কি হলো গিয়াস বেগ?
জাঁহাপনা, আপনার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
ঠিক বুঝলাম না…আমি ভেবেছিলাম আমার প্রস্তাবটি আপনি সাদরে গ্রহণ করবেন।
তা ঠিক আছে জাঁহাপনা। এটা একটা বৃহৎ সম্মানজনক বিষয়, যা আমি কল্পনাও করিনি। কিন্তু এ প্রস্তাব গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কেনো? কি করছে তা না ভেবেই সেলিম এগিয়ে গিয়ে গিয়াস বেগের কনুই এর উপরের অংশ দুহাতে চেপে ধরলো।
আমার মেয়ের বাগদান হয়ে গেছে।
কার সঙ্গে?
আপনার পিতার একজন সেনাপতির সঙ্গে যে বাংলায় দায়িত্ব পালন করছে। তার নাম শের আফগান। একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে আমি এ সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারি না। আমি সত্যিই দুঃখিত জাঁহাপনা।
.
২৬. বিস্মৃতি
জাঁহাপনা, লাহোর থেকে আপনার জন্য একটি চিঠি এসেছে। সেলিমের কোর্চি তার হাতে একটি চামড়ার তৈরি সবুজ ঝুলি দিলো যার মুখ রাজকীয় সীলগালা করা। ঝুলির ভিতর সেলিম একটি চার ভাঁজ করা পুরু কাগজের টুকরো পেলো এবং সেটা খুলে আবুল ফজলের হস্তাক্ষর দেখতে পেলো লাইনের পর লাইন অনেক কিছু লেখা। যথারীতি একগাদা অসার অলংকরণমূলক বক্তব্যের পর একদম শেষের দিকে সেলিম চিঠিটির সারবস্তু খুঁজে পেলো : অতুলনীয় ক্ষমাশীলতার অধিকারী মহামান্য সম্রাট তাঁর সীমাহীন উদারতার বশবর্তী হয়ে অবিলম্বে আপনাকে লাহোরে ফিরে আসতে বলেছেন নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য। তিনি আপনাকে একথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যেও আমাকে আদেশ করেছেন যে তিনি আশা করেন এখন থেকে আপনি ন্যায়ের পথে চলবেন এবং একজন দায়িত্বশীল পুত্রের মতো আচরণ করবেন। তিনি আরো আশা করেন ভবিষ্যতে আপনি অতীতের মতো বিপথগামী হয়ে তাঁর জন্য সীমাহীন মর্মপীড়া এবং হতাশা জনক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি করবেন না।
সেলিম চিঠিটি সুলায়মান বেগের হাতে দিলো, সেটা পড়ে তার মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ছড়িয়ে পড়লো। আমি আশঙ্কা করেছিলাম আরো বহু বছর হয়তো আমাদেরকে এখানে আটকে থাকতে হবে।
যথারীতি চিঠিটির ঢং এমনকি সীলমোহরও আবুল ফজলের, আমার পিতার নয়। যাইহোক, মাত্র আট মাস পড়ে আমাকে ডেকে পাঠানো হবে এমনটা আমি আশা করিনি। আমি সত্যিই অবাক হয়েছি।
তোমার আরো বেশি আনন্দিত হওয়া উচিত। নাকি তুমি এখনো ঐ পারসিক মেয়েটির ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছো? যখন তুমি তোমার স্ত্রীগণ এবং হেরেমের সান্নিধ্যে ফিরে যাবে তখন তুমি উপলব্ধি করবে এই মেয়েটি তোমার জন্য কাবুলের একঘেয়ে জীবনে একটি ক্ষণস্থায়ী চমক ছাড়া আর কিছু ছিলো না।
সেলিম বিবেচনা করতে লাগলো এ বিষয়ে তার সত্যিকার অনুভূতিটি কি। গিয়াস বেগের সঙ্গে তার সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব কাবুলে তার সময় যাপনকে অনেকটা সহনীয় করে তুলেছিলো। আর মেহেরুন্নেসাকে দেখার পর থেকে তাকে ঘিরে তার চিন্তা রাজধানীতে ফিরে যাওয়ার চিন্তার তুলনায় কম উৎসাহব্যঞ্জক ছিলো না। কিন্তু গিয়াস বেগ তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর থেকে তাদের ঘনিষ্টতায় ফাটল ধরেছে। সেলিমের পারসিকটির বাড়ি বেড়াতে যাওয়া অনেক কমে গেছে এবং মেহেরুন্নেসার সঙ্গেও তার আর দেখা হয়নি। তবে সেলিম জানতে পেরেছে শের আফগানের সঙ্গে তার বিয়ে আগামী বছরের আগে হবে না। হয়তো লাহোরে ফিরে গিয়ে সে তার পিতার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গিয়াস বেগের মতো পরিবর্তন করতে পারবে। মেহেরুন্নেসার সঙ্গে শের আফগানের সম্পর্ক ভাঙ্গার জন্য সম্রাট নিজে যদি আদেশ দেন তাহলে গিয়াস বেগের পক্ষে তা পালন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই….
