আমি এখন নিশ্চিত ভাবে জানি বাবা আমাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদান করবেন না। যদিও তিনি আমার পিতামহ এবং প্রপিতামহের মতোই আমার অর্ধেক বয়সে সম্রাট হয়েছিলেন। কোমরের খাপ থেকে নিজের আনুষ্ঠানিক খঞ্জরটি বের করে নিয়ে সেলিম ডিভানের গোলপি রেশমের আচ্ছাদনের উপর আঘাত করলো। বিকেলের উষ্ণ আবহাওয়ায় সে লাহোরের দুর্গপ্রাসাদের একটি কক্ষে সময় কাটাচ্ছে। খঞ্জরটির ফলা ভোতা, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেটি কোমল রেশম ভেদ করে তুলার আস্তরণের মধ্যে ঢুকে গেলো। আমি দীর্ঘ দিন অপেক্ষা করলোম, কিন্তু কি লাভ হলো? কিছুই না! কোনো সেনাপতির পদ পেলাম না, কোনো প্রশাসকের পদ পেলাম না, কোনো সম্ভাবনাও সৃষ্টি হলো না। এমন কি একটি সান্ত্বনা বাক্যও নয়। আমি এখন কি করবো? সেলিম সুলায়মান বেগের কাছে জানতে চাইলো, সে পাশাপাশি স্থাপিত আরেকটি গদি-আঁটা আসনে আধ-শোয়া হয়ে আছে। তার এক হাতে একটি আমের রসের পানপাত্র ধরা রয়েছে। আমি ঠিক বলতে পারবো না, সুলায়মান বেগ চিন্তিত কণ্ঠে বললো। তারপর আমের রসে একটি চুমুক দিয়ে আবার বললো, কিন্তু আমি যতদূর জানি তা হলো উত্তরাধিকার লাভ করার ক্ষেত্রে সময় এবং ধৈর্যই মূল চাবিকাঠি।
যদিও বাবার বয়স এখন পঞ্চাশের শেষের দিকে, তাঁর স্বাস্থ্য এখন আগের চাইতেও ভালো। তোমার ইঙ্গিত তাঁর জন্য প্রযোজ্য নয়। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তিনি অমর কি না-যে ভাবে তিনি তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন এবং উত্তরাধিকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাথা ঘামাচ্ছেন না তাতে মনে হয় তিনি নিজের মরণশীলতায় বিশ্বাস করেন না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁর এমন আত্মবিশ্বাসই আরো দৃঢ় হয়েছে যে তিনি সব কিছু সকলের চেয়ে ভালো বোঝেন। সেলিম আবার ডিভানে আঘাত করলো, এবার আরো জোরে, ধূলো এবং তুলার আঁশ ছিটকে বের হলো।
যদিও শীঘই তোমার বাবার স্বর্গে বিশ্রামে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তোমার সৎ ভাইদের অবস্থা এর বিপরীত যারা উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা উভয়েই মদের কাছে নিজেদের সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করেছে। তাদের এই আচরণ যদি অব্যাহত থাকে তাহলে খুব শীঘ্রই তারা পৃথিবীর বুকে বিচরণ করার অধিকার হারাবে।
দশ দিন আগে মুরাদ এবং দানিয়েলের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তা মনে পড়তে সেলিম আপন মনে হাসলো। কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই আকবর তার তিন পুত্রকে রাজ প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থিত কুচকাওয়াজের মাঠে ভোর বেলা ডেকে পাঠান। রবি নদীর উপর তখনো সাদা কুয়াশা জমে ছিলো। সৌভাগ্যক্রমে তার আগের সন্ধ্যা বেলায় সেলিম হেকিমের নির্দেশ পালন করে মদ বা ওপিয়াম স্পর্শ করেনি। বরং হেরেমে গিয়ে যোধ বাঈ এর সঙ্গে প্রণয়লীলায় লিপ্ত হয়েছিলো। ফলে তার মন ছিলো ফুরফুরে এবং শরীর ছিলো সতেজ যখন সে কুচকাওয়াজের মাঠে উপস্থিত হয়।
