আমি দুঃখিত জাহাপনা, ওনার মাসিক রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়নি। খাজানসারা (হেরেম তদারককারি) ভীত দৃষ্টিতে আকবরের দিকে তাকালো যেনো হীরাবাঈ এর গর্ভধারণের ব্যর্থতার দোষটি কোনোভাবে তার উপরই বর্তেছে। রানীমা সর্বদাই বিষণ্ণ থাকেন, আপনাদের বিয়ের পর থেকেই যেমনটা রয়েছেন। তিনি ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করেন না। তিনি কদাচিৎ নিজের কক্ষ ছেড়ে হেরেমের বাগানে বেড়াতে যান। তিনি অম্বর থেকে সাথে করে আনা পরিচারিকাদের সঙ্গেই কেবল কথা বলেন এবং হেরেমের অন্য নারীদের থেকে দূরে থাকেন। তাঁদের কোনো খেলা বা বিনোদনে যোগ দেন না। হয়তো তার কোনো অসুখ হয়েছে…আমি কি আরেকবার হেকিম কে খবর দেবো?
না। মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে একজন বৃদ্ধ চিকিৎসক মাথা কাপড়ে ঢেকে (হেরেমের নারীদের যাতে দেখতে না পারেন) দুইজন খোঁজার তত্ত্বাবধানে হীরাবাঈকে পরীক্ষা করে গেছেন। আকবরও তখন কক্ষে ছিলেন। খোলের মধ্য থেকে উঁকি দেওয়া একটি কাছিমের মতো হাত বাড়িয়ে তিনি হীরাবাঈ এর পোষাকের নিচে শরীর হাতড়ে পরীক্ষা করেছেন। আমি কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছি না জাহাপনা, অবশেষে তিনি মন্তব্য করেন। ওনার জরায়ু পথ দৃঢ় এবং সুগঠিত।
আকবর বিষণ্ণ দৃষ্টিতে খাজানসারার দিকে তাকালেন। তিনি হীরাবাঈ এর কথা ভাবছেন। প্রতিবারই তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার সময় তিনি কোনো প্রকার পরিবর্তন আশা করেছেন কিন্তু সে শিথিল হয়ে শুয়ে থেকেছে, কোনো প্রকার সাড়া দেয়নি। তিনি তার নিস্পৃহতায় যতোটা বিরক্ত হয়েছেন বাধা দান করলে হয়তো ততটা হতেন না। সে কি এখনো তাঁকে ছুরিকাঘাত করার স্বপ্ন দেখে? তিনি খাজানসারাকে সতর্ক করেছেন কোনো ধারাল বস্তু যেনো রানীর কক্ষে না থাকে। তত্ত্বাবধায়কটি কিছুটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলো, কিন্তু আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। হীরাবাঈ এর নিজের নিরাপত্তা এবং তার নিরাপত্তার জন্য এই আদেশ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারণ মাঝে মাঝে আকবরের আশঙ্কা হয়েছে সে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করতে পারে। তিনি তাকে একটি দ্বিতল কক্ষে স্থানান্তর করেছেন যার বারান্দা থেকে যমুনা দেখা গেলেও মার্বেল পাথরের আচ্ছাদনের কারণে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়া অসম্ভব।
জাহাপনা?
আকবর ভুলে গিয়েছিলেন খাজানসারা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক আছে, তুমি এখন যেতে পারো। একমাস পরে আবার আমার সঙ্গে দেখা করবে-আল্লাহর ইচ্ছায় হয়তো তখন আমাকে দেয়ার জন্য তোমার কাছে কোনো ভালো সংবাদ থাকবে।
আকবর কিছুক্ষণ একা বসে থাকলেন। বাইরে পরিচ্ছন্ন মেঘহীন আকাশ। বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেছে। এখন তার উচিত বাজপাখি উড়াতে যাওয়া বা শিকার করতে যাওয়া। কিন্তু হীরাবাঈ সংক্রান্ত ভাবনা কেনো তাকে আচ্ছন্ন। করে রেখেছে? হয়তো সেটা ভালোবাসা নয়, হয়তো সেটা তার অহংকার… সকলেরই অনুমান করতে পারার কথা যে সম্রাট এবং রানীর মধ্যে কোনো প্রকার সমস্যা হয়েছে। একমাত্র রাতে হীরাবাঈ এর বিছানায় হানা দেয়া ছাড়া তারা একসঙ্গে আহার করেন না বা সময় কাটান না। তারপরও রাতের কাজ শেষে তিনি নিজের পৃথক কক্ষে ফিরে আসেন। আজ পর্যন্ত একদিন ভোরেও হীরাবাঈ এর বাহুতে তাঁর ঘুম ভাঙ্গেনি।
হয়তো মা তাকে এ বিষয়ে কোনো বিচক্ষণ উপদেশ বা সান্তনা দিতে পারবেন। এখনো পর্যন্ত মায়ের কাছে সবকিছু প্রকাশ করতে তিনি ইতস্তত বোধ করেছেন। প্রতি মাসেই তিনি আশা করেছেন হীরাবাঈ এর গর্ভধারণের সংবাদ পাবেন। কিন্তু সময় বয়ে যাচ্ছিলো এবং তিনি তাঁর প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। বৃদ্ধ জওহর যে কথাটি তাকে বলেছে সেটা যদি সত্যি হয়-অধিক ক্ষতিকর কোনো পরিস্থিতি হয়তো দানা বেধে উঠছে। আকবরের একজন অমুসলিমকে বিয়ে করার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হবে, ভগবান দাশের এই অনুমানটি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাওলানারা গোপনে এমন কথা বলাবলি করছিলো যে, আকবরের সন্তান না হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তি, কারণ তিনি একজন বিধর্মী হিন্দুকে বিয়ে করেছেন।
*
হামিদা পড়ছিলেন, কিন্তু আকবরকে দেখে তিনি তাঁর কবিতার বইটি নামিয়ে রাখলেন। কি হয়েছে? তোমাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে।
একটু আগে খাজানসারার সঙ্গে কথা হলো।
সে কি বললো?
হীরাবাঈ এখনো গর্ভধারণ করতে পারেনি।
তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে। তুমি মাত্র ছয় মাস আগে বিয়ে করেছে।
আমি নিজেকে একথা বলেই সান্তনা দেই। কিন্তু আর কতো দিন আমাকে অপেক্ষা করতে হবে?
তোমার বয়স এখনো কম। প্রয়োজনে আরো স্ত্রী গ্রহণ করবে। তোমার সন্তান নিশ্চয়ই হবে-এমনকি পুত্রও-তবে তারা হীরাবাঈ এর গর্ভে নাও হতে পারে।
বিষয়টি এখন আর আমার ধৈর্যহীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই সপ্তাহ আগে জওহর আমার কাছে এসেছিলো। তাকে আমার উজির বানানোর পর থেকে আরো বেশি তথ্য তার কাছে পৌঁছাচ্ছে।
রাজপ্রাসাদে প্রচলিত গুজবের কোনো গুরুত্ব নেই।
কিন্তু এটির আছে। কিছু উচ্চপদস্থ মাওলানা-মানে ওলামারা-দাবি করছেন যে হীরাবাঈ কখনোই সন্তান ধারণ করতে পারবে না। একজন বিধর্মীকে বিয়ে করে আমি ইসলামের বিরুদ্ধে যে অপরাধ করেছি, তারজন্য এভাবে আল্লাহ্ আমার বিচার করছেন।
সাম্রাজ্য শাসন করো তুমি, ওলামারা নয়।
