বাক্সটি খুলে সে কাঁচের বয়ামটি আবার বের করে আনলো এবং অবশিষ্ট ওপিয়ামের গুলি হা করে মুখে ঢাললো। সেলিম গিলতে চেষ্টা করলো কিন্তু সেগুলি তার শুষ্ক গলায় আটকে গেলো- ভুলে সে সেগুলো গোলাপ জলে গুলিয়ে নেয়নি। তার দম আটকে গেছে এবং সেগুলি মাথা ঝাঁকিয়ে থু দিয়ে বের করার চেষ্টা করলো, কিন্তু তা সম্ভব হলো না। শ্বাস নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে সে গোলাপ জলের জগটির জন্য হাতড়াতে লাগলো, যে কোনো তরল পদার্থ হলেই চলবে। যেই মুহূর্তে তার মনে হলো সে জ্ঞান হারাবে, তার হাতে পানির জগের ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শ লাগলো। দ্রুত ধরতে গিয়ে সেটা উল্টে পড়ে গেলো। সামনে ঝুঁকে লোভীর মতো সে সেটাকে সোজা করলো এবং বেঁচে যাওয়া পানিটুকু গলায় ঢালল। হ্যাঁ, গুলি গুলো গেলো গেছে। একধরনের কর্কশ অসঙ্গতিপূর্ণ ঘাস ঘাস শব্দ তার কানে বাজতে লাগলো, কয়েক মুহূর্ত পরে সে উপলব্ধি করলো সেটা তার নিজেরই শ্বাস নেয়ার শব্দ।
হামাগুড়ি দিয়ে সে আবার তার পুরানো জায়গায় ফিরে গেলো তারপর চাদরের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে দুবাহু বুকের উপর ভাঁজ করে হাতের পাঞ্জা দুটি দুই বগলে ঢুকালো। নিজেকে উষ্ণ রাখার আর কোনো উপায় এই মুহূর্তে তার জানা নেই। কিন্তু তাতে কাজ হলো না, শরীরের কম্পন বন্ধ হলো না। একটু পড়ে সে বুঝতে পারলো কেনো সে কাঁপছে- সেটা শীতের জন্য নয় বরং ভীতির জন্য। অদ্ভুত চেহারার ভয়ঙ্কর সব জীব তার চারপাশের আধারে বিচরণ করছে। এদের আগ্রাসন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে…কোনো রকমে সেলিম নিজেকে তার হাঁটুর উপর খাড়া করলো কিন্তু তারপর হঠাৎ তার চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো….
সেলিম…সেলিম… কেউ তার মুখ একটি ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিচ্ছিলো কিন্তু সে মোচড় দিয়ে সরে গেলো। এটা কি সেই আধারের জীবদের কেউ? নড়োনা সেলিম। আমি সুলায়মান বেগ… সেলিম অনুভব করলো কেউ শক্ত হাতে তাকে চেপে ধরেছে এবং আবার তার মুখ ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিচ্ছে। অনেক কষ্টে সে তার চোখের পাতা খুললো এবং বিরক্তিকর সূর্যালোক চোখে আঘাত করতেই গুঙিয়ে উঠলো, সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
এটা পান করো! কেউ এখন অত্যন্ত কোমল ভাবে জোর খাঁটিয়ে তার চোয়াল ফাঁক করলো এবং সে তার নিচের ঠোঁটে বৃত্তাকার কিছুর ধাতব স্পর্শ পেলো। তারপর তার মাথাটি কাত করা হলো এবং তার গলা বেয়ে তীব্র গতিতে জল নামতে লাগলো। সেলিমের মনে হলো সে ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু মেঝেতে একটি ধাতব পান পাত্র আছড়ে পড়ার শব্দ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নির্মম গলাধকরণ অব্যাহত থাকলো।
সেলিম আবার তার চোখ খুললো, এবার সে তার চোখ দুটি অব্যাহত ভাবে খোলা রাখতে পারলো এবং দেখতে পেলো তার উপর সুলায়মান বেগের মুখটি ঝুঁকে রয়েছে। সে আর কখনোও তার দুধভাইকে এতোটা বিচলিত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখেনি। সেলিম উঠে বসলো এবং কিছু বলতে চাইলে কিন্তু তার স্বরযন্ত্র তার ইচ্ছার প্রতি অনুকূল সাড়া দিলো না। সে তার ঠোঁট দুটি নড়াতে পারলো না। সে আবার চেষ্টা করলো এবং এবার কিছুটা সফল হলো, সে বলতে পারলো আমার মনে হচ্ছে এবং তারপরই তার মুখ থেকে হঠাৎ তীব্র বেগে এক প্রকার তিতো আঠাল তরল ছিটকে বের হলো। কিছুটা লজ্জিত ভাবে সে তার বন্ধুর দিক থেকে মুখটা একপাশে সরিয়ে নিয়ে মেঝের উপর ওয়াক থু ওয়াক থু করতে লাগলো যতোক্ষণ পর্যন্ত না সবটুকু আঠালো পদার্থ বেরিয়ে এলো এবং বুকে এমন যন্ত্রণা অনুভব করলো যেনো তার পাঁজর ভেঙে গেছে। আমি দুঃখিত…
তুমি ক্ষমা চাইছো কেনো? এই জন্য যে তুমি অসুস্থ, নাকি এ কারণে যে তুমি নিজেকে প্রায় মেরে ফেলেছিলে?
