এখন তার আরো বেশি চমৎকার লাগছে। সেলিম রেশমের চাদরে ঢাকা মাদুরের উপর শরীর এলিয়ে দিলো। সে তার কক্ষের ঝুল বারান্দার রেলিং এর কাছে শুয়ে আছে। নিচের পাথুরে চত্বর থেকে ভেসে আসা মানুষের গলার স্বর এবং ঘোড়ার খুরের শব্দ মনে হলো বহু দূর থেকে আসছে। সে তার চোখ দুটি বন্ধ করলো এবং এক অসীম তৃপ্তিকর অসাড়তার কাছে। নিজেকে সমর্পণ করলো যা বিগত সপ্তাহ গুলিতে তার সুখের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সেলিম যখনই পিতার কাছে তার নিয়োগ দানের বিষয়ে আবেদন করেছে তখনই তিনি তার ঠাণ্ডা বাকচাতুরীর সাহায্যে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর বিরুদ্ধে অতিব কার্যকরী প্রতিষেধক তার এই বর্তমান মাদকাসক্তি। তাছাড়া নিজ সন্তানদের আচরণের আলগা ভাব ভুলে থাকার জন্যেও এই নেশা জরুরি। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময়ে তাঁদের ব্যবহার অনেক পাল্টে গেছে। যদিও তাঁদের কথাবার্তা অনেক ভদ্র তবুও তাতে সে কোনো আন্তরিকতা বা উষ্ণতা খুঁজে পায়নি।
মা হীরাবাঈ বা দাদী হামিদার কাছ থেকেও সে কোনো গঠনমূলক আশ্বাস লাভ করেনি। মা কেবল বাবার প্রতি তার ঘৃণাই প্রকাশ করেছেন যা সাধারণ ভাবে সমগ্র মোগল সম্প্রদায়ের উপরই বর্তায়। আর হামিদার কণ্ঠস্বরে যতোই সহমর্মিতা এবং স্নেহ প্রকাশ পাক না কেনো তিনি সান্ত্বনা প্রদান এবং ধৈর্য ধারণ করার উপদেশ ব্যতীত আর কিছুই সেলিমকে দিতে পারেননি। এছাড়া তিনি আনারকলির সঙ্গে তার প্রণয় আকবরকে কতোটা আহত করেছে সে বিষয়টিও বহুবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এ সংক্রন্ত গুজব জনগণের মাঝে আকবরের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী অস্তিত্বকে খর্ব করেছে। তাছাড়া নির্বাসন থেকে সেলিমকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আকবরকে রাজি করাতে গিয়েও তাকে অনেক নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে নিজের ছেলের কাছে। তাই বর্তমানে তার পক্ষে ছেলের কাছে আর কোনো সুপারিশ করা সম্ভব নয়।
ওপিয়াম এবং সুরার সম্মিলিত প্রভাব সেলিমের শরীর ও মনকে শিথিল করে তুলেছে। তার বেদনাদায়ক চিন্তাগুলি এখন ভোতা হয়ে গেছে, নৈরাশ্যজনক অভিজ্ঞতার স্মৃতি গুলির উপর মোলায়েম প্রলেপ পড়েছে এবং সে এমন সব জায়গায় বিচরণ করছে যেখানে কোনো কিছুই আর তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করে না। সেলিম অনুভব করলো তার খোলা বুকের উপর দিয়ে একটি পোকা হাঁটছে, কিন্তু সেটাকে সরিয়ে দিতে হলে যে উদ্যোগ তাকে নিতে হবে তা ব্যাপক কষ্টসাধ্য বলে তার কাছে মনে হলো। বেঁচে থাকো, ছোট্ট প্রাণী, তুমি যে গোত্রেরই হও না কেনো, সে মনে মনে কথা গুলি আওড়ালো এবং কোমল ভাবে হাসলো। তারপর একটু নড়ে চড়ে শুলো। নরম উষ্ণ রেশমের চাদরটিকে তার অবিশ্বাস্য রকম আরামদায়ক মনে হলো-যেনো কোনো নারীর নরম ত্বক। হয়তো কিছুক্ষণ পরে সে হেরেমে যাবে এবং মান বাঈ বা যোধ বাঈ এর সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত হবে। তবে সেটাও এখন তার কাছে ব্যাপক কষ্টকর উদ্যোগ বলে মনে হচ্ছে। অবশ্য সে ফিরে আসার পর তারাও তাকে তেমন উন্মুক্ত হৃদয়ে গ্রহণ করেনি। সেই মুহূর্তে তার আরো খেয়াল হলো বেশ কয়েক দিন যাবৎ সে তার স্ত্রী বা সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি। কেনো করবে, যখন এখানে শুয়ে থাকাই এতো আশ্চর্যজনক ভাবে তৃপ্তিকর? এক মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসার আকর্ষণীয় মুখটি তার কল্পনার পর্দায় ভেসে উঠলো। হয়তো সুলায়মান বেগের কথাই ঠিক, সে আরেকজন নারী ছাড়া বিশেষ কিছু নয়…
তারপরও একজন সঙ্গী কাছে থাকলে ভালো হতো, যে তাকে এই মুহূর্তে আবৃত করতে থাকা ছায়া ঘন এবং উজ্জ্বল গোধূলী লগ্নে সঙ্গ দিতো। সুলায়মান বেগ গোঁয়ারের মতো তার প্রতিটি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি যখন সে একটি বা দুটি ওপিয়ামের গুলি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা আরম্ভ করেছিলো তখনো তার দুধভাইকে প্রলুব্ধ করা যায়নি। উল্টো সে তাকে নেশা করতে নিষেধ করেছে…হয়তো তার উচিত ছিলো তার সভাইদের আমন্ত্রণ জানানো, মুরাদ বা দানিয়েলকে। মুরাদ এক মাস আগে লাহোরে ফিরে এসেছে। একজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গিরদারের প্রতিনিধিকে অসম্মান প্রদর্শনের অভিযোগে চাবুকপেটা করার জন্য আকবর তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
মুরাদ হয়তো কোনো দোষ করেনি, সেলিমের মনে হলো, যদিও জানা গেছে চাবুক মারার আদেশ প্রদানের সময় সে মাতাল ছিলো। বাস্তবতা হলো পুত্রদের কাছ থেকে আকবরের আকাক্ষা সীমাহীন যা পূরণ করা তাদের পক্ষে হয়তো কখনোই সম্ভব হবে না। তাকে বা দানিয়েলকে মুরাদের স্থলাভিষিক্ত না করে আকবর যথারীতি চাটুকার আবুল ফজলের এক ভ্রাতুস্পুত্রকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। দ্বিতীয় আরেকটি পোকা-এটাকে আগের তুলনায় একটু বড়ই মনে হলো-সেলিমের বাহুর উপর দিয়ে এখন হাটছে। এবার আর সে অনিহার আবেশে নিষ্ক্রিয় থাকলো এবং পোকাটিকে পিষে মারলো, অনুভব করলো সেটার আঁশালো শরীরর থেকে পিচ্ছিল পদার্থ বেরিয়ে এলো। পোকাটির জায়গায় আবুল ফজল হলে ভালো হতো। তার স্থূল শরীর থেকে কি পরিমাণ চর্বি নিংড়ে বার করা যাবে? সেলিমের চোখ জোড়া আবার বন্ধ হয়ে এলো এবং সে তার মনকে পরম স্বর্গসুখের মাঝে হারিয়ে যেতে দিলো।
হঠাৎ চমকে জেগে উঠে সেলিম দেখতে পেলো আধার আকাশে অসংখ্য তারা ফুটে রয়েছে। তার মাথার দুপাশের শিরা ধড়াস ধড়াস করছে, মুখের ভিতরটা এতো শুকিয়ে গেছে যে মনে হলো জিহ্বাটি মুখের তালুর সঙ্গে আটকে গেছে। এক হাতে পাথরের রেলিং আকড়ে ধরে সে নিজেকে অনেক কষ্টে দাঁড় করালো। তার পা দুটি, বস্তুত সারা শরীর, থরথর করে কাঁপছে। এখনতো শীত লাগার কথা নয়! সবে মাত্র মে মাস চলছে, কদিন পড়ে বর্ষা আরম্ভ হবে- বছরের এই সময়টা সবচেয়ে গরম থাকে। এমন শীতল অনুভূতি তার আগেও হয়েছে এবং তার জানা আছে কীভাবে এর সমাধান করতে হবে। তার পর্যাপ্ত পরিমাণ ওপিয়াম সেবন করা হয়নি। সেলিম হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়লো, তারপর একটি মাত্র বাতি জ্বলতে থাকা ছায়া ঢাকা বারান্দা হামাগুড়ি দিয়ে পেরিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে ওপিয়ামের বাক্সটি অন্ধের মতো হাতড়ে খুঁজতে লাগলো। বাক্সটা কোথায় গেলো? তার মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। বাক্সটি খুঁজে না পেলে তার অবস্থা কি দাঁড়াবে? এই মুহূর্তে তাকে কিছু ওপিয়াম সেবন করতে হবে। তখন তার মনে পড়লো তার সেবায় একাধিক পরিচারক নিযুক্ত রয়েছে…তারা সংখ্যায় দশ জন। সে চিৎকার করে ডাক দিলে বাইরের করিডোর থেকে তারা ছুটে আসবে। না তার প্রয়োজন নেই…বাক্সটি পাওয়া গেছে।
