রাজা রবি সিং এর কন্ঠে একটি শান্তভাব এবং সম্মান সূচক প্রশংসার রেশ পাওয়া গেলো। বস্তুত রবি একজন রাজপুত, আকবর ভাবলেন। যদিও এমন আত্মবিসর্জনের ঘটনা আকবরের কাছে অপরিচিত এবং বিতৃষ্ণাজনক লাগছিলো তবুও তিনি ঐসব মহিলা ও তরুণীদের জন্য কিছুটা হলেও শ্রদ্ধা অনুভব করলেন। ওদের কষ্ট কমার জন্য ঐ আগুন সাদা হয়ে উঠুক, তিনি প্রার্থনা করলেন। তারপর রবিকে বললেন, আপনার কথা যদি সত্যি হয় তাহলে ওদের মরণ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নেয়া উচিত। আরো বেশি সংখ্যক কামান করিডোরের ভিতর দিয়ে পাঠানোর নির্দেশ দিন এবং সেগুলিকে যতোটা সম্ভব আড়াল করে দুর্গমুখী পথের দিকে মুখ করে স্থাপন করতে বলুন। আর বন্দুকধারী এবং তীরন্দাজেরা যেনো ভোরবেলায় সুরঙ্গ থেকে বেরিয়ে অবস্থান নেয়। যে মুহূর্তে দুর্গের প্রবেশ দ্বারের পিছনে তৎপরতা দেখা যাবে তখনই অশ্বারোহী এবং হস্তী বাহিনীকে করিডোরের সুরঙ্গে ঢোকার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলুন। কারণ হাতি এবং ঘোড়া সুরঙ্গের অন্ধকারে অবস্থান করতে থাকলে তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে।
পরদিন ভোর বেলা চিত্তরগড়ের দুর্গগামী ঢালু পথের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া করিডোরের ঠিক বাইরে আকবর দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ বেশ পরিধান করে আছেন এবং তাঁর সেনাপতিরা তাঁকে ঘিরে রেখেছে। সোনার পাত মোড়া বক্ষ-বর্ম তাঁর শরীরে আট করে বাঁধা, মাথায় শিরোস্ত্রাণ এবং কোমরে ঝোলান রয়েছে পিতামহের তলোয়ার আলমগীর-এটি নতুন করে শান দিয়ে ধারালো করা হয়েছে। গতকাল রাতে মোগল সৈন্যরা যখন করিডোরের কাছে এবং ঢালের কাছাকাছি তাড়াহুড়া করে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিলো তখন চিত্তরগড়ের প্রতিরোধকারীরা তাঁদের উপর বিক্ষিপ্তভাবে গুলি বর্ষণ করে। গুলিতে কামান টানতে থাকা তিনটি ষাড় নিহত হয়। বাকি ষাঁড়গুলি ভয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়লে কামানটি উল্টে পড়ে এবং কিছু তীরন্দাজ আহত হয়। কিন্তু বাকি কামানগুলি যথাযথ জায়গায় স্থাপন করার সময় রাজপুতরা চুপচাপ ছিলো, বোঝা যাচ্ছিলো পরের দিনের শেষ আক্রমণের জন্য তারা তাদের শক্তি এবং বারুদ মজুত রাখছিলো।
ভোর হওয়ার অনেক আগেই চিত্তরগড়ের পাহারা মিনারের ফাঁক দিয়ে যুদ্ধ ঢাকের উচ্চ শব্দ ভেসে আসতে থাকে। আকবর এতো প্রচণ্ড ঢাকের শব্দ আগে কখনোও শুনেননি। বেশ কয়েক ঘন্টা পেরিয়ে গেছে কিন্তু ঢাকের ছন্দ সম্মোহনের মতো অব্যাহত রয়েছে, তার সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে যুক্ত হচ্ছে শিঙ্গার আর্তনাদ। মাঝে মধ্যে একত্রে অনেক কণ্ঠের সম্মিলিত গর্জন ভেসে আসছিলো সব শব্দকে ছাপিয়ে। সেটা প্রতিরোধকারীদের হিন্দু দেবতার কাছে প্রার্থনার রব বলে রবি সিং ব্যাখ্যা করে।
তারা কখনো আক্রমণ করবে রবি সিং?