মানে…আমার কি হয়েছে…তুমি কি বলছো এসব? আমিতো কেবল সামান্য ওপিয়াম সেবন করেছি…
ঠিক কতোটা ওপিয়াম খেয়েছো তুমি?
ঠিক বলতে পারবো না…
সেই সঙ্গে সুরাও পান করেছো?
সেলিম মাথা ঝাঁকালো। সে তার একটি হাত দিয়ে কপালের ডান পাশ স্পর্শ করে অনুভব করলো জায়গাটা রক্ত জমাট বেধে চটচটে হয়ে আছে।
পাথরের রেলিং এর সঙ্গে তোমার মাথা বাড়ি খেয়েছে। এই যে দেখো, যেখানে বাড়ি খেয়েছে সেখানে তোমার রক্ত লেগে আছে, সুলায়মান বেগ বললো।
সেলিম তার ঢিপ ঢিপ করতে থাকা মাথাটা ধীরে নাড়লো। আঘাত লাগার বিষয়ে আমার কিছু মনে নেই…শুধু মনে আছে আরো ওপিয়াম খুঁজছিলাম কিন্তু পাচ্ছিলাম না…তারপর গলা আটকে দম বন্ধ হয়ে এলো…
দরজার বাইরে থেকে তোমার কোৰ্চি পতনের শব্দ শুনতে পায়। তুমি তাকে তোমার কক্ষে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে তাই সে আমার কাছে যায়। আমি এসে তোমাকে বারান্দায় উপুর হয়ে পড়ে থাকতে দেখি, তোমার সারা শরীর তখন কাঁপছিলো এবং কাঁপাল ফেটে রক্ত পড়ছিলো। আমি তোমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দেই এবং কপালের রক্তক্ষরণ বন্ধ করি। সেলিম, তোমার ভাগ্য ভালো যে…
সেলিম সুলায়মান বেগের দিকে তাকিয়ে আছে এবং তার বক্তব্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে সে আবার অসুস্থ বোধ করতে শুরু করলো।
আমি তোমাকে কতোদিন ধরে সতর্ক করার চেষ্টা করছি। তুমি তোমার সৎ ভাইদের অবস্থা দেখে কিছু শিখতে পারোনি? তাঁদের চেয়েও দ্রুত তোমার অবনতি হয়েছে। তোমার এই আচরণ অযৌক্তিক। তাছাড়া ইদানিং তোমার মেজাজও হঠাৎ করে খারাপ হয়ে যায় এবং তুমি হিংস্র হয়ে উঠো। কয়েক দিন আগে আমি দেখেছি তেমন কোনো কারণ ছাড়াই তুমি খোসরুর উপর কেমন চিৎকার করে মেজাজ করছিলে এবং সে তোমার দিকে কীভাবে তাকিয়ে ছিলো তাও লক্ষ্য করেছি। তুমি তোমার আপন জনদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছ। সুলায়মান বেগকে বেশ ক্রুদ্ধ মনে হলো।
