আমার শাসনকালের এই বছরটিতে যুদ্ধের আগুনের শিখা রাজস্থানের আকাশের বহু উচ্চে পৌঁছেছে। আমার সৈন্যদের দৃঢ়তা এবং শক্তি প্রত্যক্ষ করে শত্রুদের সাহস বালুতে শুষে যাওয়া বৃষ্টির মতো বিলুপ্ত হয়েছে। এখানে আমার বিজয় সম্পন্ন হয়েছে যা ভবিষ্যতের অনাগত গৌরব গুলির উপযুক্ত ভিত্তি প্রস্তর…
অনুলেখক চলে যাওয়ার অনেক পড়ে যখন সমগ্র শিবিরের কোলাহল থেমে গেছে, তখনো আকবরের ঘুম আসছিলো না। তাঁর শ্রুতলিখনের বাক্যগুলি হৃদয় থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে উত্থিত হয়েছে। তার ভবিষ্যতও গৌরবময় হবে বলে তিনি নিশ্চয়তা অনুভব করছিলেন। রচিত ঘটনাপঞ্জির মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ তাঁর কীর্তি সম্পর্কে জানুক এটাই তার বাসনা। কিন্তু মানুষের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে একটি মাত্র তীর বা বন্দুকের গুলি অথবা আততায়ীর ছোরার আঘাতে যে কোনো মুহূর্তে তিনি মৃত্যুবরণ করতে পারেন। তখন তাঁর সাম্রাজ্যের কি হবে? তাঁর কোনো বংশধর না থাকায় এই বিশাল মোগল সাম্রাজ্য তখন টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। হিন্দুস্তানে মোগলদের অর্জনকে সম্মিলিতভাবে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে গোত্রপতিরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত হবে। তাহলে তাঁর পরাজয় ঘটবে, যেমন পরাজয় ঘটতে পারে উদাসীনতা বা আত্মতুষ্টির কারণে তিনি যদি তার সেনাবাহিনীকে পতনের দিকে ঠেলে দেন, তাহলে।
এমন কিছু ঘটতে দেয়া ঠিক হবে না। তিনি এখন বিশ বছরে পদার্পন করেছেন, এখন তাঁর দায়িত্ব সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও গন্তব্য নিশ্চিত করা। তাই এখন তাকে বিয়ে করতে হবে এবং সন্তান জন্ম দিতে হবে। তিনি বিয়ে করলে তার মা এবং ফুফু নিঃসন্দেহে খুশি হবেন। তারা বেশ কিছুদিন ধরে তাকে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন, এমনকি সম্ভাব্য কনের ব্যাপারেও পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু রাজস্থান জয়ের পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকার কারণে আকবর এ বিষয়ে তেমন মনোযোগ দিতে পারেন নি এবং বাস্তবতা হলো বিয়ে করার জন্য তিনি তেমন আকাঙ্ক্ষাও অনুভব করেননি। কারণ হারেমে তিনি সীমাহীন যৌনতৃপ্তি লাভ করছিলেন। তাঁর পিতা মাতার মতো আন্তরিক সম্পর্ক তাঁর নিজের জীবনেও সৃষ্টি হোক এমন তাগিদ তিনি উপলব্ধি করছিলেন না। আদম খান এবং মাহাম আঙ্গার বিশ্বাসঘাতকতার পর ঘনিষ্ট কারো প্রতি নিজের বিশ্বাস অর্পণের বিষয়েও তিনি সন্দিহান রয়েছেন। কিন্তু এখন এখানে অস্থিরচিত্তে এবং একা বসে থেকে তার মনে হলো, বিয়ে করার সময় হয়েছে। এটা তাঁর নিজের জন্য না হলেও সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন। বিশেষভাবে যা কাম্য তা হলো স্বাস্থ্যবান ও সবল পুত্র সন্তান কিন্তু বিয়ের মাধ্যমে তিনি মিত্ৰতাও তৈরি করতে পারেন। কোর্চির পড়ে শোনানো বাবরের দিনলিপির কিছু কথা আকবরের মনে পড়লো: আমি এমনভাবে আমার স্ত্রীদের নির্বাচন করেছি যাতে আমার গোত্রপতি এবং শাসকেরা আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকে।
বাইরে থেকে হঠাৎ ভেসে আসা তীক্ষ্ম চি চি শব্দে বোঝা গেলো পেঁচা বা অন্যকোন নিশাচর শিকারী ছোট কোনো জীবকে আক্রমণ করেছে। সেই মুহূর্তে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরে পরিতৃপ্ত আকবর দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গলেন। তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রী নির্বাচনে ততোটাই সতর্কভাবে চিন্তা করবেন যতোটা তিনি যুদ্ধ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে করে থাকেন। হামিদা এবং গুলবদন যে মেয়েগুলির কথা বলেছেন তাঁদের একজন পুরানো মোগল রাজবংশের মেয়ে-একজন তার দূরসম্পর্কের খালাতো বোন এবং আরেকজন কাবুলের প্রশাসকের কন্যা-কিন্তু এই নারীগুলি সত্যিই কি হিন্দুস্তানের সম্রাটের জন্য উপযুক্ত? এদের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি হলে সেইসব নেতারা কি তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত হবেন যাদের তিনি মিত্র হিসেবে কামনা করেন?
