হয়তো ততটা সাধারণ নয়। আপনি কি জানেন আমার স্ত্রী একজন হিন্দু?
নিশ্চয়ই জানি জাহাপনা। সমস্ত হিন্দুস্তানের মানুষ তা জানে।
নিজে একজন মুসলমান হিসেবে আপনি কি মনে করেন আমার স্ত্রীর সন্তান না হওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপর বর্ষিত শাস্তি, যেহেতু আমি একজন বিধর্মীকে বিয়ে করেছি?
না। একজন সুফি হিসেবে আমি বিশ্বাস করি আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর একাধিক পথ রয়েছে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজেদের নির্দিষ্ট পথটি খুঁজে বের করা।
আমাদের ধর্ম বিশ্বাস যেমনই হোক?
হ্যাঁ। আল্লাহ্ আমাদের সকলেরই স্রষ্টা।
সুফি ঠিক কথাই বলেছেন, আকবর ভাবলেন। তিনি বোকার মতো ওলামাদের কথার গুরুত্ব দিয়েছেন। হীরাবাঈ তাকে ঘৃণা করে বলে সন্তান ধারণ করছে না এমন ধারণাও তার বোকামী। তিনি কখনোও ভাবেননি তার অহংকার এবং মর্যাদাকে অতিক্রম করে একজন অপরিচিত মানুষের মুখ থেকে তিনি এই সত্য উদঘাটন করবেন।
আমার স্ত্রী আমাকে ভালোবাসে না। যখনই আমি তার সঙ্গে মিলিত হতে যাই, আমি তার মাঝে আমার প্রতি ঘৃণা দেখতে পাই….আমি তার সঙ্গে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করেছি…কিন্তু…
সুফি হাত তুলে আকবরকে থামিয়ে দিলেন। আরো কাছে আসুন।
আকবর সামনের দিকে ঝুকলেন এবং সুফি তার মুখ ধরে নিজের কপালের সঙ্গে আলতো ভাবে তার কপাল স্পর্শ করালেন। আবারো ভালো লাগার একটি বিস্ময়কর অনুভূতি আকবরকে পাবিত করলো, তাঁর মনে হলো তিনি যেনো আলোর বন্যায় স্নানরত।
আপনি দুঃশ্চিন্তা করবেন না জাঁহাপনা। আপনার স্ত্রী শীঘ্রই একটি পুত্র সন্তান ধারণ করবেন এবং আপনার আরো দুইজন সন্তান হবে। মোগল বংশের রক্তপ্রবাহ হিন্দুস্তানের বুকে বহু প্রজন্ম পর্যন্ত স্থায়ী হবে।
ধন্যবাদ শেখ সেলিম চিশতি, অসংখ্য ধন্যবাদ। আকবর তার মাথা নত করলেন। তাঁর আত্মবিশ্বাস আবার ফিরে এসেছে, সবরকম আত্মসন্দেহ দূর হয়ে গেছে। তিনি অনুভব করলেন সবকিছুই তার পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবে রূপ নেবে। নিজ সন্তানদের সহায়তায় তিনি একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠন করবেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তারা অগ্রসর হতে থাকবে…মোগল বংশ আরো ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে উঠবে। আপনি যা বললেন সেসব যখন বাস্ত বায়িত হতে থাকবে তখন আমি শিক্রিকে একটি সমৃদ্ধ শহরে পরিণত করবো আপনার সম্মানে। এখানে নির্মিত রাজপ্রসাদ, ঝর্না, বাগান প্রভৃতি সমগ্র পৃথিবীর জন্য বিস্ময়ে পরিণত হবে এবং আমি আমার রাজপ্রাসাদ আগ্রা থেকে এখানে স্থানান্তরিত করবো।
আপনার স্ত্রী যখন অন্তঃসত্ত্বা হবেন তাকে এখানে পাঠাবেন। এই গ্রামের বাইরে ছোট একটি আশ্রম আছে, সেখানে রানীমার যত্নের ব্যবস্থা করা যাবে। আর, হয়তো রাজপ্রাসাদের বাইরে এলে তার মনও অনেক শান্তি লাভ করবে এবং তখন তিনি আরো সহজে মাতৃত্বের প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
সে কি এখানে তার ধর্মের চর্চা করতে পারবে?
