বাবা, আবুল ফজলের চিঠিতে উল্লেখ ছিলো তুমি আমার জন্য নতুন দায়িত্ব ঠিক করে রেখেছো। আমি তোমার সেবা করার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছি…আমি…
সবই উপযুক্ত সময়ে হবে, আকবর সেলিমকে থামিয়ে দিয়ে বললেন। কাবুল সফরের পরীক্ষায় তুমি ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে। আবুল ফজল আমাকে বলেছে তোমার পাঠানো প্রতিবেদন গুলি যথেষ্ট পূর্ণাঙ্গ ছিলো এবং সাইফ খান নিশ্চিত করেছে সেখানে তুমি ভালো আচরণ করেছে। কিন্তু আমি এখনো এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেইনি যে আগামীতে তোমাকে কি দায়িত্ব প্রদান করবো।
তাহলে সাইফ খান সত্যিই তার উপর গোয়েন্দাগিরি করেছে। সেলিম হাল ছাড়লো না, কোনো প্রাদেশিক প্রশাসকের দায়িত্বও তো আমাকে দিতে পারো, যেমনটা মুরাদ কে দিয়েছো?
অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আমি দেখতে চাই তুমি তোমার ভালো আচরণ বজায় রাখছে কি না। সময় হলে আমি তোমাকে জানাবো তোমার দায়িত্ব কি হবে।
সেলিম চেষ্টা করলো তার হতাশার ভাব প্রকাশ না করতে, কিন্তু সে বুঝতে পারছিলো নৈরাশ্য তার চেহারায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সে আশা করেছিলো ফিরে আশার পর তার এবং তার পিতার সম্পর্কের মাঝে নতুন কোনো অগ্রগতি সূচিত হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তাকে আবারো ক্লান্তি কর ধৈর্যশীলতা অবলম্বন করতে হবে। তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের জন্য দাদীর প্রভাব কাজে লাগানো গেলে ভালো হতো যেমনটা তিনি তার ফিরে আসার ক্ষেত্রে খাঁটিয়েছেন। যাইহোক, এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি না হলেও আরেকটি বিষয়ে সে আকবরকে অনুরোধ করতে পারে যে ব্যাপারে দেরি করা উচিত হবে না। প্রসংঙ্গটি এখনই তার উত্থাপন করা দরকার।
বাবা, আমি কি তোমার কাছে একটি উপকার চাইতে পারি?
কি ব্যাপারে? আকবরকে সত্যিই বেশ অবাক মনে হলো।
আমি আরেকটি স্ত্রী গ্রহণ করতে চাই।
কে সে? এখন আকবরকে দেখে মনে হলো তিনি সম্পূর্ণভাবে আশ্চার্যান্বিত।
সে গিয়াস বেগের কন্যা, যে কাবুলে তোমার কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছে, সেলিম বললো এবং আকবর কোনো উত্তর দিতে পারার আগেই বলে উঠলো, কিন্তু একটি সমস্যাও রয়েছে। মেয়েটির সঙ্গে বাংলায় নিযুক্ত তোমার এক সেনাপতির বাগদান হয়ে গেছে যার নাম শের আফগান। গিয়াস বেগ মনে করেন এই সম্পর্ক ভেঙ্গে দেয়া তার জন্য অসম্মানজনক হবে। কিন্তু তুমি যদি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করো তাহলে গিয়াস বেগ এবং শের আফগান তোমার আদেশ মেনে নিতে বাধ্য হবে এবং…।
যথেষ্ট হয়েছে! আমি ভেবেছিলাম নির্বাসনে থেকে তোমার মধ্যে কিছুটা শুভ বুদ্ধির উদ্রেক হয়েছে, কিন্তু আমার ধারণা ভুল। এটাই অত্যন্ত খারাপ ব্যাপার যে তুমি একটি অখ্যাত পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছো-এই সম্পর্ক আমাদের সাম্রাজ্যের কোনো উপকারে আসবে না। কিন্তু তার চেয়েও দুষ্ট চিন্তা এই যে তুমি তোমার ক্ষণস্থায়ী মোহ চরিতার্থ করার জন্য আমার প্রজাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার কথা বলছো।
এটা কোনো মোহ নয়। তার নাম মেহেরুন্নেসা। আমি আমার মন থেকে কিছুতেই তাকে সরাতে পারছি না।
তোমাকে এই চিন্তা বাদ দিতে হবে। আমি আমার একজন সাহসী যোদ্ধা এবং বিশ্বস্ত সেবকের বিবাহ পরিকল্পনা বানচাল করতে পারবো না তোমার চির-অতৃপ্ত লালসা পূরণ করার জন্য।
এটা আমার লালসা নয়…
তাই নাকি? আমি তো দেখতে পাচ্ছি অন্যের নারীকে অন্যায় ভাবে হস্তগত করার বিষয়টি তোমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আকবরের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ মনে হলো। সেলিম আনারকলিকে সংযুক্ত করে তার পিতার ইঙ্গিতপূর্ণ তিরস্কার হজম করলো। এই মুহূর্তে আত্মপক্ষ সমর্থণ করার জন্য সে আর কিই বা বলতে পারে?