*
কাবুল থেকে গিরিপথ দিয়ে অগ্রসর হয়ে ইন্দুজ এবং পাঞ্জাবের অন্যান্য খরস্রোতা নদী পেরিয়ে হিন্দুস্তানে ফিরে আসার দীর্ঘ যাত্রাটি অত্যন্ত দ্রুত এবং ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো। সেলিমের লাহোরে পৌঁছাতে মাত্র ছয় সপ্তাহ সময় লাগলো। যাইহোক, দীর্ঘ আট মাসের নির্বাসন শেষে প্রথম বারের মতো সে যখন আকবরের কক্ষে এককী তার মুখোমুখী হলো, সেলিমের দেহ ভবিষ্যৎ বিষয়ে উৎকণ্ঠা এবং নতুন আশার মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় প্রকম্পিত হতে লাগলো।
তুমি নিরাপদে কাবুল থেকে ফিরে আসতে পেরেছো দেখে আমি খুশি। আকবরই প্রথম কথা বললেন এবং তার মুখ ভাবলেশহীন। আমি এই জন্য দুঃখিত যে অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে তোমাকে আমি নির্বাসনে পাঠিয়েছিলাম। তবে তোমাকে নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি প্রদান ছাড়া আর কোনো উপায়ও তখন তুমি আমার জন্য রাখনি। আমি আশা করছি নির্বাসনের সময়টিতে তুমি নিজের কৃতকর্ম সম্পর্কে ভাবার যথেষ্ট সময় পেয়েছে এবং একজন পিতার প্রতি তার সন্তানের দায়িত্ব কি হতে পারে সে বিষয়ে তোমার মনস্থির করতে পেরেছে। ভবিষ্যতে অতীতের নির্বুদ্ধিতা এবং অশোভন আচরণ থেকে বিরত থাকবে তোমার কাছ থেকে আমি সেটাই আশা করি।
কিন্তু একজন পিতার তার সন্তানের প্রতি যে দায়িত্ব পালন করা উচিত তার কি হবে, সেলিম মনে মনে ভাবলো, কিন্তু মুখে বললো, আমি বুঝতে পেরেছি তোমার প্রতি আমার আচরণ কেমন হওয়া উচিত এবং আমার দোষত্রুটি ক্ষমা করে আমাকে আবার রাজধানীতে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ।
তোমার অপরাধ অনেক ভয়ঙ্কর মাত্রার ছিলো। তাই আমার ইচ্ছা ছিলো তোমাকে আরো দীর্ঘ সময় কাবুলে রাখার। কিন্তু তোমার দাদীর অনুরোধে আমি তোমাকে এতো তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে এনেছি। আকবরের কণ্ঠস্বর এখনো আড়ষ্ট শোনালো।
