এই মুহূর্তে অন্যান্য রাজপুতরা ঢালু পথের নিচে পৌঁছে গেছে এবং মোগল সৈন্যদের আক্রমণ করার জন্য ছড়িয়ে পড়ছে। লড়াই এর আকাক্ষা তাঁদের মধ্যে এতো তীব্র যে, কোনো প্রকার সমর কৌশলের তোয়াক্কা না করে তারা যে দিকে নজর যায় আক্রমণ করতে লাগলো। তাদের এক একজনকে ঠেকাতে একধিক বন্দুকের গুলি বা তীর ছোঁড়ার প্রয়োজন হচ্ছিলো। যতো মারাত্মক ভাবেই জখম হোক না কেনো আকবরের সৈন্যদের কাছে পৌঁছাতে পারলে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনাদের মাটিতে আছড়ে ফেলছিলো এবং সাথে থাকা ভারী দ্বিধার তলোয়ার বা খাঁজকাটা খঞ্জর দিয়ে কোপ মারছিলো। আকবর তাঁর একদল বন্দুকধারীকে আক্রান্ত হওয়ার আগেই বন্দুকে গুলি ভরার সময় নেয়ার জন্য তীরন্দাজদের কাছে পিছিয়ে আসার আদেশ দিলেন। দূর্গদ্বারের কাছ থেকে নীচ পর্যন্ত ঢালু পথটি তখন রক্ত এবং হতাহত যোদ্ধাদের দেহে ছয়লাব হয়ে গেছে।
সম্মুখ যুদ্ধে নিজের সৈন্যদের ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে দেখে আকবর স্বস্তি ও পুলক অনুভব করলেন। তাঁর সৈনিকরা রাজপুত যোদ্ধাদের ছোট ছোট দলকে ঘিরে ফেলছিলো। এখন চিত্তরগড়ের দুর্গদ্বার দিয়ে অনেক অল্প সংখ্যক যোদ্ধা বেরিয়ে আসছে। পথের নীচ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তারা গুলি বা তীর বিদ্ধ হয়ে হতাহত সাথীদের দেহের উপর লুটিয়ে পড়ছে। যদিওবা কেউ নিচে পৌঁছাচ্ছে সে আকবরের অশ্বারোহী বাহিনীর হাতে কচুকাটা হচ্ছে। রাজপুতদের ছোট ছোট প্রতিরোধগুলি আকবরের সৈন্যদের নিয়মতান্ত্রিক আক্রমণে বিধ্বস্ত হচ্ছিলো। আকবর অনুভব করলেন এই প্রথম বৈরাম খানের নির্দেশনা ছাড়া তাঁর বহুকক্ষিত বিজয় সন্দেহাতিতভাবে অর্জিত হতে যাচ্ছে। এটি সম্ভবত ভবিষ্যতে আরো অনেক বিজয়ের প্রথমটি। আপন অনুপ্রেরণার পাশাপাশি রাজপুতদের নগ্ন বীরত্ব তাঁকে অভিভূত করলো। এধরনের যোদ্ধারা শত্রুর চেয়ে মিত্র হিসেবেই বেশি কাম্য।
শীঘ্রই যুদ্ধক্ষেত্র স্থবির হয়ে পড়লো। আকবর রবি সিংকে কাছে ডাকলেন। এই সব বীর যোদ্ধাদের তাদের ধর্মমত অনুযায়ী সৎকারের ব্যবস্থা করুন। যেহেতু জয় মালের মৃত্যুর পর উচ্চ পদস্থ সেনাকর্তারা অমার দেয়া আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তাই তাঁদের কেউ এখনো বেঁচে থাকলে হত্যা করুন। মৃত্যুবরণ করা তাদের জন্য কঠিন হবে না কারণ বেঁচে থাকা তাঁদের জন্য নিজস্ব যুদ্ধনীতির লঙ্ঘন। তারপর দুর্গটি ধ্বংস করুন, যাতে দুর্গটিকে আর আমাদের বিরুদ্ধে কেউ ব্যবহার করতে না পারে এবং অন্যান্য রাজপুত নেতাদের জন্য এটা হবে একটি সতর্কবার্তা যারা আমার মিত্রতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সাহস দেখাতে চাইবে।
.
