আকবর তার উঁচুপাটাতনের উপর থেকে দেখতে পেলেন চিত্তরগড়ের প্রতিরোধকারীরা দুর্গের রক্ষাপাচিলের কাছে বিপুল সংখ্যায় সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে। তারা আঁচ করতে পেরেছে তাদের উপর আরেকটি আক্রমণ শুরু হতে যাচ্ছে। মোগলরা বন্দুকের সীমানার বাইরে থাকলেও রাজপুতরা দুর্গ থেকে তাঁদের দিকে তীর বর্ষন করলো। অনেক তীর গতি হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো এবং হাতি বা সৈন্যদের বর্ম ভেদ করতে পারলো না, বাকিগুলি ঢাল দিয়ে প্রতিরোধ করা হলো। কিন্তু কিছু তীর ঘোড়াগুলিকে এবং অপেক্ষাকৃত কম প্রতিরোধ বিশিষ্ট পদাতিক সৈন্যদের আহত করলো।
আহমেদ খান, আক্রমণে সফল হওয়ার জন্য আমাদের এখনই অগ্রসর হওয়া উচিত। হাতিগুলিকে সামনে আগানোর আদেশ দিন এবং তাদের রক্ষা করার জন্য কামান ও তীর ছুঁড়তে বলুন। আমি অশ্বারোহীদের প্রথম দলের সঙ্গে হাতিবাহিনীর পিছু পিছু অগ্রসর হবো।
আহমেদ খানের নির্দেশ পেয়ে অতিরিক্ত বোঝায় ভারাক্রান্ত হাতিগুলি ধীরে শুষ্ক পাথুরে মাটির উপর দিয়ে অগ্রসর হতে লাগলো। এবারও প্রতিরোধকারীদের তীরের আক্রমণ তেমন সফল হলোনা। তীরগুলি হাতির ইস্পাতের বর্মে বাড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলো কিম্বা কোনো ক্ষতি না করে হাওদার কাঠের আচ্ছাদনে বিধে থাকছিলো। কিন্তু মোগলরা যখন বন্দুকের গুলির আওতায় পৌঁছালো তখন একটি হাতি হঠাৎ থমকে গেলো, মনে হলো গুলি খেয়েছে। তারপর সেটি আবার তার সঙ্গীদের অনুসরণ করে শ্ৰান্তভাবে এগুতে শুরু করলো কিন্তু হাটার সময় পাথুরে মাটির উপর সৃষ্টি করলো রক্তের রেখা। মাঝে মধ্যে দুই এক জন সৈন্য আহত হয়ে হাওদার উপর থেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলো কিন্তু তীব্র উত্তেজনা নিয়ে আকবর প্রত্যক্ষ করলেন হাতিবাহিনী পূর্বের যেকোনো আক্রমণের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর হতে পারছে। খুব শীঘ্রই তারা দূর্গগামী পথের পাদদেশে পৌঁছে যাবে। এখন সময় হয়েছে তাঁর নিজের অশ্ব বাহিনীকে প্রস্তুত করার।
সকলে আমাকে অনুসরণ করো। চিত্তরগড় আমাদের হবে, নিজের ঘোড়াটি দুলকি চালে ছুটিয়ে আকবর চিৎকার করে উঠলেন। হাতিগুলি যদি দুর্গগামী পথের কাছে পৌঁছাতে পারে তাহলে তিনি তার অশ্ববাহিনী নিয়ে পরবর্তী আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত থাকতে চান। এ সময় তিনি দেখলেন কিছু আগুন ভরা মাটির পাত্র চিত্তরগড়ের দুর্গপ্রাচীর থেকে হাতিগুলির দিকে ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেগুলি হাতিরগুলির উপর পড়লো না বরং কোনো ক্ষতি না করে ছড়িয়ে থাকা পাথরের উপর বিস্ফোরিত হলো। হঠাৎ দুর্গের ধাতু নির্মিত প্রধান ফটকের মাঝে সংযুক্ত ছোট দড়জা দিয়ে কমলা-পাগড়ি পড়া কিছু রাজপুত বেরিয়ে এলো। প্রথম লোকটি জ্বলন্ত কাঠি দিয়ে তার হাতে থাকা বড় একটি মাটির পাত্রে আগুন ধরাল। তারপর পাত্রটিতে বাধা দড়ি ধরে সেটা মাথার উপর ঘুরাতে ঘুরাতে ঢালু পথ বেয়ে হাতিগুলির দিকে ছুটে আসতে লাগলো। তাকে অনুসরন করে আসা অন্য রাজপুতদের হাতেও অনুরূপ আগুনের হাড়ি দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের সরোগোল তখন তুঙ্গে উঠেছে, আকবর দেখলেন হাওদার উপর থাকা সৈন্যরা বন্দুক এবং তীর ছোঁড়া শুরু করেছে। গুলি খেয়ে অনেক রাজপুত আগুনের পাত্রসহ ঢালু পথের উপর গড়িয়ে পড়ল কিন্তু বাকিদের দৌড় অব্যাহত থাকলো। বন্দুকের গুলিতে হাড়ি ফেটে তাদের একজনের গায়ে আগুন লেগে গেলো। একসময় অগ্রসরমান মানব মশালটি অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়ে লুটিয়ে পড়লো কিন্তু তার আগে হাত তুলে সাথীদের এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ প্রদান করলো। কিছু রাজপুত আক্রমণকারী, গুলি বা তীর বিদ্ধ হয়ে পথের পার্শ্বস্থ নিচু দেয়াল টপকে নিচের মাটিতে আছড়ে পড়লো। বাকিরা তাঁদের সঙ্গীদের মৃত্যুদৃশ্য উপেক্ষা করে এবং তাঁদের দিকে ধাবিত গুলি বা তীরের তোয়াক্কা না করে এগিয়ে আসতে লাগলো।
রাজপুতরা দূর্গ থেকে বের হয়ে আসার এক দুই মিনিট পরের ঘটনা। তাদের সর্ব সম্মুখে থাকা লোকটি তার হাতের জ্বলন্ত পাত্রটি আকবরের প্রথম হাতিটির দিকে ছুঁড়ে মারলো, হাতিটি তখন দুর্গগামী ঢালু পথটির উপর সবেমাত্র সেটার সামনের একটি পা রেখেছে। লোকটি এক মুহূর্ত পর কপালে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়লো কিন্তু তার ছুঁড়ে দেয়া পাত্রটি প্রথম হাতিটির মাথায় বিস্ফোরিত হলো এবং আলকাতরার তরল আগুন সেটার বর্ম বেয়ে ছড়িয়ে পড়লো। আগুন সম্ভবত হাতিটির চোখ আক্রান্ত করলো অথবা বর্মের ভিতর ঢুকে গেলো কারণ, ব্যাথায় সেটি পাগলের মতো মাথা দুলিয়ে আর্তচিৎকার করতে লাগলো এবং হুড়মুড় করে ঘুরে পেছনের হাতিটিকে আঘাত করলো, একই সাথে পেছনের হাতিটির হাওদায় আগুন লাগিয়ে দিলো। ছুটে আসা রাজপুতদের মধ্যে যারা বেঁচে গিয়েছিলো তাঁদের ছোঁড়া পাত্রগুলিও তখন লক্ষ্যভেদ করলো।
আতঙ্কিত আকবর দেখলেন আগুন আক্রান্ত হাতিগুলির হাওদা থেকে তাঁর সৈন্যরা মাটিতে লাফিয়ে পড়ে পিছিয়ে আসতে লাগলো। কেউ কেউ মাটিতে গড়িয়ে গায়ের অগুন নেভানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো। আরো হাতি ঘুরে যেতে শুরু করলো শরীরে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ে। আকবর দেখলেন একজন মাহুত তার হাতিটির মাথায় ইস্পাতের শলাকা গেথে দিলো। মাহুতরা আহত হাতিদের উন্মত্ততা রোধ করার জন্য এভাবে তাদের হত্যা করে। বিশাল হাতিটি সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে স্থির হয়ে রইলো। আরেকজন মাহুত মনে হলো ততোটা সাহসী নয়। সে তার হাতির ঘাড় থেকে লাফিয়ে নেমে দৌড়ে পালালো। চালক বিহীন হাতিটি হাওদায় জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ে উন্মত্তের মতো মোগলদের তৈরি করা কৃত্রিম ঢিবির দিকে ছুটে এলো। একটি ঢিবির সাথে সংঘর্ষের পর সেটি গড়িয়ে পড়লো। পড়ার পর সেটার অরক্ষিত পেটটি আকবরের বন্দুকধারীদের নিশানার শিকার হলো। মৃত্যুবেদনায় সেটি জ্বলন্ত হাওদাসহ প্রচণ্ড শক্তিতে গড়ান মেরে তাতে আটকা পড়া সৈন্যদের পিষ্ট করে তাদেরও মরণ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলো। মানুষ এবং পশুর মাংসপোড়া তীব্র গন্ধ তখন বারুদের গন্ধের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। আকবরের নাকে সেই গন্ধ পৌঁছালো এবং তিনি বুঝতে পারলেন এই আক্রমণটি পূর্বের সকল আক্রমণের মতোই ব্যর্থ হয়েছে। নিষ্ফল মৃত্যুর হাত থেকে সৈন্যদের বাঁচানোর জন্য তিনি হাত তুলে ইশারা করলেন পিছিয়ে আসার এবং নিজের ঘোড়াটিকেও ঘুরিয়ে নিলেন। তিনি এই অচল অবস্থা কীভাবে অতিক্রম করবেন?
