কিন্তু সেলিম একটুও বিচলিত হলো না, শান্ত কণ্ঠে সে বলে উঠলো, রাজা খুব ভালোভাবে আমার আদেশ পালন করেছে। তোমাদের দুজনকেই আমি প্রতিশ্রুতির তুলনায় দ্বিগুণ পুরষ্কার প্রদান করবো। তারপর সে সুলায়মান বেগের দিকে ফিরলো। পূর্বে আমি তোমাকে আমার পরিকল্পনার কথা জানাইনি তোমার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। যদি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হত তাহলে তুমি কিছু না জানার অজুহাতে যে কোনো রকম দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকতে। আবুল ফজলকে হত্যা করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিলো। সে আমার এক নম্বর শত্রু ছিলো। সেলিম দূতটির দিকে ফিরলো। ওকে হত্যা করার বিস্তারিত কাহিনী আমাকে বল।
আপনি রাজাকে জানিয়েছিলেন যে আবুল ফজল দাক্ষিণাত্যের সীমান্তে যুদ্ধরত রাজকীয় বাহিনীর পরিদর্শন শেষে আগ্রা ফেরার পথে ওনার এলাকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হবে। আমাদের পাহাড় বেষ্ঠিত রাজ্য অতিক্রম করার জন্য মাত্র দুটি পথ রয়েছে এবং রাজা উভয় পথেই গুপ্ত আক্রমণের জন্য লোক নিয়োজিত করেন। এক মাস আগে তিনি খবর পান আবুল ফজল পশ্চিমের পথটির দিকে পঞ্চাশ জনের একটি দল নিয়ে এগিয়ে আসছে। আমাদের লোকেরা তাঁদের মধ্যে আমিও ছিলাম- শেষ বিকেলের দিকে তাঁদের উপর হামলা চালায় যখন তারা সংকীর্ণ একটি গিরিপথ অতিক্রম করছিলো। প্রথমে আমাদের বন্দুকধারীরা রাস্তার উপরের ঢালে অবস্থিত বড় বড় পাথরের চাঁই এর আড়াল থেকে তাদের উপর গুলি বর্ষণ করে। কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই আবুল ফজলের দেহরক্ষীরা গুলি বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু আবুল ফজল এবং তার ডজনখানেক সঙ্গী অক্ষত অবস্থায় ঘোড়া থেকে নেমে রাস্তার পার্শ্ববর্তী পাথর এবং ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে আশ্রয় নিতে সক্ষম হয়। আমাদের সৈন্যরা তাঁদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পাথর এবং ঝোঁপের আড়াল থেকে অব্যর্থ লক্ষ্যে গুলি চালিয়ে আবুল ফজলের লোকেরা তাদের অনেককে আহত করতে সক্ষম হয়। তাঁদের মধ্যে আমার আপন ভাইও ছিলো। তার মুখে গুলি লাগে যার ফলে তার অধিকাংশ দাঁত এবং চোয়ালের অংশ বিশেষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সে এখনোও বেঁচে আছে কিন্তু কথা বলতে পারে না এবং ঠিকমতো খেতে পারে না। তার যন্ত্রণার অবশান হওয়ার জন্য আমি কামনা করছি যেনো অতি শীঘ্রই তার মৃত্যু হয়।
দূতটি থামলো, এক মুহূর্তের জন্য তার চেহারায় বিষাদের ছায়া দেখা গেলো, তারপর সে আবার শুরু করলো, এক সময় আবুল ফজলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়। তারপর রাজা সাদা পতাকা হাতে তার কাছে একজন দূত পাঠান বার্তা দিয়ে। দূতটি আবুল ফজলকে জানায় যদি সে আত্মসমর্পণ করে তাহলে রাজা তার সঙ্গীদের মুক্তি দেবেন। এর কয়েক মিনিট পরে আবুল ফজল পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এবং তার তলোয়ারটি ফেলে দিয়ে রাজার মুখোমুখী হয়। যখন সে কথা বলে উঠে তার চেহারা তখন ভাবলেশহীন ছিলো। আমি তোমার মতো একজন অপরিচ্ছন্ন মাছি বসা পাহাড়ি গোত্রপতির ভয়ে ভীত হয়ে পালানোর চেষ্টা করবো না। তুমি আমাকে নিয়ে যা ইচ্ছা করো কিন্তু স্মরণ রেখো আমি কার অধীনে দায়িত্ব পালন করছি।
