আমি তাদেরকে বা তাদের সংকীর্ণ কুসংস্কারকে ভয় করি না। তবে স্বীকার করছি প্রথমে আমার মনে হয়েছে তাঁদের কথায় হয়তো কিছুটা সত্য থাকতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে আমি যতোই গভীর ভাবে চিন্তা করেছি ততই আমার মনে হয়েছে যে একজন ক্ষমাশীল করুণাময় আল্লাহ বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে তার সৃষ্ট মানুষকে কিছুতেই বর্জন করতে পারেন না। কিন্তু ওলামাদের বক্তব্য যতোই অসম্ভব হোক না কেনো হয়তো আমার প্রজাদের কেউ কেউ তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। এর ফলে রাজ্যে ঘৃণা এবং বিভক্তি সৃষ্টি হতে পারে। ওলামারা ভালো করেই জানেন কেনো আমি একজন হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছি-কেবল আমার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্যই নয় বরং এটাও প্রমাণ করার জন্য যে মোগল শাসন ধর্মনিরপেক্ষ।
তুমি বিচক্ষণ, হামিদা বললেন। তুমি সম্ভাব্য বিপদ আগেই অনুমান করতে পারো।
আমার পিতা আমাকে এ বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছিলেন তার সম্ভইরা যে তার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে সেটা তিনি অনেক দেরিতে বুঝতে পেরেছিলেন।
সেটা সত্যি। এর জন্য আমরা প্রায় জীবন হারাতে বসেছিলাম।
একই রকম ভুল আমি করতে চাই না, যদিও আমি যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি তার প্রকৃতি ভিন্ন।
আমাকে হীরাবাঈ সম্পর্কে বলো। আমি জানি তুমি ওকে নিয়ে খুশি নও…আমাকে ক্ষমা করো বাবা, কিন্তু আমার এবং গুলবদনের কানে অনেক কথাই আসে। হীরাবাঈ কি তোমাকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে?
সে আমাকে ঘৃণা করে।
কেনো?
চিত্তরগড়ের যোদ্ধাদের হত্যার জন্য সে আমাকে দোষারোপ করে এবং দূর্গশহর ধ্বংস করার জন্য…সে আমাকে তার স্বজাতীয়দের সর্বনাশের কারণ মনে করে।
সে এমন মনোভাব কীভাবে পোষণ করে যখন তারই ভাই তোমার মিত্র হতে পেরে এতো খুশি?
আকবর কাঁধ ঝাঁকালেন। আমার মনে হয় এর জন্য সে তার ভাইকেও অপছন্দ করে…কিন্তু সরাসরি আমাকে সে এ কথা বলেনি।
তুমি কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে তুমি তাকে পুরোপুরি বুঝো? হয়তো আমাদের রাজপ্রাসাদ তার কাছে আপন মনে হয় না এবং রাজস্থানের জন্য তার মন কাঁদে। এক সময় হয়তো তার পরিবর্তন হবে।
আমি তাকে ভালোই বুঝতে পারি মা। বিয়ের রাতে সে আমাকে ছুরিকাঘাত করতে চেয়েছিলো। আকবর কথাটি বলতে চাননি কিন্তু নিজেকে বিরত করতে তিনি ব্যর্থ হলেন।
সে কি করেছে বললে? পুত্রবধূর প্রতি হামিদার সমস্ত সমবেদনা নিমিষেই উবে গেলো এবং তার চোখ দুটি রাগে ঝলসে উঠলো। এর জন্য তাকে তোমার মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত ছিলো যেমন তোমার পিতার উচিত ছিলো প্রাথমিক বিদ্রোহের সময়ই তার ভাইদের হত্যার আদেশ দেয়া। তুমি একটু আগেই বললে তোমার পিতার ভুল গুলি থেকে তুমি শিক্ষা নিয়েছে, অথচ এখনো তুমি ঐ মেয়েটির সঙ্গে বিছানায় যাও যে তোমার মৃত্যু কামনা করে। আমি এর কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি জানতাম তুমি বুঝবে না। তাই আমি এতোদিন তোমাকে কিছু বলিনি। আমি হীরাবাঈকে ত্যাগ করিনি কারণ তাকে আমি মিত্রতার প্রতীক মনে করি। এই বিবাহের ফলে রাজপুতরা খুশি হয়েছে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে এই মিত্রতা কি বজায় থাকতো? আর নিজ দেবতাদের উপাসনা করার যে স্বাধীনতা হীরাবাঈ পেয়েছে তা আমার হিন্দু প্রজাদের জন্য একটি জীবন্ত প্রমাণ। এর ফলে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে আমার কাছ থেকে তাদের ভয়ের কিছু নেই। বাইরের মানুষ আমাদের রাজপ্রাসাদের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তারা খুশি মনে দেখছে যে মোগল সম্রাট একজন হিন্দু স্ত্রী গ্রহণ করে নির্বিঘ্নে জীবন যাপন করছে।
হামিদা চুপ করে ছিলেন, তাঁর সুন্দর ভ্রু দুটি চিন্তায় কুচকে আছে। হয়তো তোমার ভাবনাই ঠিক, অবশেষে তিনি বললেন। আঘাত এবং মাতৃত্বসুলভ ক্রোধের কারণে আমি বেসামাল হয়ে পড়েছিলাম। আমি হীরাবাঈ এর ঐ আচরণের কথা কাউকে বলবো না-এমনকি গুলবদনকেও না। তবে আমি আমার পরিচারিকাদের নির্দেশ দেবো তার উপর নজর রাখতে যাতে সে তার গর্ভধারণ প্রতিরোধের জন্য কিছু করতে না পারে। গর্ভধারণ প্রতিরোধের অনেক কৌশল প্রচলিত আছে। যেমন, তিক্ত ভেষজ ঔষধ সেবন, মিলনের আগে ভিনিগারে ভেজানো স্পঞ্জ যযানি পথের ভিতর ঢুকিয়ে রাখা, এমনকি মিলনের পরে ভেড়ার লোম পেচানো ছোট ডাল দিয়ে জরায়ু পরিষ্কার করার পদ্ধতিও রয়েছে। রাজপুত নারীদেরও নিজস্ব কৌশল থাকতে পারে।
ইতোমধ্যেই তার উপর নজর রাখা হয়েছে। খাজানসারা জালি পর্দার আড়াল থেকে মিলনের সময় আমাদের উপর নজর রাখে যদিবা হীরাবাঈ মিলনের আগে বা পরে অস্বাভাবিক কিছু করে তা আবিষ্কারের জন্য…আমার প্রতি তার ঘৃণার কারণে কি তার গর্ভধারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? সে প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী এবং মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যদিও বা সে সন্তান জন্ম দেয় তা কি মঙ্গল জনক হবে?
এসব বোকার মতো চিন্তা, আকবর। আর কেই বা বলতে পারে…হীরাবাঈ এর বয়স এখনো অনেক কম, সন্তানের মা হলে হয়তো তার মন পরিবর্তিত হয়ে যাবে।
তার বয়স ততোটা কম নয় বাবাকে বিয়ে করার সময় তোমার বয়স যতোটা কম ছিলো।
আমি ভাগ্যবতী। তোমার বাবা আমাকে ভালোবেসে পছন্দ করেছিলেন এবং আমিও তাকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু আমি কেবল একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কন্যা ছিলাম, হীরাবঈ এর মতো রাজকন্যা নয়। তোমার বাবা এবং আমার মধ্যকার সম্পর্ক অনেক বেশি সহজ ছিলো।