*
আকবর যে উটটির পিঠে বসে ছিলেন সেটার পাঁজরের শেষাংশের মাংসল জায়গায় পায়ের গোড়ালি দাবিয়ে দিলেন। উটটি যমুনার চওড়া মেটে পারের উপর দিয়ে তীব্র বেগে সামনে ধাবিত হলো। উটের দৌড় প্রতিযোগীতা চলছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারী সৈন্যদের বর্শার অগ্রভাগে অবস্থান করা জনতা উৎসাহ প্রদান করতে সম্মিলিত গর্জন তুললো। আকবর তার বাম পার্শ্বে অবস্থানকারী উজ্জল রঙের পোষাক পরিহিত রাজঅতিথিদের দিকে এক পলক তাকালেন-এদের মধ্যে লাল এবং কমলা পাগড়ি মাথায় রাজপুত রাজারা রয়েছেন যারা তার নতুন মিত্র-আগ্রার দুর্গপ্রাচীরের সম্মানিত স্থানে জড়ো হয়ে আছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রতিযোগীতায় জয় ছাড়া আর কোনো চিন্তা মাথায় আসা উচিত নয়। আকবরের বাম এবং ডান পা উটটির হাড় সর্বস্ব গলাকে পেচিয়ে একত্রিত হয়ে আছে। তার এক হাতে ধরা লাগামটি প্রাণীটির নাকে লাগানো পিতলের আংটার মধ্য দিয়ে টানা, আরেক হাতে একটি বাঁশের লাঠি। ঘোড়ার ছন্দবদ্ধ ও মসৃণ গতির তুলনায় উটের অসুবিধাজনক ভঙ্গির দৌড়ের বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছিলো।
তিনি নিজের উটটি ভালোই নির্বাচন করেছেন-পাকা শস্যের মতো রঙ বিশিষ্ট উটটি অল্প বয়সী পুরুষ, পিছনের পায়ের রান বলিষ্ঠ এবং দাঁতের বাড়ি খাওয়া শব্দ এবং থুতু ফেলার প্রবণতা দেখে এর সঞ্চিত শক্তির আভাস পাওয়া যায়। এক পলক দৃষ্টি বুলিয়ে আকবর বুঝতে পারলেন তিনি অন্য পাঁচজন প্রতিযোগীর তুলনায় এগিয়ে আছেন, কিন্তু দুই মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে এবং এসময়ের মধ্যে যে কোনো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তার নিচে মাটিকে ঝাপসা দেখা যাচ্ছিলো কিন্তু হঠাৎ আরেকটি উট আঁকি দিয়ে তার পাশে হাজির হলো এবং সেটার চালকের উরু তার পায়ের সঙ্গে বাড়ি খেলো। সে রাজা অম্বর এর চৌদ্দ বছর বয়সী পুত্র মানসিং, তার কালো চুল মাথার পেছনে উড়ছে। রাজপুতরা খ্যাতিমান চালক কিন্তু মোগলরাও তাদের চাইতে কম দক্ষ নয়…হট! হট! আকবর তার লাঠি উঁচিয়ে চিৎকার করলেন কিন্তু তাকে লাঠিটি ব্যবহার করতে হলো না। তাঁর উটটি ঘাড় ফিরিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখে নিজে থেকেই দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিলো।