আবুল ফজলের ঘৃণাপূর্ণ বক্তব্যে রাজা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন এবং কোমর থেকে নিজের খাঁজ কাটা খঞ্জরটি বের করে তার স্থূল গলায় বসিয়ে দেন। অবশ্য আবুল ফজল কোনো প্রকার বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি। আমি বহু লোককে হত্যা করতে দেখেছি কিন্তু আবুল ফজলের গলা থেকে যতো রক্ত বেরিয়েছে তেমনটা কখনোও দেখিনি। তারপর রাজা অবুল ফজলের সকল সঙ্গীকে হত্যা করার আদেশ দেন। হত্যার পর তাদের দেহ মাটির অনেক গভীরে পুতে ফেলা হয়।
রাজা যে তার সঙ্গীদের হত্যা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো তা রক্ষা করলো না কেনো? সুলায়মান বেগ জিজ্ঞাসা করলো।
রাজা জানতেন ম্রাট আবুল ফজলকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। তার সঙ্গীদের বাঁচতে দিলে তারা সম্রাটের কাছে সব কথা ফাঁস করে দিতো। ফলে রাজার জীবন বিপন্ন হতো। তাই তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি।
এটা প্রয়োজন ছিলো সুলায়মান, সেলিম বললো। কোনো কাজ সুচারু ভাবে সম্পন্ন করার জন্য আমাদেরকে মাঝে মাঝে নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিতে হয়। আমি কামনা করি আবুল ফজলের সাহসি সঙ্গীদের আত্মা স্বর্গে স্থান পাক। তাদের একমাত্র অপরাধ ছিলো তারা একটি দুষ্ট লোকের অনুগত্য করেছে। আবুল ফজল বিরতিহীন ভাবে বাবার কানে আমার নামে বিষ ঢেলেছে। তাকে আমার মাতলামি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়ে অবহিত করেছে। নিজের লোকদের নিয়োগ দানের জন্য সুপারিশ করেছে আমাকে বা আমার বন্ধুদের উপেক্ষা করে। এমনকি আমার দাদীও আমাকে তার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন এই বলে যে সে আমার প্রতি সদয় নয়। আমি তাকে ঘৃণা করতাম।
তার প্রতি আবুল ফজলের আচরণের স্মৃতি একে একে স্মরণে আসতে থাকায় সেলিম ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো। হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে সে ছিন্ন মস্তকটিকে প্রচণ্ড এক লাথি হাঁকলো এবং সেটা দুর্গ পরিখার মধ্যে জমে থাকা ময়লার মধ্যে গিয়ে পড়লো। ওর মিথ্যাবাদী চাটুকারী জিহ্বা কুকুরের খাদ্যে পরিণত হোক এবং ওর সদা প্রশ্নবোধক চোখ গুলি কাকেরা খুটে খাক।
সেইদিন সন্ধ্যার সময় দুর্গে সেলিমের কক্ষে সেলিম ও সুলায়মান বেগ বিশ্রাম করছিলো। যদিও সেলিম ওপিয়ামের নেশা পরিত্যাগ করেছে কিন্তু সে আবার। সুরাপান আরম্ভ করেছে। মদের স্বাদ তার ভালোলাগে এবং সে নিজেকে এই বলে বর্তমানে প্রবোধ দিচ্ছে যে মদের দাস হওয়ার তুলনায় এর প্রভু হওয়ার। মতো যথেষ্ট মনোবল এখন তার আছে। একজন পরিচারক তাদের একটি পূর্ণ। বোতল দিয়ে চলে যাওয়ার পর সুলায়মান বেগ জিজ্ঞাসা করলো, তোমার বাবা যে আবুল ফজলের হত্যার প্রতিশোধ নেবেন সে বিষয়ে তোমার মনে কোনো ভয় নেই? তুমি তাকে খেপিয়ে তোলার ব্যবস্থা করেছো যখন জানো তিনি ইচ্ছা করলেই আমাদের বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারেন।