তারা তিন জন মাঠে উপস্থিত হতেই পরিষ্কার বোঝা গেলো মুরাদ বা দানিয়েল কেউই সেলিমের মতো পূর্বের সন্ধ্যায় সংযম পালন করেনি। মুরাদ যখন উঁচু পাথুরে দ্বারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করলো দেখা গেলো তার একজন পরিচারক তখনো তার কোমর বন্ধনী বাঁধার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুরাদের চৌকো চোয়াল বিব্রতকর ভাবে ঝুলে ছিলো। দানিয়েল প্রবেশ করলো মাতালের টলমল করতে থাকা পদক্ষেপে। তার মাথাটি অস্বাভাবিক রকম স্থির ছিলো এবং চোখ দুটি ছিলো রক্তাভ। আকবরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সে একাধিক বার হোঁচট খেলো।
আকবর তাঁদের তিন জনকে আদেশ দিলেন ঘোড়ার পিঠে চড়ার জন্য। তারা যখন ঘোড়ার পিঠে উঠার চেষ্টা করলো, মুরাদের ঢিলা কোমর বন্ধনী ছুটে গেলো এবং তাতে তার পা পেচিয়ে সে হোঁচট খেলো এবং মাটিতে উপুর হয়ে পড়ে গেলো। পরিচারকদের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত সে ঘোড়ায় চড়তে পারলো এবং কিছু দূর অগ্রসরও হলো কিন্তু মাত্র একশ গজ পার হওয়ার পর পিছলে ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে পড়ে গেলো।
দানিয়েল তার তুলনায় কিছুটা ভালো পারদর্শীতা দেখালো। সে সফল ভাবে ঘোড়ার পিঠে চড়তে পারলো এবং সামনের দিকে অগ্রসরও হলো। কিন্তু যেই তার বর্শার অগ্রভাগে তরমুজ গাঁথার জন্য সামান্য নিচু হলো ওমনি ধপাস করে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলো। কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়ে সে অনর্গল বমি করা শুরু করলো।
সেলিম সব কিছুই ভালো ভাবে সম্পন্ন করলো। নিপুন দক্ষতায় বর্শা দিয়ে তরমুজ বিদ্ধ করলো সে। তবে তার পিতার বক্তব্যে স্পষ্ট কোনো প্রশংসা প্রকাশ পেলো না। এই প্রথম বারের মতো দেখতে পাচ্ছি তুমি মদ্যপান করোনি সেলিম। তবে মনে রেখো তোমাদের পরীক্ষা নেয়ার এটাই শেষ নয়। তুমি এখন যেতে পার। সেলিম মাঠ ত্যাগ করার পর শুনেছিলো তার পিতা তার সৎ ভাইদের তাদের কক্ষে অবরুদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করেছেন চৌদ্দ দিনের জন্য। এবং আদেশ দিয়েছেন কেউ যেনো তাঁদের মদ সরবরাহ না করে। এই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও তিনি তাঁদের প্রতি নজর রাখতে বলেছেন যাতে তারা কোনো প্রকার নেশা করতে না পারে।
অবশ্য তারা কয়েক দিনের মধ্যে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর আর নেশাপানি করবে না, কি বলো সুলায়মান বেগ?।
আমার এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে। আমি শুনেছি তাদের কিছু অনুগামী গোপনে তাদের কাছে মদ সরবরাহ করছে। গুজব কোনো যাচ্ছে মুরাদের স্কুল পরিচারক গরুর অন্ত্রের(নাড়িভূড়ি) মধ্যে মদ ভরে সেটা নিজের তলপেটে পেচিয়ে তার কাছে পাচার করছে। আর দানিয়েল একজন রক্ষীকে ঘুষ দিয়ে গাদা বন্দুকের বন্ধ নলে মদ ভরে তার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে।
