*
সদ্য তৈরি করা দুটি করিডোরের একটির প্রবেশ পথের সামনে ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন আকবর। তিনি বেশ আশান্বিত বোধ করছেন। যা অনুমান করেছিলেন তার তুলনায় কম সময়ে সেগুলি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত বন থেকে উত্তম মানের কাঠ যোগাড় করা গেছে। বন্দীদের পাথর জোগাড় করার কষ্টসাধ্য কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিলো। আকবরের অনুমান অনুযায়ী চিত্তরগড়ের প্রতিরোধকারীরা কামান বা বন্দুক ছুঁড়ে তাদের বারুদের অপচয় করেনি। চামড়ার তৈরি পর্দা দিয়েও তীরের আক্রমণ অনেকটা প্রতিরোধ করা গেছে। তারপরও করিডোর তৈরির সময় প্রতিদিন প্রায় একশ মজুর নিহত হয়েছে। এই দরিদ্র লোক গুলিকে রৌপ্যমুদ্রার লোভ দেখিয়ে কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিলো। আকবর তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জীবিত এবং মৃত মজুরদের নামের তালিকা প্রস্তুত করার আদেশ দেন, যাতে যুদ্ধ জয়ের পর জীবিতদের এবং মৃতদের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা যায়।
যে করিডোরটির ভিতর আকবর প্রবেশ করছিলেন সেটা বিশাল আকারে তৈরি করা হয়েছে। মোহাম্মদ বেগকে এ কাজের তদারকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিলো। সে গর্বের সঙ্গে নিশ্চয়তা প্রদান করে বলেছে- এটি পাশাপাশি দশজন অশ্বারোহীর স্থান সংকুলানের মতো চওড়া এবং একদল ষাঁড় ছোট আকারের কামান সহ এর মধ্যে এটে যাবে। তাছাড়া সেটি একটি বড় আকারের যুদ্ধ হাতি হেঁটে যাওয়ার মতো উঁচু।
মোহাম্মদ বেগ, করিডোরটি এখন পর্যন্ত কতোদূর প্রসারিত হয়েছে? আকবর জিজ্ঞাসা করলেন।
এর শেষ মাথা দুর্গমুখী পথের গোড়া থেকে এখনো প্রায় একশ গজ দূরে আছে। তিনদিন আগে আমরা একটি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। এক রাজপুত যোদ্ধা করিডোরের ছাদের কয়েকটি তক্তায় আগুন ধরাতে সক্ষম হয়, কিন্তু আমাদের সাহসী মজুররা শিবিরের কুয়া থেকে বালতি করে পানি নিয়ে সেই আগুন নিভিয়ে ফেলে। ফলে করিডোরের সামনের অংশ ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
এমন লোকদের নাম আমাকে জানাবেন যারা বুদ্ধির জন্য বিশেষ পুরষ্কারের দাবিদার।
জ্বী জাহাপনা।
এখন আমি নিজে ভিতরটা যাচাই করে দেখতে চাই। আকবর তার কালো ঘোড়াটির পাঁজরে আলতো গুতো মেরে করিডোরের প্রবেশ পথের ভিতর ঢুকে গেলেন, তাঁকে অনুসরণ করলেন মোহাম্মদ বেগ। পুরু কাঠের ছাদের জন্য ভেতরটা বেশ ঠাণ্ডা, কিন্তু ভেজা মাটি, ধোয়া, ঘাম, মানুষ এবং পশুর প্রস্রাব ও মলের সম্মিলিত গন্ধ আকবরের নাকে ধাক্কা দিলো। মাঝে মধ্যে দেয়ালে গোজা মশাল থেকে কিছুটা আলো পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি মশালের সামনে একজন করে মজুর চামড়ার বালতিতে বালু এবং পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যাতে ছাদের রজন কাঠে আগুন লেগে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তা নেভাতে পারে। এই সব মজুররা কেবল ছিন্ন পিরান এবং নেংটি পরে আছে। আকবর তাঁদের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় তারা ঝুঁকে সম্মান জানালো। মাঝে মধ্যে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে তাঁদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বাক্য বিনিময় করছিলেন। তারা কোথা থেকে এসেছে কিম্বা তাঁদের পরিবারে কতোজন সদস্য আছে, এই জাতীয় প্রশ্ন করছিলেন তিনি। আবার এগিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাদের একটি করে মুদ্রাও উপহার দিচ্ছিলেন। একজন কুচকে যাওয়া চামড়া বিশিষ্ট সাদা চুলের মশালধারী আকবরের পাশাপাশি হাটছিলো আর বর্ণনা করছিলো দিল্লীর কাছে গুরগাঁও নামের ছোট গ্রামে তার সর্দারীর গল্প। সেই মুহূর্তে একটি ভোতা শব্দের সঙ্গে করিডোরের দেয়াল কেঁপে উঠলো, ছোট ছোট বহু পাথর এবং বড় একটি দুটি দেয়াল থেকে খসে পড়লো। মশালধারীটি সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে পড়ল কিন্তু আকবরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কোনো রকমে আবার হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠে দাঁড়ালো। আকবর তখন তাঁর পিছিয়ে যেতে চাওয়া ঘোড়াটিকে শক্তভাবে টেনে ধরে রেখেছেন। মশালধারীটি লজ্জিত ভাবে বললো, আমি দুঃখিত জাঁহাপনা। আপনার মতো দাঁড়িয়ে থেকে কামানের গোলার মোকাবেলা করার সাহস আমার নেই।
তুমি তোমার অবস্থানে স্থির থেকেই যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছো, আকবর বললেন। আর একটা কথা মনে রাখবে। কথাটি আমার বাবা যুদ্ধ সম্পর্কে বলেছেন। তুমি যদি কোনো বিস্ফোরণ বা সংঘর্ষের শব্দ শুনতে পাও, বুঝে নেবে তুমি আঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছ।
মশালধারীটি সংক্ষেপে হাসলো। আমি মনে রাখবো জাঁহাপনা। আকবর লোকটিকে কয়েকটি মুদ্রা দিলেন এবং সে হিন্দু কেতায় দুহাত মাথার উপর তুলে তাকে অভিবাদন জানালো। আকবর ঘোড়া চালিয়ে করিডোরের সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন। একটু পরেই তিনি এর আকাবাকা বাঁক সত্ত্বেও শেষ মাথার হালকা আলো দেখতে পেলেন। মাঝে মাঝে উভয় পক্ষের বন্দুক ছোঁড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো। একবার তিনি একটি মরণ চিৎকার শুনতে পেলেন, বুঝা গেলো আরেকজন মজুর নিহত হয়েছে।
শীঘ্রই আকবর করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছালেন। সেখানে পাথর এবং কাঠ জড়ো করে রাখা ছিলো অগ্রভাগ বর্ধিত করার জন্য। সুরঙ্গের একটু ভেতরে মজুররা শুকনো মাটিতে পানি মেশাচ্ছিলো দেয়ালকে সুসংহত করার সিমেন্ট হিসেবে ব্যবহারের জন্য। আকবর এবং মোহাম্মদ বেগ ঘোড়া থেকে নামলেন। জাহাপনা আপনি এখানে এলে চিত্তরগড়ের প্রতিরক্ষা প্রাচীরটি ভালোভাবে দেখতে পাবেন, একজন সেনাকর্তা একটু দূরে খোলা জায়গায় অবস্থিত ঢিবির কাছ থেকে বললো।
