*
সেই সন্ধ্যায় আকবর তার যুদ্ধকালীন প্রিয়বেশ সোনার পাত মোড়া বক্ষ বর্মের কাঁধে ডুবন্ত সূর্যের প্রতিফলন নিয়ে গাঢ় লাল বর্ণের যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ তাবুতে প্রবেশ করলেন। তাঁর চেহারা বিষণ্ণ। তাবুটিতে যুদ্ধমন্ত্রণাসভা আহ্বান করা হয়েছে। কার্যকর হতে পারে এমন কোনো নতুন যুদ্ধ কৌশল আকবরের মাথায় খেলছে না। অর্ধবৃত্তাকারে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে থাকা আহমেদ খান এবং অন্যান্য সেনাপতিদের মাঝখানে তার জন্য নির্ধারিত ছোট আকারের সিংহাসনে তিনি আসন গ্রহণ করলেন। এই মুহূর্তে এদের সহযোগিতা এবং উপদেশ তিনি যতোটা প্রয়োজন মনে করছেন তেমনটি আর কখনোও করেননি। তাঁর এটাও মনে হচ্ছে যে এই দলটি খুবই অসঙ্গতিপূর্ণ। যেমন এদের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ বেগ, তিনি মোগল সেনাবাহিনীতে আহমেদ খানের চেয়েও পুরানো। যৌবনে তিনি পানি পথে বাবরের পক্ষে লড়েছে, পরে হুমায়ূনের পক্ষে। তারপর রয়েছে চৌকো কাধ বিশিষ্ট আলী গুল। সে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং তাজাকিস্তানের লোক। সে কেবল হুমায়ূনের শেষের দিকের কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। বাকিরা আরো নতুন অনুগামী। যেমন বিশাল এবং শক্ত গড়নের অধিকারী রাজা রবি সিং, এই মুহূর্তে সে সশব্দে কাঠবাদাম চিবুচ্ছে। সে একজন রাজপুত এবং হিমুকে পরাজিত করার পর পর সে আকবরের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। আকবরের এই সেনাপতিদের পরিচয় বা বয়স যাই হোক না কেনো, তাঁদের প্রত্যেকের মুখে তখন লজ্জার ভাব বিরাজ করছিলো।
আজকের আক্রমণের সময় কতজন নিহত হয়েছে? আকবর জিজ্ঞাসা করলেন।
আহমেদ খান উত্তর দিলেন। আমরা আমাদের শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধ হাতিগুলিকে হারিয়েছি এবং তিনশোর উপরে সৈন্য মারা গেছে। আরো অনেকে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়েছে, তারা হয়তো বাঁচবে না।
অনেক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও এই আক্রমণের প্রয়োজন ছিলো, আকবর বললেন। আমাদের আরো অভিনব কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে যেমনটা আমরা হাতির হাওদা গুলিকে তীর এবং গুলি রোধক করার ক্ষেত্রে করেছি। আমরা চিত্তরগড় দখল করার আগে রাজা উদয় সিং যাতে আরো সমন্বিত সেনাবাহিনী গঠন করতে না পারে বা অন্যান্য রাজপুতদের সঙ্গে মিত্রতার মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ না পায় সেই উপায় বের করতে হবে।
তার পক্ষে মিত্র যোগাড় করা সম্ভব হবে না, রবি সিং শান্ত স্বরে বললো।
সমগ্র রাজস্থানে একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে মেওয়ার এর রানারা পরস্পরের প্রতি বৈরী মনোভাব সম্পন্ন।
শুনে খুশি হলাম। কিন্তু কেউ কি বলতে পারেন, আগে কখনোও চিত্তরগড়কে দখল করা সম্ভব হয়েছিলো কিনা, বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া?
হ্যাঁ, মোহাম্মদ বেগ উত্তর দিলো, তার বন্ধুর ও ভাঙ্গা নাকটি চুলকাতে চুলকাতে। দুইশ বছরের বেশি সময় আগে আলাউদ্দিন খিলজি চিত্তরগড় জয় করেছিলো এবং ইদানিং কালে গুজরাটিরা।
আমরা তাঁদের যুদ্ধ কৌশল থেকে কিছু শিখতে পারি কি?
আলাউদ্দিন খিলজি কীভাবে চিত্তরগড় দখল করেছিলেন আমি তা জানি না, সে কাহিনী ইতিহাসের গর্ভে অনেক আগে হারিয়ে গেছে। আপনার পিতা চাম্পনির অবরোধ করার পর আমি গুজরাটে ছিলাম এবং তখন এক বুড়ো গুজরাটের কাছে আমি চিত্তরগড় দখলের কাহিনী শুনি। সে বলে, তারা ঢিবির অবরোধ সামনে এগিয়ে নিয়ে-এখন আমরা যেমন করছি, সেভাবেই প্রথমে সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি তারা করিডোরের মতো লম্বা আড়ালও তৈরি করেছিলো পশুর চামড়া মোটা ভাবে স্থাপন করে এবং সেটার সাহায্যে ঢালু দুর্গমুখী পথের বেশ খানিকটা অগ্রসরও হয়েছিলো। কিন্তু আমি জানতে পারি তাঁদের চূড়ান্ত জয় হয়েছিলো অবরুদ্ধ দুর্গবাসীদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ এবং রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণে। আমি করিডোর এর মতো ঢাকনার কথা আগেই হয়তো বলতাম কিন্তু আমার মনে হয়েছে সেটার সাহায্যে তীরের আক্রমণ ঠেকানো গেলেও কামান বা বন্দুকের গুলি ঠেকানো সম্ভব হবে না।
কিন্তু ঢাকনাটির পাশে পাথর ও মাটি লাগিয়ে এবং ছাদে পুরু তক্তা লাগিয়ে আমরা কি সেটার সহ্যক্ষমতা বাড়াতে পারতাম না? আহমেদ খান জিজ্ঞাসা করলো।
সেটা করতে অনেক সময় লাগবে এবং অনেক প্রাণহানিও ঘটবে, আলী গুল বলে উঠলো।
কিন্তু এ পর্যন্ত করা নিষ্ফল আক্রমণগুলিতেও আমাদের অনেক প্রাণহানি ঘটেছে, আকবর যুক্তি দিলেন। আমার পিতামহ বাবর একবার বলেছিলেন যে কোনো সম্রাটের যুদ্ধ জয় বা রাজ্যের প্রসার ঘটানোর জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তুতি থাকতে হবে-বিশেষ করে তার নিজের, নিজ পরিবারের এবং নিকটবর্তী অনুগামীদের জীবন। একমাত্র বিজয় অর্জন করার পরেই সে যুদ্ধে নিহতদের পরিবারকে সহানুভূতি প্রদর্শন করতে পারে এবং সাধ্য মতো ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে পারে। করিডোরের মতো ঢাকনার বুদ্ধিটি আকর্ষণীয়। আপনারা সেটা তৈরির খসড়া পরিকল্পনা অঙ্কন করুন। যথেষ্ট পাথর এবং কাঠ জোগাড় করার জন্য লোক পাঠান। যারা করিডোরটি নির্মাণ করবে তাদের নিরাপত্তার জন্য গুজরাটিদের মতো মোটা চামড়ার আবরণ তৈরি করুন। এর সাহায্যে তীরের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হবে। তাছাড়া রাজপুতরা অনির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে অহেতুক কামান বা বন্দুক ছুড়বে না, তাঁদের বারুদের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়।