কয়েক মুহূর্তের কষ্টকর বিরতির পর আকবর ক্লান্তভাবে বললেন, তুমি এখন আমার সামনে থেকে বিদায় হও। তোমার প্রস্তাবে আমি অত্যন্ত বিরক্ত এবং হতাশ হয়েছি। আমি আশা করেছিলাম আমাদের পুনর্মিলন যথেষ্ট আনন্দদায়ক হবে, কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছি তুমি তোমার বদভ্যাস গুলিকে এখনোও পরাজিত করতে পারোনি। তোমাকে সংযম চর্চা করতে হবে। কতো অল্প বয়স, তা সত্ত্বেও তোমার পুত্র খুররম ভালো মন্দের পার্থক্য তোমার তুলনায় বেশি বুঝতে পারে।
সেলিম যখন দ্রুত পায়ে তার পিতার কক্ষ ত্যাগ করছিলো ক্ষোভ এবং কষ্টের অশ্রুতে তার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠছিলো। আকবর তাকে কখনোও বুঝতে চেষ্টা করেননি এবং ভবিষ্যতেও বুঝতে পারবেন বলে মনে হয় না। তবে তার পিতার কথা গুলি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন করা ছিলো যা তাকে নির্মম ভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। খুররমের উদাহরণ টেনে তিনি কি ইঙ্গিত দিলেন? যে তার নিজ সন্তান শাসক হিসেবে তার চেয়েও বেশি উপযুক্ত? বোধ হয় না…খুররমের জন্ম যতোই তাৎপর্য ঘেরা ক্ষণে হয়ে থাকুক না কেনো সে বর্তমানে একটি অকালপক্ক শিশু ছাড়া আর কিছু নয়।
*
সেলিম রঙচঙে কাঠের বাক্সটি খুললো, সেটা থেকে একটি কাঁচের বয়াম বের করে আলোর বিপরীতে উঁচু করে ধরলো, তার হাত স্থির নয়। ভালো। বয়ামটির মধ্যে যথেষ্ট সংখ্যক ওপিয়ামের গুলি রয়েছে যা দিয়ে তার সকাল পর্যন্ত চলবে। বয়ামটির রূপার ঢাকনা খুলে, সেলিম ওপিয়ামের দুটি গুলি পান পাত্রের মধ্যে ফেললো তারপর সেখানে কিছু গোলাপজল ঢাললো। ওপিয়াম গুলিকে তরলের মধ্যে ধীরে মিশে যেতে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। দুই একটি অবাধ্য কণা ছাড়া সবটাই গোলাপ জলে মিশে গেলো। সেলিম তার তর্জনী দিয়ে পানপাত্রটির তরলে নাড়া দিলো তারপর সেটি ঠোঁটে ছোঁয়াল। কয়েক মিনিট পর যখন সে অনুভব করলো ওপিয়াম তার শরীরে চমৎকার কাজ শুরু করেছে তখন সে আরেকটি পানপাত্র থেকে কয়েক ঢোক আঙ্গুর দিয়ে তৈরি কড়া স্বাদের লাল বর্ণের সুরা পান করলো যা সে সারাদিন ধরে পান করছিলো।
