আকবর আসন গ্রহণ করার সময় ভগবান দাশের দিকে এক পলক তাকালেন যিনি তার ডান পাশে বসে ছিলেন। আপনি আমাদের সম্মানিত করলেন জাহাপনা, রাজপুতটি বললেন।
এবং এখানে উপস্থিত হয়ে আপনি আমাকে সম্মানিত করেছেন, ভগবান দাশ, আমি আপনাকে আরো কিছু বলতে চাই। আমি বিয়ে করতে চাই। আপনার সবচেয়ে ছোট বোন হীরা বাঈ এর সৌন্দর্য এবং মর্যাদা সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। তাকে আমার স্ত্রী হিসেবে সমর্পণ করতে কি আপনি রাজি আছেন?
ভগবান দাশ যেনো বজ্রাহত হয়েছেন, উত্তর না দিয়ে তিনি এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, হীরা বাঈকে কেনো বিয়ে করতে চাইছেন জাহাপনা? হিন্দুস্তানের এতে নারীর পরিবর্তে আপনি আমার বোনকে কেনো নির্বাচন করলেন?
রাজপুতদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্যে। হিন্দুস্তানের সকল মানুষের মধ্যে আপনাদের সঙ্গেই মোগলদের সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্য রয়েছে-যারা যুদ্ধের শ্বেত উত্তাপে বলিষ্ঠ, গর্বিত এবং শক্তিশালী। আর সমস্ত রাজপুতদের মধ্যে আপনি ভগবান দাশ, সবচেয়ে অগ্রবর্তী। ইতোমধ্যে উটের দৌড়ের সময় আমি আপনার পুত্রের সাহস প্রত্যক্ষ করেছি। আমি নিশ্চিত আপনার বোন একজন উপযুক্ত সম্রাজ্ঞী বলে বিবেচিত হবে। আর খোলামেলা ভাবে বলছি- আমি আমার মিত্রদের আমার সঙ্গে কঠিন বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাই। এবং এ ক্ষেত্রে বিবাহ বন্ধনের চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে?
তাহলে এটাই আপনার অভিপ্রায়-রক্তের বন্ধনে আমার বংশের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করা? ভগবান দাশ ধীরে ধীরে বললেন, যেনো তিনি আকবরের প্রস্তাবের গূঢ় অর্থ আত্মস্থ ও ওজন করার চেষ্টা করছেন।
হ্যাঁ।
এবং পরবর্তীতে আপনি আরো বিবাহ করবেন?
নিশ্চয়ই, আমার সাম্রাজ্যকে সুসংহত করার জন্য তা প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমি আপনার কাছে শপথ করছি, ভগবান দাশ, আমি সর্বদা আপনার বোনকে আমার প্রথম স্ত্রী হিসেবে এবং একজন রাজপুত রাজকন্যা হিসেবে উপযুক্ত মর্যাদা প্রদান করবো।
ভগবান দাশ কপালে কুঞ্চন নিয়ে বললেন, কিন্তু ইতোপূর্বে কোনো রাজপুত নারী তার নিজের সমাজের বাইরের কাউকে বিবাহ করেনি…এবং আপনার নিজের পরিবারও পূর্বপুরুষের রক্তের ধারা বিঘ্নিত করেনি।
আপনার কথা সত্যি। কিন্তু আমি হিন্দুস্তানে জন্মগ্রহণ করা প্রথম মোগল সম্রাট। হিন্দুস্তান একাধারে আমার দেশ ও জন্মভূমি। তাহলে কেনো আমি একজন হিন্দুস্তানী স্ত্রী গ্রহণ করবো না?
কিন্তু আমরা রাজপুতরা হিন্দু। আমার বোনের জন্য নিজের সমাজের বাইরে বিয়ে করার চেয়েও অধিক কঠিন নিজের ধর্মের বাইরে বিয়ে করা। সে আপনার মুসলিম ধর্মমত গ্রহণ করতে পারবে না।
আমি তাকে মুসলিম হতে বলবো না। আমি তার ধর্মকে শ্রদ্ধা করি যা আমার অন্যান্য বহু প্রজারও ধর্ম। আমি কখনোই আমার প্রজাদের ধর্মের উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করিনি, তাহলে আমি হীরাবাঈ এর সেই স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করবো কেনো?
