যে সর্বশেষ নারীটির সেলিমের সাম্মুখে নেচেছিলো সেই আনারকলি সেলিমের মনের পর্দায় ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠলো, সেই সঙ্গে তাকে ঘিরে যে অনুশোচনা এবং লজ্জা তাকে গ্রাস করেছিলো তার স্মৃতিও। তবে মেহেরুন্নেসা যে ঢঙে নাচছে সেলিম তা হিন্দুস্তানে কখনো দেখেনি। তার নাচের ভঙ্গীমা গুলি কোমল, ধীর এবং সুনিয়ন্ত্রিত। তার হালকা-পাতলা বাহু এবং আঙ্গুল গুলির মুদ্রা, তার মাথার নড়াচড়া, তার শরীরের রাজকীয় দোলা এবং বাজনার তালে তালে তার মেহেদী চর্চিত পায়ের উত্থান-পতন সবকিছু মিলে এক সম্মোহনী আবেশ তৈরি করছিলো। এ সময় বাজনার শব্দ বাড়ার সাথে সাথে সেলিম সামনের দিকে ঝুঁকে এলো। মেহেরুন্নেসা তার মাথাটি পেছনের দিকে এমন ভাবে হেলিয়ে দিলো যেনো নাচের আনন্দে সে উচ্ছ্বসিত এবং তখনই হঠাৎ করে বাজনা বন্ধ হয়ে গেলো, আর মেহেরুন্নেসা শোভনীয় ভাবে সেলিমের পদযুগলের সম্মুখে হাঁটু গেড়ে নিচু হলো।
পারস্যে বসন্ত বরণের উৎসবের সময় এই নাচটি দেখতে শাহ্ খুব পছন্দ করেন, গিয়াস বেগ বললো, তার মুখমণ্ডলে কোমল গর্ব ফুটে উঠেছে।
তোমার পিতার সঙ্গে আমি একমত, সত্যিই তোমার নাচের দক্ষতা অসাধারণ। দয়া করে উঠে দাঁড়াও।
মেহেরুন্নেসা বিনয়ী ভঙ্গীতে উঠে দাঁড়ালো, কিন্তু যেই সে তার কপালের উপর এসে পড়া একগুচ্ছ উজ্জ্বল কালো চুল সরাতে গেলো অমনি তার নেকাবের এক পাশ ছুটে গিয়ে তার মুখমণ্ডল উন্মোচিত হয়ে পড়লো। তার নাকটি ছোট এবং খাড়া এবং তার চিবুকটি কোমল বাক বিশিষ্ট। এক মুহূর্তের জন্য সে সরাসরি সেলিমের চোখের দিকে তাকালো, তারপর দ্রুত নেকাবটি বেঁধে নিলো।
*
তুমি তাকে খুব অল্প সময়ের জন্য দেখেছো।
সেটাই যথেষ্ট ছিলো সুলায়মান বেগ।
হয়তো সেটা এ কারণে যে তুমি অনেক দিন যাবৎ নারী সংসর্গ থেকে বঞ্চিত রয়েছ।
সেলিম কিছুটা ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে সুলামান বেগের দিকে তাকালো। এটা সত্যি যে লাহোরে তার স্ত্রীগণ এবং হেরেম ছেড়ে আসার পর থেকে সে আর কোনো রমনীর সান্নিধ্যে যায়নি। আনারকলির সোনালী চুল এবং আকর্ষণীয় দেহের সৌন্দর্য এবং তা ধ্বংস করার স্মৃতি তার কামনাকে রহিত করেছে এটাও সত্যি, কিন্তু তার কামনা বাসনা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়নি এবং মেহেরুন্নেসার প্রতি তার আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়ার কারণও সেটা নয়।
তুমি কি এ ব্যাপারে নিশ্চিত, যে অজানা কারণে তুমি তার পিতাকে পছন্দ করো সেই একই কারণে তার প্রতি তোমার দুর্বলতা সৃষ্টি হয়নি? তোমার হয়তো মনে হচ্ছে তার মনটি তার পিতার মতোই হবে এবং অবশ্যই তার দেহটি নারীসুলভ বৈশিষ্টে পরিপূর্ণ। সুলায়মান বেগ হাসলো এবং দাঁতের ফাঁকে একটি আখরোট ভাঙলো, সে সেলিমের কক্ষের জানালার ফোকরে বসে আছে যেখান থেকে দুর্গের আঙ্গিনা দেখা যায়। সত্যি করে বলতো তার মধ্যে তুমি কি বিশেষত্ব দেখেছো?