০৮. হীরা বাঈ
জাহাপনা, প্রভু রায় সূর্যন আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়। রাহুম্ভর দূর্গশহরের সীমার ভিতর অবস্থিত নাগরিকদের প্রাণ রক্ষার বিনিময়ে তিনি আপনার জায়গিরদার হওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। লম্বা এবং তারের মতো পাকানো দেহের অধিকারী বয়স্ক রাজপুতটি মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার গর্বিতভাব স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছিলো। কথাগুলি বলতে তাকে নিজের সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছে।
আকবর বিজয়ীর হাসি গোপন করলেন। চিত্তরগড় বিজয়ের পর হত্যা করা যোদ্ধাদের কথা মাঝে মাঝে তার মনে এসেছে কিন্তু সে ব্যাপারে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই। চিত্তরগড় ধ্বংস করার আদেশ প্রদানের বিষয়েও তার মাঝে কোনো খেদ নেই-সে সময় রাজস্থানের বিস্তির্ণ মরুভূমি থেকে শহর ধ্বংসের লাল এবং কমলা রঙের আগুনের শিখা এবং সাথে ধূসর বোয়ার কুণ্ডলী কয়েক দিন পর্যন্ত দেখা গেছে। তাঁর নিষ্ঠুরতার প্রদর্শনী প্রত্যাশিত ফল প্রদান করেছে। আকবর রাহুম্ভর নামের আরেকটি রাজপুত দুর্গশহর অবরোধ করেছিলেন যেটা এর নিরেট ইটের দেয়াল এবং উঁচু মিনার বিশিষ্ট দুর্ভেদ্য গঠনের জন্য সমগ্র হিন্দুস্তানে সুপরিচিত ছিলো। কিন্তু হার মানতে সেটি এক সপ্তাহেরও কম সময় নিল। রায় সূর্যন যদি তার বশ্যতা স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে সকল নেতৃস্থানীয় রাজপুত যুবরাজ তাঁর আধিপত্য মেনে নিয়েছে। অবশ্য মেওয়ারের রানা উদয় সিং ছাড়া। চিত্তরগড় এবং এর আশেপাশের এলাকা হারিয়ে সে যদিও আরাভাল্লির পার্বত্য এলাকায় আত্মগোপন করে আছে কিন্তু তারপরেও পরাজয় মেনে না নিয়ে আকবরের সেনাবাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রেখেছে এবং চিত্তরগড়ের পতনের পর এখনো এক বছর অতিক্রান্ত হয়নি। উত্তর ভারতে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজস্থানী যুবরাজগণ এবং তাদের জাফরানী যোদ্ধারা যদি পাশে থাকে তাহলে আকবরের কাছে কোনো কিছুই আর অজেয় থাকবে না।
তোমার প্রভুকে বলবে আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করেছি এবং রাহুম্ভরের সকল অধিবাসীকে পরিত্রাণ প্রদানের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আজ রাত পর্যন্ত সে সম্মানের সঙ্গে তার দুর্গে অবস্থান করতে পারে, কিন্তু আগামীকাল ভোরে যখন সূর্য দিগন্ত থেকে এক বর্শা উচ্চতায় অবস্থান করবে তখন আমি তাকে এবং তার সেনাপতিদের আমার শিবিরে অভ্যর্থনা জানাতে চাই এবং আমাদের মিত্রতার উৎসব উদযাপন করতে চাই।
ঐ দিন রাতে একজন অনুলেখককে আকবর তার তাবুতে ডাকলেন। কোনো কোনো বিশেষ মুহূর্তের শক্তিশালী আবেগ ঘন অনুভূতি তিনি নিজে লিখে রাখতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু এখনো লিখতে জানেন না বলে তিনি সত্যিকার অনুতাপ বোধ করলেন। আগ্রায় ফিরে তিনি একজন বা একাধিক সভা ঘটনাপঞ্জি লেখক নিয়োগ করবেন। তারা তার এবং তাঁর পিতা ও পিতামহের রাজত্বকালের কৃতিত্বসমূহ লিপিবদ্ধ করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে একজন অনুলেখকই যথেষ্ট। আকবর অপেক্ষা করলেন যতোক্ষণ পর্যন্ত না তরুণ অনুলেখকটি তার গলায় ঝুলানো কালির দোয়াতটির মুখ খুলে এবং লেখার পালকে ধার দিয়ে প্রস্তুত হলো। আকবর তলিপি প্রদান শুরু করলেন।
