কয়েক মুহূর্তের জন্য জানোয়ার দুটি সমপর্যায়ে রইলো, কিন্তু তারপর আকবর আবার এগিয়ে গেলেন। তাঁর চতুর্দিকে সবকিছু দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ ও পশুর সম্মিলিত ঘামের গন্ধ নাকে আসছে। হট! হট! তিনি আবার চেঁচিয়ে উঠলেন, এর ফলে তাঁর উত্তেজনা যেমন প্রশমিত হলো, একই সাথে উটটিকেও তাগাদা দেয়া হলো। তাঁর গলা ধূলায় পূর্ণ এবং মুখ থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে কিন্তু তাঁর একমাত্র মনোযোগ দুইশ গজ সামনে মাটিতে গাঁথা দৌড়ের শেষ সীমা নির্ধারণকারী দুটি বর্শার দিকে। ঘাড় ফিরিয়ে তিনি দেখলেন মানসিং এর কাছ থেকে তিনি প্রায় পাঁচ গজ সামনে এগিয়ে আছেন। তাঁর মনে হলো তিনি উড়ছেন এবং দ্রুতবেগে নিশ্চিত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু হঠাৎ আকবরের উটটি হোঁচট খেলো, সেটির সামনের পা দুটি বেকায়দা ভাবে শুকনো কাঁটা ঝোঁপের মধ্যে জড়িয়ে গিয়ে, দৌড়ের শেষ সীমায় দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকায় আকবর ঝোঁপটি খেয়াল করেননি। উটটির সামনের পা দুটি যখন আটকে গেলো, তখন আকবর যতোটা সম্ভব পিছনে হেলে পড়লেন কুঁজের উপর- সেইসঙ্গে শক্তভাবে জানোয়ারটির পাজরের সঙ্গে বাম পা আটকে নিজের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেন। একই সাথে আকবর লাগাম শিথিল করলেন উটটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার জন্য যদিও তার সহজাত প্রবৃত্তি বলছিলো সেটা শক্তভাবে টেনে রাখার জন্য। কিন্তু উটটির মাথা তখন প্রায় মাটি ছুঁয়েছে এবং সেটি মাটিতে আছড়ে পরার উপক্রম করলো। লাগাম সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে আকবর সামনের দিকে ছিটকে গেলেন এবং প্রাণীটির ঘাড়ের পিছনের মাংসল অংশে দৃঢ়ভাবে এঁটে থেকে অনুমান করার চেষ্টা করলেন সেটি কোনো পাশে পড়তে পারে, যাতে সেটার নিচে চাপা পড়তে না হয়। কিন্তু কোনোক্রমে উটটি আবার স্বাভাবিক হতে পারলো এবং ঝোঁপটিকে পেরিয়ে সামনে ধেয়ে গেলো। আকবর লাগাম আঁকড়ে ধরে সবলে নিজেকে সোজা করে ভারসাম্য রক্ষা করলেন। সম্পূর্ণ ঘটনাটির ব্যাপ্তি কয়েক মুহূর্ত কিন্তু তা মানসিংকে আকবরের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ দিলো। তারা আবার সমপর্যায়ে এসে পড়লো। হট, আকবর চিৎকার করলেন, হট! এবং উটটি আবার তার চিৎকারে সাড়া দিলো, সেটির গলা প্রায় সমান্তরাল এবং প্রবলভাবে নাক দিয়ে শ্বাস টানছে। পাঁচ কদম পেরিয়ে আকবর বর্শা দুটির মাঝ দিয়ে অতিক্রম করে গেলেন, তিনি তখন মানসিং এর কাছ থেকে এক ফুট সামনে। আকবর দৌড়ের সীমা অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুত থাকা ঢুলিরা ঢোলের সম্মিলিত গর্জন তুলে তাঁর বিজয় ঘোষণা করলো। আকবর তার উত্তাপ ছড়াতে থাকা উটটির পিঠ থেকে লাফিয়ে নামলেন, বেঁচে যাওয়া এবং জয়ী হওয়ার জন্য প্রচণ্ড উল্লাস নিয়ে।
