সম্মুখে অগ্রসর হতে হতে সেলিমের মনে হলো সেই সময় পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে যখন পুনরায় সে আকবরের মুখোমুখী হবে। তার বিরূপ কর্মকাণ্ডে আকবরের যে প্রতিক্রিয়া হবে তার থেকেও গুরুতর বিষয় হলো সে তার স্ত্রী ও পুত্রদের সঙ্গে আনতে পারেনি। অবশ্য তার পরিকল্পনার বিষয়ে স্ত্রীদের অবহিত করার মতো আস্থা তার তাঁদের উপর নেই। তাছাড়া হেরেমের পরিবেশে কোনো গুঢ় তত্ত্ব গোপন রাখাও প্রায় অসম্ভব। তার পুত্ররা তাদের পিতামহের সঙ্গে যতো সময় কাটায় তাতে রাজপ্রাসাদে তাদের অনুপস্থিতি অস্বাভাবিক দেখাবে এবং বিষয়টি উপেক্ষিতও থাকবে না। অবশ্য তার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে এই জন্য যে রাজধানী ত্যাগ করার সময় সে তার পিতামহীকে কিছু বলে আসতে পারেনি, কাবুল থেকে তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে যাকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বাবার সঙ্গে তার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনা তাকে আহত করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি উভয়কেই অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং উভয়ের ব্যাপারেই শঙ্কিত হবেন। এই বিরোধীতা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে কি না এমন দুশ্চিন্তাও তাকে পেয়ে বসবে। তবে এই মুহূর্তে সেরকম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সেলিমের তথ্য সংগ্রহকারীরা জানিয়েছে কেউ তাঁদের পশ্চাধাবন করেনি। একবার অবশ্য তার বাবার নিয়মিত টহলদানকরী একদল অশ্বারোহী সামনে পড়ে গিয়েছিল। তারা অনেক দূরে থাকতেই সেলিম দিক পরিবর্তন করে তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে গেছে। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে সেলিমের সৈন্যদল ভারী হয়েছে এবং তাদের নেতৃত্ব দানের স্বাধীনতা সে উপভোগ করতে আরম্ভ করেছে যাতে আকবরের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তবে সে বুঝতে পারছে এই পরিস্থিতি চীরস্থায়ী হবে না, কিন্তু তার জন্য অনুকূল হয় এমন ফলাফল এই অবস্থা থেকে সৃষ্টি করতে হবে।
সুলায়মান বেগ খবর পাঠিয়েছে সে বাংলা থেকে তার সৈন্যদল নিয়ে এলাহাবাদের পৌঁছাবে দুই সপ্তাহ পরে। তার দুধভাই এর তার সঙ্গে পুনরায় যোগ দেয়ার বিষয়ে সে অত্যন্ত উদ্গ্রীব হয়ে আছে। সেটা কেবল এই জন্য নয় যে, সে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়ে তার সঙ্গে যোগ দিতে আসছে। বরং তার বন্ধুত্ব, তার সুচিন্তিত উপদেশ এবং তার নিঃশর্ত বিশ্বস্তও এই আকাঙ্ক্ষার পিছনে কার্যকর। কিন্তু এই মুহূর্তে এলাহাবাদের প্রবেশের ক্ষণটিকে তার যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক করে তুলতে হবে। শহরের নাগরিকদের মাঝে তার সম্পর্কে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম জাগিয়ে তুলতে হবে, সেই সঙ্গে নিজের লোকদের আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি করতে হবে।
আমাদের পতাকা গুলি মেলে উত্তোলন করো, ঘোড়ার জিনের উপর আরো সোজা হয়ে বসে সেলিম আদেশ দিলো। অশ্বারোহী শিঙ্গা বাদক এবং হাতির পিঠে থাকা ঢোল বাদকদের সামনের দিকে অবস্থান নিতে বললো। সকল সৈন্যকে সঠিক ভাবে সারিবদ্ধ হয়ে কুচকাওয়াজ করার নির্দেশ প্রদান করো। তারপর শিঙ্গার সাথে ঢাক বাজানো শুরু করতে বলল, এলাহাবাদের প্রবেশদ্বার আর বেশি দূরে নয়।
তিন মাস পরের ঘটনা। সেলিম এবং সুলায়মান বেগ এলাহাবাদের দূর্গপ্রাচীরের উপরে দাঁড়িয়ে নিচের কুচকাওয়াজের মাঠে সেলিমের অশ্বারোহী বাহিনীর অনুশীলন দেখছিলো। এ সময় একজন পরিচারক তাদের কাছে উপস্থিত হলো। জাহাপনা, অর্চার বুন্দেলা রাজা বীর সিং এর দূত এসেছে, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। কাছাকাছি অবস্থিত যমুনা নদীর তীরে সেনাবুর লম্বা সারি দেখা যাচ্ছে, সেখানে সেলিমের অনুগত প্রায় পঞ্চাশ হাজার সৈন্য রয়েছে। পূর্বে যা অনুমান করা হয়েছিলো তার তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
আমি এখনই ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো। তাকে এখানে নিয়ে এসো।
পাঁচ মিনিট পর একজন লম্বা হালকা পাতলা গড়নের লোক পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে সেখানে উপস্থিত হলো। সে দুকানে বড় বড় চক্রাকার সোনার বলয়(রিং) পড়ে আছে। দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে তার পোশাক ধূলিমলিন। তার এক হাতে একটি পাটের থলে ধরা রয়েছে যাকে ঘিরে কিছু মাছি ভন ভন করছে। সেলিমের কাছ থেকে বারো ফুট দূরে থাকতে লোকটি থামলো এবং উবু হয়ে পাটের থলেটি মেঝেতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
রাজার কাছ থেকে আমার জন্য কি সংবাদ এনেছো?
দূতটি বিস্তৃত হাসি দিলো, ঝাকড়া কালো গোঁফের নিচে তার অসমান ময়লা দাঁত গুলি স্পষ্ট দেখা গেলো। আমি যে সংবাদ এনেছি তা শোনার পর আপনি অতিব আনন্দিত হয়ে উঠবেন জাহাপনা।
দেরি কোরনা, বলো।
রাজা বীর সিং আপনার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করেছেন। কথা বলার সময় লোকটি পাটের থলেটি মেঝে থেকে তুললো এবং সেটার মুখে শক্ত করে বাঁধা দড়িটি খুলতে শুরু করলো। থলেটি ভোলা হতেই একটা আশটে মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো। সে থলেটির ভিতরে হাত ঢুকিয়ে চুল ধরে পচনরত একটি মানুষের মাথা বের করে আনলো। যদিও মস্তকটিতে লেগে থাকা মাংস পচে কিছুটা শুকিয়ে গেছে, বেগুনি বর্ণ ধারণ করা ঠোঁটটি ফাঁক হয়ে আছে এবং মুখের বিভিন্ন অংশে রক্ত জমাট বেঁধে আছে তবুও আবুল ফজলকে চিনতে সেলিমের অসুবিধা হলো না। দৃশ্যটি দেখে সুলায়মান বেগের মুখটি ফ্যাকাশে এবং বেদনার্ত হয়ে উঠলো। সে পেট চেপে ধরে বমি করার জন্য ওয়াক ওয়াক করতে লাগলো।