নিশ্চয়ই পারবে। আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি স্রষ্টাকে পাওয়ার একাধিক পথ রয়েছে।
তাহলে অবশ্যই আমি তাকে এখানে পাঠাবো। আকবর উঠে দাঁড়ালেন।
আপনাকে আবারো ধন্যবাদ। আপনি আমাকে স্বস্তি এবং আশা প্রদান করেছেন।
আমি নিজেও আনন্দিত। কিন্তু আরেকটি বিষয় আপনাকে আমার জানানো উচিত এবং সেটি আপনার পছন্দ নাও হতে পারে।
সেটা কি? আকবর অত্যন্ত নম্রভাবে সুফির কাঁধে তাঁর হাত রাখলেন।
যদিও আপনি তিন জন বলিষ্ঠ পুত্রসন্তান লাভ করবেন, কিন্তু মনে রাখবেন-ক্ষমতার লোভ এবং তা অধিকার করার আকাঙ্ক্ষা সবচেয়ে নিবিড় পারিবারিক বন্ধনকেও বিষাক্ত করে তুলতে পারে। সহজাত ভাবেই আপনার পুত্ররা আপনাকে ভালোবাসবে কিম্বা নিজেদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে এমনটা আশা করবেন না।
তার মানে? আপনি কি বুঝাতে চাইছেন আমার পিতা যেমন পারিবারিক বৈরিতার শিকার হয়েছিলেন তেমনি আমিও হবো?
এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই জাঁহাপনা। আমি প্রত্যক্ষ করেছি আপনি পুত্র সন্তান লাভ করবেন এবং আপনার সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হবে, কিন্তু এর বাইরে আমি কালো ছায়াও দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এখনো তা সম্পূর্ণ আকৃতি লাভ করেনি, এর মাঝে অবশ্যই কোনো সতর্কতা সংকেত নিহিত রয়েছে। আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে জাহাপনা। আমার কথা গুলি মনে রাখবেন। আপনার পুত্ররা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রতি নজর রাখবেন যাতে এই কালো ছায়া তাঁদের মাঝে ক্রিয়াশীল হওয়ার আগেই আপনি এর প্রভাব থেকে তাঁদের মুক্ত করতে পারেন।
সেদিন দিন শেষে আগ্রার পথে ফেরার সময় আকবর সুফির সতর্কবাণী নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে লাগলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুরের সময় থেকে শুরু করে বহুবার মোগলরা বাইরের শত্রুর পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে কলহে জড়িয়ে পড়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পতিত হয়েছে। তিনি এ জাতীয় লক্ষণের দিকে সর্বদা নজর রাখবেন। কিন্তু সেসব অনেক দূরবর্তী ভবিষ্যতে অবস্থিত। এই মুহূর্তে তিনটি পুত্র সন্তান লাভের স্বপ্নে পাবিত আকবর অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে তাঁর ঘোড়া ছুটালেন।
*
ছয় সপ্তাহ পর আকবর খাজানসারার কাছে শুভ সংবাদটি পেলেন।
জাহাপনা, রানীমা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন।
সন্তান কবে ভূমিষ্ঠ হবে?
হেকিম জানিয়েছেন অগাষ্ট মাসে।
আমি এখনই হেরেমে যাব। আকবর অনন্দ অশ্রু সংবরণ করতে করতে প্রায় দৌড়ে মহিলা মহলের দিকে অগ্রসর হলেন। হীরাবাঈ এর কক্ষে প্রবেশ করে তিনি আগরবাতির পরিচিত মিষ্টি ঘ্রাণ পেলেন। একটি হাসিহীন বহু বাহু বিশিষ্ট দেবী মূর্তির সামনে রাখা পিতলের পাত্রে হীরাবাঈ সর্বদাই এই আগরবাতি জ্বালিয়ে রাখে। সে একটি বার্ণিশ করা নিচু রাজপুত-অসনে বসেছিলো এবং পরিচারিকা তার চুল আচড়ে দিচ্ছিলো। আকবরের মনে হলো তাঁর স্ত্রীর আড়ষ্ট এবং অনিশ্চিত চেহারা ইতোমধ্যে নরম হতে শুরু করেছে এবং ত্বকে নতুন করে উজ্জ্বলতা তৈরি হতে শুরু করেছে। কিন্তু তার স্বাভাবে কোনো কোমলতা যদি তিনি আশা করে থাকেন তাহলে তাকে হতাশ হতে হলো। সে যখন মুখ তুলে তাকালো আকবর লক্ষ করলেন তার মুখভাব আগের মতোই অনমনীয় এবং দূরবর্তী।
