হীরাবাঈ…ভয় পেও না। আমাকে ভয় করার মতো কিছু নেই। আকবর তার কাঁধে দুহাত রেখে আলতোভাবে নিজের দিকে ঘুরালেন। হয়তো তার চোখের অভিব্যক্তি-চিতার মতোই বুনো-আকবরকে সতর্ক করলো। হীরাবাঈ মুচড়ে আকবরের হাত থেকে মুক্ত হয়ে যখন ডান হাতটি উপরে তুললো, আকবর তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে যেমনটা করে থাকেন তেমনি তড়িৎ বেগে এগিয়ে গিয়ে তিনি বজ্রমুষ্ঠিতে তার কব্জি আকড়ে ধরলেন, ব্যথায় হীরাবাঈ চিৎকার করলো এবং একটি চওড়া ফলার ধারালো ছুরি তার হাত থেকে খসে পড়লো।
কেনো এমন করলে? আকবর চাপা স্বরে জানতে চাইলেন, এখনো তিনি শক্ত করে তার কব্জি ধরে আছেন। কেনো? আকবর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এবার তার গলার স্বর খানিকটা উচ্চে উঠলো, হীরাবাঈ এর মুখ আকবরের মুখ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। কিন্তু হীরাবাঈ চুপ করে রইলো।
তার চোখ দুটি তার ভাইয়ের মতোই ঘন কালো রঙের, সেখানে এক রাশ ঘৃণা জমে আছে। অবশেষে সে কথা বলে উঠলো। কারণ আপনি আমার স্বজাতীয়দের শত্রু-চিত্তরগড়ের অগণিত বীর রাজপুতের হত্যাকারী এবং তাদের নারীদের, যারা আপনার সৈন্যদের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচার জন্য জওহর সম্পাদন (আগুনে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করা) করেছে। আমি নিজেও ওদের সঙ্গে মরতে পারলে ভালো হতো। আপনার কাছে নিজেকে সমর্পণের পরিবর্তে আমি খুশিমনে আগুনকে আলিঙ্গন করতে পারতাম।
আকবর হীরাবাঈকে ছেড়ে দিলেন, সে এলোমেলো ধাপে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে নিজের ভারসাম্য ঠিক করলো, তারপর নিজের কব্জি ডলতে লাগলো। আকবর তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন, যদিবা আর কোনো অস্ত্র তার কাছে থাকে, কিন্তু তার প্রায় নগ্ন শরীরে তেমন কিছু দেখা গেলো না। তোমার বড়ভাই স্বেচ্ছায় তোমাকে আমার কাছে সোপর্দ করেছেন। তিনি কি তোমার মনোভাব সম্পর্কে জানেন? একটি নতুন ভাবনা আকবরের মাথায় এলো। হয়তো তিনি জানতেন তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও। তিনিও কি তোমাকে এ বিষয়ে উস্কে দিয়েছেন?
