সাবধান জাহাপনা। আপনি যদি তাঁদের দেখতে পান, তারাও আপনাকে দেখতে পাবে এবং আপনার সোনার বক্ষ-বর্ম দেখে আপনাকে চিনেও ফেলতে পারে, মোহাম্মদ বেগ বললো।
আমার সৈন্যরা প্রতিদিন এমন ঝুঁকি নিচ্ছে, কাজেই একই কাজে আমি পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয়, আকবর বললেন। তিনি সেনাকর্তাটির দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখান থেকে দুর্গের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের কিনারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো, সেখানে নজরদারীর জন্য কোনো ধরনের মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে। দুই এক মিনিট তাকিয়ে থাকার পর আকবর লক্ষ্য করলেন দুজন লোক প্রহরা মঞ্চে হাজির হয়ে সূক্ষ্মভাবে মোগলদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের একজন-লম্বা গড়নের এবং কালো দাড়ি বিশিষ্ট, সঙ্গীকে কিছু দেখাতে চাইছে। সূর্যের আলোয় তার আঙ্গুলের আংটির ঝলক এবং চালচলন প্রত্যক্ষ করে আকবর অনুমান করলেন নিশ্চয়ই সে গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবে। আকবর তাঁর সেনাকর্তাটিকে আদেশ করলেন, আমার জন্য দুটি গুলি ভরা বন্দুক আর বন্দুক রাখার তেপায়া এনে দাও, আমি ঐ ভদ্রলোক গুলিকে গুলি করে নিচে ফেলতে চাই।
তৎক্ষণাৎ করিডোরের মুখে অবস্থানকারী দুইজন বন্দুকধারী তাদের বন্দুক এবং তেপায়া আকবরকে দিয়ে দিলো। উপরের দিকে, ছয়ফুট লম্বা বন্দুক তাক করতে হলে আকবরকে মাটিতে অর্ধশায়িত হতে হবে। নিঃশব্দে এবং সতর্কভাবে অত্যন্ত দ্রুত আকবর আংটি পরিহিত লোকটির দিকে বন্দুক তাক করলেন। নিজেকে যতোটা সম্ভব স্থির করার জন্য দম আটকালেন, তারপর গুলি করলেন। বন্দুকের বারুদের তীব্র ধোয়ায় কাশতে কাশতে আকবর দেখলেন লোকটি মঞ্চ থেকে সামনের দিকে ঝুঁকলো এবং তাঁর থেকে কয়েক গজ দূরে ধুপ শব্দে আছড়ে পড়লো। দ্বিতীয় বন্দুকটি নিয়ে প্রস্তুত হওয়ার আগেই তার সঙ্গীটি অদৃশ্য হলো।
মৃতদেহটা নিয়ে এসো, দেখা যাক আমরা কাকে মারতে পেরেছি। আকবর আদেশ দিলেন। দুইজন সৈন্য ভগ্ন দেহটিকে হেচড়ে তাদের কাছে নিয়ে এলো, আকবরের মনে হলো তাঁর গুলিটি লোকটির ডান কানের উপর আঘাত করেছে। তবে তিনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারলেন না, কারণ উপর থেকে পতনের ফলে তার মাথার পেছনের অংশের পুরোটাই রক্তাক্ত হয়ে আছে।
স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে সে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলো কিন্তু আমি তাকে চিনতে পারছি না, মোহাম্মদ বেগ বললেন।
আমিও চিনতে পারছি না, আকবর বললেন, কিন্তু রাজা রবি সিং একে চিনতে পারে যদিও এর চেহারা অক্ষত নেই, মেওয়ার এর বহু নেতা তার পরিচিত।
*
