এক সময় তেলাওয়াৎ শেষ হলো, মাওলানা তার হাতির দাঁতের মলাট বিশিষ্ট কোরানটি বন্ধ করে সেটি পরিচারকের হাতে দিয়ে দিলেন। এর পর মাওলানা একটি গোলাপজলের জগ নিয়ে আকবরের বাড়িয়ে দেয়া হাত দুটিতে গোলাপজল ঢাললেন প্রতীকি পবিত্রতা আনয়নের জন্য। তারপর সলোমানি পাথরে (আকিক পাথর) তৈরি পাত্র থেকে আকবরের হাতে তরল পানীয় ঢাললেন এবং বললেন, বিবাহ বন্ধন নিশ্চিত করার জন্য পান করুন জাহাপনা।
আকবর সামান্য পান করলেন, তারপর হীরা বাঈ এর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন তাকে নিয়ে বিবাহ ভোজে যোগ দেয়ার জন্য। হিন্দু রীতি অনুযায়ী এই ভোজের আয়োজন করেছে কনে পক্ষ। আকবর ভগবান দাশকে আগ্রা দূর্গে উত্তম সাজ-সজ্জা বিশিষ্ট কয়েকটি কক্ষ প্রদান করেছেন তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং অন্যান্য সফরসঙ্গী ও কর্মচারী-ভৃত্যদের নিয়ে থাকার জন্য। আজকের দিন থেকে একমাস ব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠানের সূচনা হবে। উপহার প্রদান, শোভাযাত্রা, শিকার, হাতির লড়াই, যুদ্ধমহড়া প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই উৎসব মাস উদ্যাপিত হবে। কিন্তু ভোজসভা যতো অগ্রসর হচ্ছিলো ততোই আকবর আসন্ন রাত সম্পর্কে সামান্য অনিশ্চয়তা অনুভব করছিলেন। রক্ষিতাঁদের সঙ্গে আদান-প্রদানকৃত উপভোগের তৃপ্তি তার জন্য পরিচিত আনন্দপূর্ণ একটি বিষয় ছিলো। তাদের নরম পেলব হাত এবং সুগন্ধযুক্ত শরীর তাকে রাজকার্যের বোঝা থেকে সর্বদাই নিস্কৃতি দিয়ে এসেছে। কিন্তু একজন কুমারী রাজপুত রাজকন্যা শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে তার জন্য অভিনব অভিজ্ঞতা হবে।
পাশে বসে থাকা হীরা বাঈ এর দিকে আকবর এক পলক তাকালেন, এখনো ঝলমলে ঘোমটার আড়ালে তার মুখ ঢাকা। মেয়েটি কেমন হবে? এই প্রশ্ন শততম বারের মতো তাঁর মনে উদয় হলো। রাজপুত নারীরা তাঁদের চোখ ঝলসানো রূপের জন্য প্রসিদ্ধ, কিন্তু এই মেয়েটি যদি তেমন সুন্দর নাও হয় তাতে কোনো সমস্যা নেই, আকবর নিজেকে বললেন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এই বিবাহের মাধ্যমে তিনি অম্বর রাজ্যটিকে নিজের সঙ্গে সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করলেন। এ ধরনের আরো মিত্রতা ভবিষ্যতে সম্পাদিত হবে।
আকবর ভোজের পাশাপাশি আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দিকে মনোযোগ প্রদানের চেষ্টা করলেন। কমলা রঙের পাগড়ি পড়া সুঠামদেহী উন্মুক্ত বক্ষের দুলিদের উদ্দাম ঢাকের তালে তালে এবং মোহনীয় বাঁশির সুরে ময়ূরনীল ঘাগড়া পরিহিত অম্বরের নর্তকীরা তাঁর সামনে ঘুরে ঘুরে নাচছে। রাজপুত গায়করা যুদ্ধক্ষেত্রের বিক্রম প্রকাশক কোনো গান গাইছে উচ্চ স্বরে, বাজিকররা আগুন জ্বলা দড়ির ফাঁসের মধ্যদিয়ে ডিগবাজি খেয়ে পার হচ্ছে, আয়নার কাঁচ বসান জোব্বা পরিহিত এক বৃদ্ধ তার পোষাকে মোমর আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে ঝুড়ির মধ্য থাকা একটি অজগর সাপকে প্রলুব্ধ করে খেলা দেখাচ্ছে।
