সেলিম তার কপালের উপর হাত রেখে অস্তরত সূর্যরশ্মি থেকে চোখ আড়াল করে দেখলো সুলায়মান বেগ তার দিকে এগিয়ে আসছে। দুই বন্ধু পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় করলো, তারপর পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে তাবুর ভিতর প্রবেশ করলো। তাবুর কেন্দ্রস্থলের অবস্থিত একটি নিচু টেবিলে নৈশভোজের আয়োজন সাজানো রয়েছে। খাদ্য তালিকায় রয়েছে তন্দুরী মুরগী এবং ভেড়া; কাশ্মীরি কায়দায় দৈ ও হালকা মশলা দিয়ে রান্না করা শুকনো ফল; গুজরাটি কায়দায় তৈরি ঝাল শজি এবং চম্বল নদীর মাছ। রসালো ঝোলে নান রুটি ভিজিয়ে তারা ভোজন পর্ব শুরু করলো এবং সেলিম তার পরিচারকদের তাবুর বাইরে যেতে আদেশ দিয়ে আলাপ আরম্ভ করলো।
বল সুলায়মান, পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলির কতোজন সেনা কর্তাকে আমরা দলে পাবো?
প্রায় দুই হাজারের মতো। প্রতিটি নতুন যোগদানকারী অন্যদের দলে টেনেছে যাদের আমাদের উদ্দেশ্যকে সমর্থন করার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যেমন অনুমান করেছিলাম তাদের বেশিরভাগই আমাদের মতো তরুণ। দায়িত্ব লাভের বিষয়ে তারা সকলেই উগ্রীব সেই সঙ্গে পুরষ্কার লাভের জন্যেও তোমার পক্ষ থেকে আমি যার প্রতিশ্রুতি তাদের দিয়েছি। কিন্তু কিছু বয়স্ক সেনাকর্তাও আমাদের দলে যোগ দিতে আগ্রহী। তারা তাদের পদোন্নতির বিষয়ে অসন্তুষ্ট অথবা পুরানো শত্রুদের প্রতি তোমার পিতার সহনশীলতায় ক্ষুব্ধ। তাছাড়া কিছু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীও রয়েছে।
তাদের অধীনে সর্বমোট কতোজন সৈন্য রয়েছে?
প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো।
বাবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই সংখ্যা যথেষ্ট, কি বলো?
অনেকে এ কারণে আমাদের দলে যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে যে উদ্যোগটা তুমি নিয়েছে। বিষয়টি সম্পূর্ণ বিদ্রোহের পর্যায়ে পড়বে না যেহেতু বাইরের কেউ তোমার পিতাকে সিংহাসন থেকে উৎখাতের পরিকল্পনা করেনি। তারা একথা ভেবে আরো আশ্বস্ত হয়েছে যে কোনো এক পর্যায়ে তুমি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাবে।
তাহলে তাদের এমন ধারণা অব্যাহতই থাকবে, কি বলো?
তার মানে? তুমি কি তোমার পিতার সঙ্গে সমঝোতা করবে না?