এই প্রথমবারের মতো হীরাবাঈকে শঙ্কিত মনে হলো। না, তিনি কিছুই জানেন না। নিজ পরিবারের নারীদের তিনি খুব একটা সময় দেন না। এমনকি আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে এ খবরটিও আমি জানতে পেরেছি চিঠির মাধ্যমে।
আমার এখন উচিত রক্ষীদের তলব করা এবং সূর্যোদয়ের আগেই তোমার উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা।
এখনই তা করুন।
তুমি কি সত্যিই মরতে চাও? সমগ্র জগত যখন জানবে তুমি কি করতে চেয়েছিলে, তখন তোমার বড়ভাইকে বাকি জীবনটা লজ্জা এবং অসম্মানের সঙ্গে কাটাতে হবে। এমন লোকের সঙ্গে কোনো রাজপুত নেতা সম্পর্ক রাখতে চাইবে যার বোন সকল সভ্য দায়িত্ববোধ এবং সম্মানকে বিসর্জন দিতে চেয়েছে। রাজপুতরা যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁদের বীরত্বের জন্য প্রসিদ্ধ, গোপন হত্যাকাণ্ড বা প্রতারণার জন্য নয়।
হীরাবাঈ ফুঁসে উঠলো। প্রথম বারের মতো আকবরের চোখে তার অপরূপ সৌন্দর্য ধরা পড়লো, ডিম্বাকৃতি মুখটির হাড়ের গঠন বিড়ালের মতোই সুন্দৰ প্ৰা পুলভিশ্বকৃতি মুশুনি কমনীয় এবং কোমল ত্বক একদম নতুন মধুর রঙের মতো। কিন্তু তার এই সৌন্দর্য তখন আকবরের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে তিনি তার দুই কাঁধ আকড়ে ধরলেন।
শোনো। একটি বোকা মেয়ের নির্বুদ্ধিতার জন্য আমি রাজপুত রাজ্যগুলির সঙ্গে আমার বহু প্রত্যাশিত মিত্রতা নষ্ট করবো না। চিত্তরগড়ের পতনের পর যে সব যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে, সম্মানজনক মৃত্যুই তাঁদের প্রত্যাশা ছিলো। রাজপুত যুদ্ধরীতি অনুযায়ী বেঁচে থাকা তাঁদের জন্য লজ্জাকর হতো। তোমার নিশ্চয়ই এটা অজানা নয়? সে কিছু বললো না, কিন্তু আকবর অনুভব করলেন হীরাবাঈ এর শরীর থেকে যুদ্ধংদেহী তেজ ক্রমশঃ অপসারিত হয়ে যাচ্ছে। তিনি তার কাঁধে রাখা হাত দুটিও শিথিল করলেন। একটু আগে যা ঘটলো আমি সে সম্পর্কে কাউকে কিছু বলবো না এবং তুমি যদি তোমার পরিবারের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চাও তাহলে তুমিও কিছু বলবে না। তুমি আমার স্ত্রী এবং একজন স্ত্রীর কর্তব্য তোমাকে পালন করতে হবে। তুমি আমার কথা বুঝতে পেরেছো?
হীরা বাঈ সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো।
তাহলে আমার স্ত্রী হিসেবে এখন তুমি তোমার প্রথম দায়িত্ব পালন করো। আকবর বিছানার দিকে তাকালেন। হীরাবাঈ একটু সরে গেলো এবং কোমরে বাধা মুক্তার বন্ধনটির বাধন খুলতেই তার মসলিনের অন্তর্বাসটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। তার কমনীয় বাক বিশিষ্ট শরীরটি প্রলুব্ধকর দেখালো, কিন্তু আকবর যখন নিজের শরীরটি তার উপর স্থাপন করলেন তখন তাঁর মনে কামনার পরিবর্তে ক্রোধই বেশি প্রভাব বিস্তার করে আছে। আকবরের দেহ আন্দোলিত হতে লাগলো কিন্তু তার চোখ হীরাবাঈ এর মুখের উপর থেকে সরলো না। হীরাবাঈ এর চেহারায় ব্যথা বা অস্বস্তির কোনো অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো না যখন তার শরীরে আকবরের প্রবেশের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হলো। তৃপ্তিলাভের পরিবর্তে কাজটি সম্পন্ন করার জন্যই আকবর তখন উদ্গ্রীব। তার কুমারী স্ত্রীর সঙ্গে বাসর রাতটি এভাবে কাটবে বলে তিনি ভাবেননি। আদম খানের মতো তাঁর নবপরিণতা স্ত্রীও তার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। হীরাবাঈ, যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর মোকাবেলা করা যে কোনো শত্রুর মতোই বৈরী। কিন্তু আদম খানের মতো অন্য শক্ররাও তাঁদের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছে যে আকবরের সঙ্গে বিরোধিতা তাঁদের অনুকূলে যায়নি। হীরাবাঈ হয়তো জীবন থাকতেই তা বুঝতে পারবে।
২.২ সেলিম
০৯. সেলিম
