্য আপনার উপর বর্ষিত হোক এই কামনা করছি।
ঐদিন সন্ধ্যায় শিক্রির মালভূমিতে টাঙ্গানো বহু সংখ্যক শামিয়ানার নিচে সেলিমের জন্ম উপলক্ষে আয়োজিত ভোজসভা চলছিলো। মোগলদের আদি জন্মস্থান থেকে বয়ে আনা রীতিতে নাচ গানের অনুষ্ঠানও চলছিলো। রীতি অনুযায়ী আকবর, আহমেদ খান এবং অন্যান্য সেনাপতিদের হাতে ধরে চক্রাকারে নাচের ভঙ্গিতে কয়েক বার পাক খেলেন। এ সময়ে আকবরের মনে হলো তাঁর এখন আরেকটি জিনিস করা দরকার।
তখন রাত আরো গম্ভীর হয়েছে। আকবর ঘোড়ায় চড়লেন এবং অল্প কয়েকজন রক্ষী নিয়ে হীরাবাঈ যে আশ্রমে অবস্থান করছে সে দিকে রওনা হলেন।