না…মানে…নিশ্চয়ই করবো। তবে মাঝে মাঝে আমার মনে হয় সবকিছু যদি ঠিক থাকে তাহলে বাবার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা না করে তার আগেই তাকে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করতে পারবো।
এমন চিন্তার লাগাম টেনে ধরো সেলিম। তোমার বাবার প্রত্যক্ষ অধীনে অবস্থিত সেনাবাহিনী অনেক বেশি শক্তিশালী। তোমার তেজস্বিতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তোমার সম্ভাব্য গুরুত্ব প্রদর্শনের জন্য যতোটা সমর্থন প্রয়োজন আমরা কেবল তারই সংস্থান করতে পেরেছি। কিন্তু তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করার মতো সামর্থ আমাদের নেই। তুমি যদি সেই চেষ্টা করো তাহলে অনেকেই আমাদের উপর থেকে তাদের সমর্থন সরিয়ে নেবে।
অধিকাংশ মানুষ আমার পিতাকে ভালোবাসে, আমি সেটা জানি। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তিনি তাঁর প্রজাদের সুখ দুঃখের ব্যাপারে যতোটা সচেতন, তার নিজের পরিবারের ব্যাপারে ততোটা নন। তুমি আমাকে ভুল বুঝোনা। আমি অবশ্যই তার সঙ্গে সমঝোতা করবো। আমি কেবল আমাদের সামর্থের সব দিক বিবেচনায় আনতে চেয়েছি।
আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ কখনো নেবো? বেশি দেরি করা উচিত হবে না। সবখানে আবুল ফজলের গুপ্তচর ছড়িয়ে রয়েছে। সূক্ষ্ম পন্থায় মানুষের গোপন তথ্য উদ্ঘাটন করা এবং মানুষের অনুগত্য পরিবর্তন করার কাজে সে অত্যন্ত পারদর্শী।
আবুল ফজলের ব্যাপারে আমাকে ভাবতে দাও। যতোযাই হোক, সে একজন মানুষ বৈ অন্য কিছু নয়। কিন্তু আমিও কালক্ষেপন করবো না। ইতোমধ্যেই আমি আগ্রা এবং দিল্লীতে আমার প্রতি বিশ্বস্ত লোকদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছি যাতে তারা এক মাসের মধ্যে আমার সঙ্গে এখানে যোগ দেয়। তোমার সঙ্গে আরো বিস্তারিত পরিকল্পনার পর এবং তোমার বিশ্রাম নেয়া শেষ হলে তুমি পূর্বাঞ্চলে ফিরে গিয়ে আমাদের সমর্থক বাহিনী সংগঠন করা আরম্ভ করবে। এদিকে আমার বাহিনী একত্রিত হওয়ার পর আমি তাদের নিয়ে তোমার সঙ্গে এলাহাবাদে মিলিত হবো। গঙ্গা এবং যমুনা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত এলাহাবাদ সবদিক থেকে যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যদি আমরা আমাদের প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করি তাহলে বাবা আমাদেরকে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারবেন না।
*
সেলিম হাত তুলে তার সেনাবাহিনীকে থামার ইঙ্গিত করলো। এলাহাবাদের প্রশাসক নাসের হামিদের কাছে সে যে দূত পাঠিয়েছিলো তাকে ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে। তারা যেখানে রয়েছে সেখান থেকে এলাহাবাদ মাত্র চার মাইল দূরে অবস্থিত এবং শহরের গম্বুজ ও মিনারগুলি এখান থেকে দৃষ্টিগোচর হয়। তরুণ দূতটি যখন সেলিমের সম্মুখে উপস্থিত হলো তখন তার মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দেখা গেলো। জাঁহাপনা, নাসের হামিদ তার শহরে আপনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
সেলিমের কাঁধ দুটি শিথিল হলো, গত কয়েক সপ্তাহরে মধ্যে এই প্রথম সে কিছুটা স্বস্তি বোধ করা শুরু করলো। নাসের হামিদ তার বহু পুরানো বন্ধু এবং তার সঙ্গে গোপন চিঠি বিনিময় কালে সে জানায় সেলিমের কাছে এলাহাবাদকে সমর্পণ করতে সে প্রস্তুত রয়েছে। যাইহোক, শহরে প্রবেশের সময় সেলিম কিছুটা উৎকণ্ঠা অনুভব করলো। তার মনে হলো সবকিছু খুব বেশি মসৃণভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। সুলায়মান বেগ চলে যাওয়ার পর সফল ভাবে লাহোর এবং আগ্রার তরুণ সেনাকর্তাগণ তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সাত সপ্তাহ আগে, আবুল ফজলের সঙ্গে আলাপরত অবস্থায়, আকবর তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের আরেকটি শিকার অভিযানের জন্য রাজধানীর বাইরে থাকার আবেদনে সম্মতি প্রদান করেন। তার পরের দিন সেলিম তার একদল অনুসারীকে নিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের অভিযানে বেরিয়ে পড়ে (সে নিজে বিষয়টিকে এভাবেই দেখে), যদিও অন্যরা একে বিদ্রোহ বলে আখ্যা দেবে।
