সেলিম চুপ করে রইলো, গলা বেয়ে উঠে আসতে চাওয়া তিক্ত পদার্থকে চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সে।
কেনো সেলিম? কেনো তুমি এসব করছো?
কথাটা কি এমন হওয়া উচিত নয় যে, কেনো করবো না? অবশেষে সেলিম উত্তর দিলো। ওপিয়াম এবং সুরা অন্তত আমাকে কিছুটা হলেও সুখ দিতে পারে। আমি গতরাতে কেবল এর পরিমাণের ব্যাপারে সামান্য ভুল করেছিলাম। ভবিষ্যতে আমি এ বিষয়ে সতর্ক থাকবো।
তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি। তুমি নিজেকে ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছো কেনো?
আমার বাবার আমার প্রতি কোনো দৃষ্টি নেই। আমার জীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছে। মুরাদ এবং দানিয়েলই সঠিক উপায় অবলম্বন করেছে। নিজে ফুর্তিতে ব্যস্ত থেকে বাকি সব কিছু ভুলে যাওয়াই কি আমার উচিত নয়?
বাকি সব কিছু বলতে তুমি কি বোঝাচ্ছো? তোমার স্বাস্থ্য, তোমার পুত্ররা এবং তোমার সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ এই সব কিছুর গুরুত্ব এক সময় তোমার কাছে ছিলো। আজ তার কি হলো? তোমার কণ্ঠ থেকে এখন আসলে সুরা এবং ওপিয়ামের বক্তব্য বের হচ্ছে, এটা তুমি নও। ওগুলোকে সাহস করে পরিত্যাগ করো এবং তারপর দেখার চেষ্টা করো তোমার সত্যিকার অনুভূতি কি।
সেলিম সুলায়মান বেগের রক্তিম হয়ে উঠা চেহারা খুটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো। আমি তোমাকে হতাশ করেছি, আমি জানি। আমি আমার বাবাকেও হতাশ করেছি। আমি দুঃখিত।
দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই বরং এ ব্যাপারে কিছু করার চেষ্টা করো। এটা একটি ভালো বিষয় যে তোমার বাবা এই মুহূর্তে দিল্লী এবং আগ্রা পরিদর্শনে গিয়েছেন এবং তোমার এই অবস্থা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। উনি লাহোরে ফিরে আসার আগে তোমার হাতে চার সপ্তাহ সময় রয়েছে। নিজেকে সুস্থ করে তোলার জন্য এই সময়টি কাজে লাগাও। তোমার ধারণা তোমার বাবা তোমাকে তুচ্ছজ্ঞান করেন তাহলে, এই ক্ষেত্রে তাঁর জন্য আরো অধিক সুযোগ সৃষ্টি করো না।
তুমি একজন ভালো বন্ধু সুলায়মান বেগ…আমি জানি তুমি আমার ভালো চাও কিন্তু তুমি জানো না আমার কষ্ট কতো তীব্র। আমার তারুণ্য বয়ে যাচ্ছে। আমার শক্তিসামর্থ এবং আমার প্রতিভা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে…
নিজেরও উপর আস্থা হারিও না। তুমি আমাকে প্রায়ই বলতে শেখ সেলিম চিশতি তোমাকে কি বলেছিলেন—এই যে তোমার জীবন সহজ হবে না…এও বলেছেন তিনি তোমাকে ঈর্ষা করেন না…তুমি একদিন সম্রাট হবে এবং তোমার সব স্বপ্ন একসময় পূরণ হবে। এসব কথা তোমার ভুলে যাওয়া উচিত নয়। উনি একজন বিজ্ঞ লোক ছিলেন। কিন্তু তোমার বর্তমান কর্মকাণ্ড তার স্মৃতির প্রতি অসম্মান জনক।
তার দুধভাই যা বললো সেলিম তার উত্তর দেয়ার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলো না। তুমি ঠিকই বলেছে। অবশেষে সে বললো। নিজের হীনমন্যতার আক্রমণে নিজেকে ধ্বংস হতে দেবো না আমি। আমি ওপিয়াম এবং সুরার নেশা ত্যাগ করবো, অন্তত কিছু দিনের জন্য, কিন্তু সেজন্য তোমার সাহায্য প্রয়োজন হবে…
নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সাহায্য করবো। এখন প্রথমে যা করতে হবে তা হলো একজন হেকিমকে দিয়ে তোমাকে পরীক্ষা করাতে হবে। ইতোমধ্যেই আমি একজনকে ডেকেছি-সে গোপনীয়তা রক্ষা করার মতো মানুষ। বাইরে অপেক্ষা করছে।
তুমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলে যে তুমি আমাকে রাজি করাতে পারবে…
না, তবে আমি আশা করেছিলাম তুমি আমার কথা শুনবে।
আধ ঘন্টা ধরে হেকিম সেলিমকে পরীক্ষা করলো। তার চোখ দেখলো, জিভের রং পরীক্ষা করলো, চ্যাপ্টা ফলা বিশিষ্ট ধাতব পাত দিয়ে ঘষে জিভ পরিষ্কার করলো, নাড়ি পরীক্ষা করলো এবং পেটের বিভিন্ন অংশ টিপেটুপে দেখলো। পরীক্ষা করার সময় হেকিম মুখে বিশেষ কিছু বললো না কিন্তু অত্যন্ত মনোযোগর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলো।
জাহাপনা, নিজের যন্ত্রপাতির ব্যাগটি বন্ধ করতে করতে হেকিম বললো, আমি আপনার কাছে সত্য গোপন করবো না। আপনি বলেছেন আপনি গত রাতে খুব বেশি পরিমাণ ওপিয়াম গ্রহণ করেছেন। আপনার প্রসারিত হয়ে যাওয়া চোখের মণি দেখেই আমি তা অনুমান করতে পেরেছি। কিন্তু আমি আরো বুঝতে পেরেছি আপনি অতিমাত্রায় মদ্যপানও করেছেন। আপনাকে কড়া মদ এবং ওপিয়াম উভয়ই ত্যাগ করতে হবে। তা না হলে আপনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আপনার মৃত্যুও হতে পারে। এখনো আপনার হাত কাঁপছে।
না তো, এই দেখুন! সেলিম তার হাত দুটি হেকিমের সামনে মেলে ধরলো। সে তাকে দেখাতে চাইলো তার বক্তব্য ভুল। কিন্তু চিকিৎসক ঠিক কথাই বলেছে। তার ডান হাতটি বাম হাতের তুলনায় বেশি কাঁপছে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করলো সেগুলিকে স্থির করতে, কিন্তু কিছুতেই সেগুলি তার নিয়ন্ত্রণে এলো না।
হতাশ হবেন না জাহাপনা। উপযুক্ত সময়ে আপনার চিকিৎসা শুরু হয়েছে এবং আপনার শরীর এখনো তরুণ এবং বলিষ্ঠ। কিন্তু আপনাকে আমার কথা মতো চলতে হবে। আপনি কি নিজেকে আমার হাতে সোপর্দ করতে রাজি আছেন?
আমার সুস্থ হতে কতো দিন সময় লাগবে?
সেটা আপনার উপর নির্ভর করছে জাহাপনা।
নভেম্বরের এক সকালে ফ্যাকাশে সূর্যালোকের নিচে সেলিম এবং সুলায়মান বেগ রবি নদীর পার দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের অনুসরণ করছে শিকারের সহকারীরা, সকলের মধ্যে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে উত্তম শিকারের চিন্তায়। হঠাৎ একটি কাদাখোঁচা পাখি(স্নাইপ) নদীপারের উঁচু ঝোঁপ থেকে উড়ে বেরিয়ে এলো। সেলিম তার রেকাবে দাঁড়িয়ে তূণীর থেকে তীর নিয়ে ধনুকে পড়িয়ে পাখিটিকে লক্ষ্য করে ছুড়লো। বর্তমানে সে তার হাতের স্থিরতা ফিরে পেয়েছে এবং পাখিটি তীরবিদ্ধ হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে ডানা ঝাপটাতে লাগলো। সেই রাতে অতিরিক্ত নেশা করে জ্ঞান হারানোর ঘটনার পর ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই ছয় মাস অত্যন্ত বিড়ম্বনার সঙ্গে কেটেছে। এ সময়ের মধ্যে একাধিক বার মনের দৃঢ়তা দুর্বল হয়ে অপিয়াম এবং সুরার দ্বৈত নেশায় ফিরে গিয়েছে সে। কিন্তু সেগুলি ত্যাগ করার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছিলো। এখনো মাঝে মাঝে তার পদস্খলন ঘটে, বিশেষ করে যখন আকবর তার প্রতি অবজ্ঞা বা বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। কিন্তু বর্তমানে সেলিম তার ধনুকটি পিঠে ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে প্রতিজ্ঞা করলো সে আগামীতে আর নিজের দৃঢ়তা হারাবে না, ভবিষ্যৎ তার জন্য যাই ধারণ করুক, যতো রকম পরাজয় বা হাতাশারই সে সম্মুখীন হোক।
৬.১ পৃথিবীর অধীশ্বর
ষষ্ঠ খণ্ড – পৃথিবীর অধীশ্বর
২৭. একটি পাটের থলে