*
দুই ঘন্টা পরের ঘটনা। ঘনিয়ে আসতে থাকা আধারের পটভূমিতে ছায়ার আকারে বাদুরের দল তাদের নিশি অভিযানে যাত্রা করছে। আকবর আগ্রার দুর্গের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, সদ্য গোসল করে সোনার কারুকাজখচিত জোব্বা আর পাজামা পড়েছেন। গলায় বক্র পান্না দিয়ে তৈরি সোনার মালা। উটের দৌড়ের প্রতিক্রিয়ায় তার শরীরের পেশীগুলি এখনো ব্যথা করছে কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। তাঁর রাজপুত অতিথিরা চারপশে জড়ো হয়ে আছেন উৎসবের পরবর্তী আয়োজন উপভোগ করার জন্য। রাজপুতদের অহমিকার কথা মনে রেখে আকবর এমন জমকালো উৎসবের আয়োজন করেছেন যে, তারা নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাওয়ার আগেই তাদের প্রজারা জেনে যাবে মোগল সম্রাট তাদের শাসকদের কতোটা শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।
আকবরের কাছ থেকে সংকেত পেয়ে আতশবাজী ছোঁড়া হলো, সেগুলি বন্দুকের চেয়েও উচ্চশব্দে সোনালী এবং সবুজ রঙ ধারণ করে আকাশে বিস্ফোরিত হলো এবং একে অনুসরণ করলো রূপালী এবং লাল আলোর ঝলকানি। এরপর বিস্ফোরিত হলো জাফরানী হলুদ, একে যে তীব্র শব্দ সঙ্গ দিলো-মনে হলো সেটা কোনো দানবাকৃতির ঈগলের চিৎকার। তারপর আকাশে সূক্ষ্ম কুয়াশার মতো গাঢ় লাল এবং গোলাপি আভার বিচ্ছুরণ হলো। নিজের চারপাশে এবং যমুনার পারে জড়ো হওয়া জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজিত ধ্বনি আকবরের কানে এলো। কাশগড়ের জাদুকররা এই মনোমুগ্ধকর আতশবাজির প্রদর্শনীতে বিশেষ দক্ষ। আকবর তাঁদের আদেশ করেন তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য এবং তারা তাকে নিরাশ করেনি। হঠাৎ হুশ হুশ শব্দের সাথে আকাশে দেখা দিলো বিশালদেহী একটি বাঘ, সেটি এতো বড় হা করে আছে যেনো পুরো জগতটা গিলে ফেলবে। কয়েক মুহূর্ত সেটি আকাশে স্থির থাকলো-চমৎকারিত্বপূর্ণ এবং হিংস্র, তারপর কমলা এবং কালো ডোরা গুলি ছোট ছোট উজ্জ্বল তারার আকারে বিলীন হয়ে গেলো।
আমরা সবাই এখন বাঘের ছায়া দ্বারা আবৃত, অম্বরের রাজা ভগবান দাশ বললেন, তিনি বেটে আকারের পাকানো শরীরের অধিকারী একজন মানুষ বয়স ত্রিশের কোঠায়, নাকটি ঈগলের ঠোঁটের মতো বাঁকানো তার পুত্র মানসিং এর মতোই, কপালে হিন্দুরীতির সিদুরের তিলক রয়েছে।
বাঘ হলো আমার রাজবংশের ঐতিহ্য, আপনি ঠিকই বলেছেন, আকবর উত্তর দিলেন, কিন্তু আমরা সকলেই কি জানোয়ারটির সাহস এবং শক্তিকে সমীহ করি না? আমাদের মাঝে এমন কেউ কি আছেন যিনি প্রাণীটির শক্তি এবং চাতুর্যপূর্ণ শিকারের কৌশলের বিপরীতে অসহায় বোধ করেননি? আমার আশা একদিন সমগ্র হিন্দুস্তানের মানুষ এই বাঘকে আলিঙ্গন করবে তাঁদের সম্মিলিত শক্তির প্রতীক হিসেবে।
