আকবর, আমি হয়তো তোমাকে সাহায্য করতে পারবো। গুলবদন আমাকে শেখ সেলিম চিশতি নামের একজন সুফি সাধকের কথা বলেছে। সে তার সঙ্গে দেখা করেছে এবং বলেছে আমার পিতামহের মতো তিনিও ভবিষ্যৎ দেখতে পান। হয়তো তিনি তোমাকে এমন কিছু বলতে পারবেন যা শুনে তুমি শান্তি পাবে।
তিনি কোথায় থাকেন?
শিক্রিতে, এখান থেকে বেশি দূরে নয়।
আমি জায়গাটা চিনি। আমি একবার শিকার করতে গিয়ে ঐ জায়গায় থেমেছিলাম পানি খাওয়ার জন্য।
*
আকবরের নেতৃত্বে ছোট আকারের একটি সৈন্যদল ধূলিময় পথের উপর দিয়ে শিক্রির মালভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো। তার দুটি প্রিয় শিকারী কুকুর পাশাপাশি দৌড়াচ্ছিলো এবং দুইজন শিকারের সহচর ও একজন কোৰ্চি ছাড়াও কিছু সংখ্যক দেহরক্ষী তাকে অনুসরণ করছে। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা একটি অল্প বয়সী হরিণকে তিনি হত্যা করেছেন এবং সেটা ইতোমধ্যে আগ্রার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘোড়ার পিঠে হরিণটিকে ঝুলিয়ে বেঁধে একজন শিকারের সহচর সেটা নিয়ে গেছে। তিনি যে অভিযানে বেরিয়েছেন সেটা শিকারের অভিযান, কোনো সাধুর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয় নয়-এমন ধারণা সৃষ্টি করাই যুক্তিসঙ্গত বলে আকবরের মনে হয়েছে।
দুপুরের রোদের উষ্ণ আবরণের মধ্য দিয়ে দূরে মালভূমির প্রান্তে মাটির ইটে তৈরি ঘরবাড়ির আবয়ব দেখা গেলো, সেটাই শিক্রি। রৌদ্রের তাপ কিছুটা কমে না আসা পর্যন্ত আমরা ওখানে বিশ্রাম করবো, তিনি কোৰ্চিকে বললেন। আমি একজন সুফি সাধকের গল্প শুনেছি যিনি ঐ গ্রামে থাকেন এবং আমার কৌতূহল হচ্ছে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। তুমি ঘোড়া চালিয়ে ওখানে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো সম্রাটের সঙ্গে তিনি দেখা করবেন কি না।
তরুন কোৰ্চিটি যখন ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেলো আকবর মালভূমির খাড়া ঢাল বেয়ে ধীরে তাকে অনুসরণ করলেন। গ্রামে পৌঁছে একটি ঘন বিন্যস্ত আমগাছের পাশে তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন। কয়েক মিনিট পর তিনি তার কোৰ্চিকে ফিরে আসতে দেখলেন।
জাহাপনা, শেখ সেলিম চিশতি হুজুর আপনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। আমার সঙ্গে আসুন।
আকবর গ্রামের মধ্য দিয়ে তার কোচিঁকে অনুসরণ করে একটি নিচু একতালা বাড়ির সামনে উপস্থিত হলেন। বাড়িটিতে প্রবেশের দরজার দুইপাশে জানালা হিসেবে মাত্র দুটি ফোঁকর রয়েছে। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি নিজেকে অন্ধকারের মধ্যে আবিষ্কার করলেন। তারপর যখন তাঁর চোখে আধার সয়ে এলো তখন তিনি সামনের মেঝেতে একজন মোটা কাপড়ের সাদা আলখাল্লা পরিহিত ব্যক্তিকে কেবলামুখী হয়ে নামাজ পড়তে দেখলেন।
মাফ করবেন জাহাপনা, আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম যাতে তার নির্দেশনায় আমি আপনার উপকার করতে পারি। কথা বলতে বলতে বৃদ্ধটি একটি মাটির মোমদানিতে মোম জ্বালালেন। মোমের হালকা আলোয় আকবর সুফিটির আখরোটের মতো কুঞ্চিত মুখ দেখতে পেলেন।
আপনি কীভাবে জানলেন আমি আপনার কাছে সাহায্যের জন্য এসেছি? আকবর তার আশেপাশে তাকাতে তাকাতে জিজ্ঞাসা করলেন। মেঝেতে পাতা একটি গাঢ় লাল রঙের জায়নামাজ, একটি অমসৃণ কাঠের তৈরি বাক্স এবং বিছানা হিসেবে ব্যবহৃত দড়ির চৌপায়া ছাড়া কক্ষটিতে আর কিছু নেই।
যারা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাঁদের সকলেই আমার কাছে ঐশ্বরিক সহযোগীতা কামনা করেন, যদিও তারা নিজেরা মনে করেন তারা কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে আমার কাছে এসেছেন। মনে হচ্ছে আপনি অবাক হয়েছেন জাহাপনা। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি নিজের সম্পর্কে বাড়িয়ে বলছি। আমার যে সামান্য ক্ষমতা রয়েছে তা অর্জনের জন্য আমি কখনোও প্রার্থনা করিনি, কিন্তু আল্লাহর ঐশ্বরিক কৃপায় কখনো কখনো আমি তার মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হই। এগিয়ে এসে আমার সামনে বসুন যাতে আমি আপনাকে ভালো করে দেখতে পারি।
আকবর সাধুর সামনে পাতা মাদুরে আসনপিঁড়ি হয়ে বসলেন। বেশ কিছু সময় সাধুটি কিছু বললেন না। কিন্তু তার পেচার মতো উজ্জ্বল চোখের তারা দুটি আকবরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো, যেনো আকবরের মনের ভিতরে কি আছে তাও তিনি জেনে যাবেন। একসময় তিনি সামান্য দুলতে লাগলেন, তাঁর লম্বা সরু হাত দুটি বুকের উপর ভাঁজ করা, তিনি নিচুস্বরে একটি প্রার্থনা বাক্য পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন, আমাকে জ্ঞান দাও, আমাকে পথ দেখাও। সাধুটি কখনো তাকে জিজ্ঞাসা করবেন তাঁর আগমনের কারণ? আকবর ভাবলেন। কিন্তু তিনি যখন অপেক্ষা করছিলেন, একটি প্রশান্তিময় অনুভূতি তাঁর মনে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে এলো এবং তার দেহ ও মন চাপ ও দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হতে লাগলো। তার কামনা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলিও ক্রমশ তার মধ্য থেকে অপসারিত হতে লাগলো যতোক্ষণ পর্যন্ত না তিনি একটি শিশুর মতো দুঃশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে পড়লেন।
এখন আরম্ভ করার জন্য আমরা প্রস্তুত। সাধুটি হাত বাড়িয়ে আলতোভাবে আকবরের কাঁধ স্পর্শ করলেন। আকবর চমকে চোখ খুললেন, ভাবছেন কতোক্ষণ ধরে তিনি এমন অর্ধ নিদ্রিত হয়ে ছিলেন যা আশ্চর্যজনক ভাবে অত্যন্ত আরামদায়ক ছিলো। আপনি আমার কাছে কি জানতে চান জাহাপনা?
জানতে চাই আমার স্ত্রী কোনো পুত্র সন্তান জন্ম দিতে পারবে কি না।
আর কিছু জানতে চান না? এটাতো খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন।