ভগবান দাশের ঈগল সদৃশ চেহারা বিষণ্ণই রয়ে গেলো, এবারে আকবর তার দিকে কিছুটা ঝুকলেন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যা একজন সম্রাটের জবান- আমি হীরা বাঈকে কখনোই তার ধর্ম পরিত্যাগের জন্য জোর করবো না এবং রাজকীয় হারেমের মধ্যে মন্দির বানিয়ে সে তার দেবতাদের পূজা করার অধিকার পাবে।
কিন্তু হয়তো আপনার নিজের পরিবার-আপনার সভাসদরা এবং আপনার মোল্লারা- এর প্রতিবাদ করবে?
সাদা পাগড়ি, কালো আলখাল্লা এবং লম্বা দাড়ি বিশিষ্ট মোল্লাগণ যেখানে বসে ছিলো আকবর সেদিকে তাকালেন। তারা উপলব্ধি করবেন যে সাম্রাজ্যের মঙ্গলের জন্য আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তিনি বললেন, তারপর কণ্ঠে ইস্পাত দৃঢ়তা নিয়ে যোগ করলেন: তারা এটাও বুঝতে পারবেন যে এটা আমার ইচ্ছা।
হয়তো বুঝবে, হয়তো নাও বুঝতে পারে…আর আমার বোন আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট-কিছুটা একগুঁয়ে এবং জেদি প্রকৃতির মেয়ে, সে হয়তো এ প্রস্তাবে…
আপনার বোন একজন সম্রাজ্ঞী হবে এবং হয়তো পরবর্তী মোগল সম্রাটের জননীও- আর আপনি হবেন তার মামা। ভগবান দাশ, আপনি আপনার মতামত দিন। দয়া করে আমাকে নিরাশ করবেন না।
ভগবান দাশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন, গলায় পড়া তিন প্যাঁচের মুক্তার মালায় তার আঙ্গুলগুলি খেলা করছে। অবশেষে তিনি হাসলেন। জাহাপনা, আপনার এই প্রস্তাব আমার পরিবারের জন্য সম্মানজনক। হীরা বাঈ আপনারই হবে। প্রার্থনা করি এই ঐক্যের প্রতি আমাদের সকল ভগবানের আশীর্বাদ বর্ষিত হোক।
*
কমলা এবং সোনালী সুতার কারুকাজ করা ঘন লাল রঙ্গের ঘোমটায় ঢাকা মেয়েটি একদম স্থির হয়ে বসে ছিলো। মাথায় পড়া মুকুটটি মুক্তা এবং সোনার সুতায় তৈরি করা ফুল পাতায় অলংকৃত। এটি আকবরের দেয়া বিয়ের উপহার। সাদা পোষাক পরিহিত হিন্দু পুরোহিত বিয়েতে তার ভূমিকাটুকু সম্পন্ন করেছেন এবং এখন আকবরের পক্ষে একজন মাওলানা মুসলিম রীতি অনুযায়ী কোরান থেকে আয়াত পাঠ করবেন। মাওলানা যখন সুললিত ছন্দে তেলাওয়াৎ করছেন আকবর লক্ষ্য করলেন মেয়েটির একটি সরু পেলব চরণ পোষাকের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেটি মেহেদীর জটিল নকশায় কারুকাজ করা।
আকবর নিজের হাতের দিকে তাকালেন, তাঁর হাত দুটিতেও মেহেদীর কারুকাজ-মা ও ফুফু সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে তাকে মেহেদী পড়িয়ে দিয়েছেন। তারা এখন উইলো গাছের শাখা দিয়ে তৈরি আড়ালের পেছন থেকে বিবাহ উৎসব প্রত্যক্ষ করছেন।