আর বেশি দেরি নেই। তারা ওপিয়ামের প্রভাবে এতোই উন্মত্ত হয়ে উঠেছে যে নিজেদের আর বিরত রাখতে পারবে না।
পনেরো মিনিট পর ধীরে ধীরে বিশাল লোহার গজাল বসানো এবং ধাতব বেষ্টনী যুক্ত দুর্গ দ্বারটি উপরে উঠে যেতে লাগলো এবং এর পেছনের কাঠের দরজাটি খুলে যেতে লাগলো। কাঠের দ্বারে পর্যাপ্ত ফাঁক সৃষ্টি হতেই জাফরানী পোষাক পরিহিত এক যোদ্ধা একটি সাদা ঘোড়া নিয়ে বাকা তলোয়ার উঁচিয়ে ঢালু পথের উপর দিয়ে ছুটে এলো। তার পিছু পিছু অসংখ্য ঘোড়সওয়ার বেরিয়ে এলো। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলো বয়স্ক এবং তরুণ পদাতিক যযাদ্ধারা। সকলে জাফরানী যুদ্ধ পোষাক পরিহিত এবং সকলের হাতে অস্ত্র ঝলকাচ্ছে। তারা যে রণহুঙ্কার দিচ্ছিলো আকবর তার অর্থ বুঝলেন না। রবি সিং এর অর্থ বুঝিয়ে দিলো, জীবন সস্তা কিন্তু সম্মান সস্তা নয়।
তোমরা সময় বুঝে আক্রমণ শুরু করো। আকবর গোলন্দাজ, বন্দুকধারী এবং তীরন্দাজদের আদেশ দিলেন। এর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নিক্ষিপ্ত কামানের গোলা একটি কালো ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা যোদ্ধাকে আঘাত করলো। সে যখন পড়ে গেলো তার উপর আরেকটি ঘোড়া হোঁচট খেলো এবং পিঠের সওয়ারীকে নিয়ে ঢালু পথটির নিচু পাঁচিল অতিক্রম করে প্রায় একশ ফুট নিচের মাটিতে আছড়ে পড়লো। কিছু যোদ্ধা বন্দুকের গুলি বা তীর বিদ্ধ হলো, কিন্তু বাকিরা নিরবিচ্ছিন্ন গতিতে এগিয়ে এলো হতাহতদের ঠেলে, ঢাল থেকে নিচে ছিটকে পড়া কিম্বা বহমান জাফরানী স্রোতের নিচে পদদলিত হওয়ার দিকে তাদের খেয়াল নেই। আকবরের প্রথম গোলন্দাজ যখন কামানের স্পর্শরন্ধ্রে সবেমাত্র অগ্নিসংযোগ করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই তার সামনে হাজির হলো সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়া নেতৃত্বদানকারী যোদ্ধাটি। অগ্নিসংযোগের আগেই দুইজন গোলন্দাজকে তলোয়ার চালিয়ে কেটে ফেললো সে, তারপর দ্বিতীয় কামানটির গোলন্দাজের দিকে ধেয়ে গেলো। কিন্তু এই গোলন্দাজটি আক্রান্ত হওয়ার আগেই কামানে অগ্নিসংযোগ করতে সক্ষম হলো। কামানের গোলাটি একদম কাছ থেকে প্রচণ্ড শক্তিতে নেতাটির পেটে আঘাত করলো এবং তার দেহের উপরের অংশ নিচের অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়লো। আশ্চর্যজনকভাবে তার ঘোড়াটি অক্ষত রইলো এবং আকবরের সৈন্যদের অবস্থানের দিকে ছুটে গেলো। সেটার সাদা শরীর তখন কালচে রক্তে রঞ্জিত এবং সেটার রেকাবে তখনো সওয়ারীর পা আটকে আছে।