তার সবকিছুই বৈশিষ্ট মণ্ডিত। তার নড়াচড়া, তার বিনয় সবকিছু। তাকে আমার কাছে একজন রানীর মতো মনে হয়েছে।
তার স্তনগুলি বড় বড় ছিলো?
সে বাজারের বেশ্যা নয়।
তাহলে আমি আমার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করছি কারণ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তোমার বক্তব্য অনুযায়ী একজন নেকাব পড়া মেয়ে তোমার সামনে অল্প সময় নেচেছে, আর তাতেই হঠাৎ তোমার নেংটিতে আগুন জ্বলে উঠলো…
আমি তার মুখ দেখেছি। সুলায়মান, তাকে দেখে আমার দাদা এবং দাদীর মধ্যকার ভালোবাসা পূর্ণ সম্পর্কের কথা মনে পড়ে গেছে। তাকে আমি আমার মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারছি না।
তুমি তো বলছিলে সে নেকাব পড়া ছিলো।
এক মুহূর্তের জন্য তার নেকাব খুলে গিয়েছিলো।
মেয়েটি অত্যন্ত চালাক।
তুমি কি বলতে চাও?
সে ছোট একজন কর্মকর্তার কন্যা যে তোমার রাজ্যর শেষ প্রান্তের এক দুর্গম অঞ্চলে বাস করছে। সুলায়মান বেগ একটি শক্ত আখরোট থু করে মেঝেতে ফেললো, কিন্তু সেলিম বুঝতে পারে প্রকৃতপক্ষে সে কাবুলকেই থুতু দিতে চায়। এই শহর সুলায়মান বেগের কাছে একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর। হিন্দুস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠেছে। সে তোমার নজরে পড়ার চেষ্টা করেছে। এখানে বসে পচার চেয়ে রাজকীয় রক্ষিতা হওয়া অনেক আকর্ষণীয় বিষয়।
হয়তো সুলায়মান বেগের কথাই সত্যি, সেলিম ভাবলো। তার মনের পর্দায় মেহেরুন্নেসার নেকাব খুলে যাওয়ার দৃশ্যটি ভেসে উঠলো। সেটা কি ইচ্ছাকৃত ছিলো? এবং সে কি সেটা পুনরায় বেধে নেয়ার আগে কিছু সময় দেরি করেছে যাতে সেলিম তার মুখটি ভালোমতো দেখতে পায়? যদি তাই হয় তাহলে সেটা ভালোই হয়েছে। এর অর্থ সেও সেলিমের প্রতি আগ্রহী। সেলিম উঠে দাঁড়ালো। আমি তাকে তুচ্ছ একজন রক্ষিতা হিসেবে আশা করি না। আমি তাকে আমার স্ত্রী হিসেবে কামনা করি।
*
তখন সন্ধ্যা নামছে, একজন পরিচারক এসে সেলিমকে খবর দিলো যে গিয়াস বেগ দুর্গে এসে পৌঁছেছে। যেই মুহূর্তে পারসিকটিকে তার কক্ষে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা হলো, সেলিম উদগ্রীব ভাবে তাকে বললো, গিয়াস বেগ, আমি আপনার যুবরাজ হিসেবে এখানে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাইনি, বরং আমি আশা করছি আমি আপনার ভবিষ্যত জামাতা হতে পারবো। আমি আপনার কন্যাকে বিয়ে করতে চাই। মেহেরুন্নেসাকে আমার কাছে সোপর্দ করুন, আমি তাকে আমার স্ত্রীদের মধ্যে প্রধান করবো এবং আমার হৃদয়েও। গিয়াস বেগ ভ্রুকুটি করলো। তার চেহারায় হাসি ফুটে উঠার বদলে বিরক্তির ভাব প্রকাশ পেলো, যা সেলিম আশা করেনি।