অবশেষে এলো সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত যা আকবর নিজে পরিকল্পনা করেছেন। আকবরের প্রধান শিকারী উৎসব কক্ষে প্রবেশ করলো। তার পিছু পিছু এলো একটি বলিষ্ঠ দেহের অল্পবয়সী চিতাবাঘ। বাঘটির তামাটে গলায় চুনি ও হীরা খচিত গ্রীবাবন্ধনী সংযুক্ত। সেটার চোখের নিচের অশ্রুজলের দাগ পড়া অংশটি সোনা দিয়ে গিলটি করা, মনে হচ্ছে যেনো কোনো পৌরাণিক কল্পকাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা একটি জানোয়ার। আচমকা সেটার লেজের ঝাঁপটায় একটি পানপাত্র মাটিতে আছড়ে পড়লো, সঙ্গে সঙ্গে শিকারীটি বাঘটির গলার সঙ্গে যুক্ত চামড়ার রঙ্কুটি গুটিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করলো।
আকবর উঠে দাঁড়ালেন এবং ভগবান দাশকে লক্ষ্যকরে বললেন, এই বাঘটির নাম জালা, আমার প্রিয় শিকারী চিতাটির বাচ্চা। এই শুভ উৎসবে ওকে আমার পক্ষ থেকে আপনাকে উপহার হিসেবে প্রদান করতে চাই।
রাজার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আকবর জানতেন ভগবান দাশ তাঁর মতোই শিকার করতে পছন্দ করেন। এর থেকেও যেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো চিতাবাঘ অত্যন্ত বিরল এবং মূল্যবান, সত্যিকার রাজকীয় প্রাণী। এটা নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উপহার। রাজা প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। রাজার উচ্ছ্বসিত মুখভাব এক নজর প্রত্যক্ষ করে আকবর আবার বললেন, আমার শিকারীরা ওর প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখবে এবং যখন তার প্রশিক্ষণ শেষ হবে আমি তাকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেবো। আকবর জালার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তার নত মার্জিত মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। তোর বাবা যেমন আমার শিকারের সময় তড়িৎ এবং নির্ভীক আচরণ করে তেমনি তুইও তোর নতুন মনিবের জন্য করিস।
বিয়ের অনুষ্ঠান যখন শেষ হলো চাঁদ তখন আকাশের অনেক উপরে, এর ঠাণ্ডা ফ্যাকাশে আলো যমুনার পানিকে তরল রূপায় পরিণত করেছে। যমুনার জল হীরা বাঈ এর জন্য নির্ধারিত হেরেম কক্ষের তিরিশ ফুট নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাজিয়েদের অনুসরণ করে আকবর হীরাবাঈকে নিয়ে কক্ষটিতে পৌঁছেছেন। আকবরের পরিচারকরা যখন তার পোষাক খুলে দিচ্ছিলো তখন তিনি কক্ষের এক প্রান্তে স্থাপিত সোনার কারুকাজ করা এবং ফুল ও তারা খচিত পর্দার দিকে তাকালেন-গুজরাটের বিখ্যাত তাঁতীরা দক্ষ হাতে সেটি তৈরি করেছে-ওটার আড়ালে নববধূর বিয়ের পোষাক খুলে সুগন্ধী তেল মেখে বাসর শয্যার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। যখন শেষ পরিচারকটি বিদায় নিল, আকবর তার সবুজ ঢিলা আলখাল্লাটি খুলে রেখে পর্দার কাছে উপস্থিত হলেন এবং পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। হীরাবাঈ তাঁর দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, স্বচ্ছ জাম রঙের মসলিন পোষাকের মধ্যদিয়ে তার ছিপছিপে শরীরের আবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো। তার গাঢ় লাল মেহেদী দেয়া চুল উজ্জ্বল ঢেউ এর মতো নিতম্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। আড়ষ্ট কাঁধ দুটি দেখে আকবর অনুমান করতে পারলেন সে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে আছে।