কয়েক মাস আগে কাদা এবং পাথর দিয়ে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা একটি ঢিবির উপর আকবর রাজা রবি সিংকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এখানে দাঁড়িয়ে চিত্তরগড়কে একটু ভালোভাবে দেখা যায়। রাজা রবি বলে উঠলো, জাহাপনা সেদিন আপনি আপনার দক্ষ লক্ষ্যভেদের মাধ্যমে জয় মালকে হত্যা করার পর থেকে দুর্গের মধ্যে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। জয় মালের মৃতদেহ ফেরত দেয়ার সময় যদিও রাজপুতরা আপনার উত্থাপিত আত্মসমর্পণের শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে তবুও পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে তারা তার মৃত্যুতে এবং করিডোরের অগ্রগতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তারা করিডোর এবং এর ভিতর দিয়ে টেনে নেয়া কামান ধ্বংসের জন্য আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু আমরা তাঁদের আক্রমণ সহজেই প্রতিহত করতে পারছি। তাছাড়া ইদানিং আমরা তাঁদের যতো সংখ্যক অন্বেষণকারী দলকে পরাস্ত করেছি তার থেকে অনুমান করা যায় তাদের খাদ্যের মজুতও শেষ হয়ে এসেছে।
এরপর তারা কি করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না জাঁহাপনা। তারা দুইজন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। এসময় হঠাৎ আকবর দেখলেন দুর্গের মধ্যে একই সঙ্গে কয়েক জায়গা থেকে কমলা বর্ণের আগুনের শিখা এবং কালো ধোয়া সর্পিল ভাবে আকাশে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। তিনি সেখানে এধরনের আগুন পূর্বেও দেখেছেন, তবে তা নির্গত হয়েছে এক জায়গা থেকে। রাজা রবি সিং বলেছিলো সেগুলি যুদ্ধে নিহত গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের চিতার আগুন। জয় মালের মৃতদেহ ফেরত দেয়ার পর যে আগুনটি জ্বালা হয়েছিলো সেটা ছিলো ভয়াবহ। কিন্তু এখন যে আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে তার তুলনায় সেটি নিতান্তই তুচ্ছ।
ওখানে কি হচ্ছে রবি সিং?
দুর্গ রক্ষাকারীরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে যে যুদ্ধে জয়ী হওয়া আর তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তারা নিজেরাই নিজেদের মৃত্যু নির্ধারণ করতে চায়। তারা জওহর সম্পাদন করছে। আপনি যে আগুন দেখতে পাচ্ছেন সেগুলি চিতার জন্য জ্বালা কাঠের স্থূপের আগুন। বিশেষ ভাবে তৈরি মঞ্চ থেকে রাজপুত মহিলা এবং তরুণীরা ঐ আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জীবন্ত পুড়ে মরার জন্য। মায়েরা তাদের শিশুদের বুকে চেপে ধরে আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে। আকস্মিক যে কমলা এবং হলুদ বর্ণের আগুনের শিখা লাফিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে, তার কারণ লোকেরা তখন চিতার মধ্যে বালতিতে করে তেল এবং ঘি ঢালছে, যাতে আগুনের তাপ বৃদ্ধি পায় এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা কষ্ট কম পেয়ে দ্রুত মৃত্যুবরণ করে। তাদের স্ত্রী এবং সন্তানেরা আগেই নিহত হলে তারা আর কষ্ট পাবে না এবং শত্রুর হাতে পড়ে লাঞ্ছিতও হবে না এই ধারণা তাদের মনে সাহস যোগাবে। এই সাহসে বলিয়ান হয়ে আগামী কাল সকাল বেলা ঐ রাজপুত পুরুষ এবং তরুণরা তাঁদের জাফরানী যুদ্ধ পোষাক পরিধান করবে। তারপর নিজেদের ভ্রাতৃত্ববোধ কে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য এবং আঘাতের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য সকলে ওপিয়াম মেশান পানি পান করবে। তারপর শেষবারের মতো আকস্মিক বেগে বীরত্বপূর্ণ আঘাত হেনে যতো বেশি সংখ্যক সম্ভব শত্রুকে হত্যা করে নিজেরা মৃত্যুবরণ করবে।
