বালকটির ভাইয়েরা যখন জানতে পারলো সে তথ্য প্রকাশ করে দিয়েছে তখন তারা তাদের ছোটভাই এর প্রতি যে প্রতিক্রিয়া দেখালো তাতে রাজপুতদের নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটলো। তারা বালকটিকে আক্রমণ করে তার গলাটিপে মারার চেষ্টা করে কিন্তু রক্ষীরা বাধা দেয়ায় ব্যর্থ হয়। কিন্তু পরের দিন তারা আবারও আক্রমণ করে যখন তাদের তিনজনকে অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গে অবরোধ তৈরির জন্য পাথর ভাঙ্গার কাজে নিয়োগ করা হয়। এবারে সবচেয়ে বড় ভাইটি বালকটির মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করলো। যখন আক্রান্ত বালকটির কাছ থেকে তার ভাইকে সবলে টেনে সরানো হচ্ছিলো সে চিৎকার করে বলে, তুমি নাস্তিক আক্রমণকারীদের কাছে তথ্য ফাঁস করেছে। তুমি আর আমার ভাই নও। এমনকি তুমি এখন এক নজন রাজপুতও নও।
আকবর ঘটনাটি শুনে বালকটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, ভালো কাপড় পড়িয়ে শিবিরের রান্নাঘরে কাজে নিয়োজিত করার আদেশ দেন। এসম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, খাবারের প্রতি দুর্বলতার কারণে চিত্তরগড়ের আক্রমণকারীদের রান্নাঘরে কাজ করা তার উপযুক্ত নিয়তি। কিন্তু বালকটির কাছ থেকে চিত্তরগড়ে প্রবেশ করার কোনো গোপন পথ সম্পর্কিত তথ্য উঘাটন করা গেলো না। বয়স্ক বন্দীদের বলপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতন করেও এ জাতীয় কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। হয়তো সেখানে প্রবেশের কোনো গোপন পথ আদতে নেই।
আকবর এবং তাঁর সেনাপতিরা দুর্গে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু তার শুরুর দিকের সাফল্যের আশা ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছিলো। তিনি আদেশ দিয়েছিলেন দুর্গ থেকে বর্ষণ করা কামানের গোলার বিপরীতে তার সৈন্যরা ঢেউ এর পরে ঢেউ এর মতো করে আক্রমণ চালাবে। উদ্দেশ্য মালভূমি থেকে শহরের প্রধান ফটক পর্যন্ত পাঁচশ গজ দীর্ঘ সর্পিলভাবে উপরের দিকে প্রসারিত পথটিকে আঘাত করা। প্রধান ফটকটি পাহাড়ের বর্ধিত অংশের শীর্ষে অবস্থিত। কিন্তু আকবরের আক্রমণকারী সৈন্যদের কেউ পথটির নিচ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছিলো না। যখনই তারা ঘোড়া ছুটিয়ে পথটির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো-আকবর অসহায়ভাবে দেখছিলেন, কমলা রঙের পাগড়ি পরিহিত রাজপুতরা মোগলদের ছোঁড়া কামান এবং গাদা বন্দুকের তোপ উপেক্ষা করে চিত্তরগড়ের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের পেছন থেকে মোগল সৈন্যদের দিকে গাদাবন্দুকের গুলি এবং বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়ছিলো। এতে মোগল সৈন্য এবং তাঁদের ঘোড়াগুলি বিপুল সংখ্যায় মারা পড়ছিলো অথবা আহত হচ্ছিলো এবং অনেক আহত সৈন্য দুর্গের সামনের উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকছিলো। হতাশ আকবর দেখছিলেন তাঁর আরো সৈন্য মারা পড়ছে যখন তারা তাদের আহত সঙ্গীদের নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলো।
উদ্ধার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ক্রমান্বয়ে এতো সৈন্যের মৃত্যু হলো যে আকবর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হলেন সেনা কর্তাদের আদেশ করতে যাতে তারা অন্ধকারের আড়াল ছাড়া উদ্ধার কার্য চালাতে না দেয়। রাজপুতরা এতো সফল ভাবে মোগল সৈন্যদের আহত বা হত্যা করছিলো যে মনে হচ্ছিলো চাঁদের আলোতেও তারা ভালো দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে।
পরবর্তী দিন গুলিতে মোগল সৈন্যদের আক্রমণ অব্যাহত থাকলো কিন্তু আহত সৈন্যদের সাহায্যের আবেদন, পানি খাওয়ার আকুতি এবং শেষ মুহূর্তে তাদের মা ও আল্লাহর কাছে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভের প্রার্থনা আকবর এবং তাঁর সেনাকর্তাদের ভীষণ কষ্ট দিতে লাগলো। আহত ঘোড়াগুলির যন্ত্রণাক্লিষ্ট হেষাধ্বনিও একই রকম কষ্টদায়ক মনে হচ্ছিলো। ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহগুলিকে মাছির ঝাক ঘিরে ধরছিলো এবং সেগুলি থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিলো। এই দুর্গন্ধ আকবরের শিবিরের চারপাশের বাতাস বিষাক্ত করে তুললো এবং তা থেকে খানিকটা রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি চন্দন কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালাতে আদেশ দিলেন।
হার না মানার দৃঢ় সংকল্পে আকবর সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর শিবিরে ঘুরে ঘুরে টহল দিচ্ছিলেন সৈন্যদের উৎসাহ প্রদানের জন্য। তিনি রাতের বেলা পাথর এবং মাটি ছুঁড়ে ঢিবি বা অবরোধ তৈরির আদেশ দিয়েছিলেন যাতে দিনের আক্রমণের সময় সেগুলির আড়াল পাওয়া যায়। যদিও সৈন্যরা আহত বা নিহত হয়ে দুর্গগামী ঢালু পথটির গোড়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলো কিন্তু তারা আর অগ্রসর হতে পারছিলো না, বরং প্রতি আক্রমণের চাপে তারা বাধ্য হচ্ছিলো পিছিয়ে এসে ঢিবির আড়ালে আশ্রয় নিতে এবং সম্ভব হলে আহতদের সাথে করে নিয়ে আসতে।
একদল দক্ষ মোগল যোদ্ধা দুর্গগামী পথটিতে পুনরায় আঘাত হানার জন্য সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছে। এবার আকবর এবং তাঁর সেনাপতিরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আক্রমণের অগ্রভাগে হাতি ব্যবহার করবেন। সৈন্যরা হাতির পিঠের হাওদার উপর উঠতে লাগলো। সাফল্যের সম্ভাবনা বৃদ্ধির জন্য হাতিগুলিকে সাধারণের তুলনায় অধিক পুরু ইস্পাতের বর্ম পড়ানো হয়েছে। হাওদাতেও ভারী কাঠের আস্তরণ যোগ করা হয়েছে এতে অবস্থানকারী বন্দুকধারী ও তীরন্দাজদের নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য। হাওদাগুলি সৈন্য দ্বারা পূর্ণ হওয়ার পর হাতিগুলির কানের পিছনে ঘাড়ের উপর বসে থাকা মাহুতেরা বিশেষ কায়দায় টোকা মেরে তাঁদের দাঁড়ানোর সংকেত দিলো। পিঠে ও শরীরে অতিরিক্ত বোঝা নিয়ে অনেক ধীরে গদাইলস্করি চালে হাতি গুলি উঠে দাঁড়াতে লাগলো। হাতির পেছনে পদাতিক এবং অশ্বারোহী যোদ্ধারাও সঙবদ্ধ হচ্ছিলো।
