স্বাগতম জাহাপনা। দয়া করে আমার সঙ্গে ভোজনের স্থানে চলুন। সেলিম গিয়াস বেগকে অনুসরণ করে উঠান পার হলো যার দেয়াল ঘিয়া রঙ এবং মৌভি ফুলের আদলে নকশা করা হয়েছে। সেখান থেকে একটি করিডোর হয়ে তারা অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের আরেকটি উঠানে উপস্থিত হলো। উঠানটি জুড়ে গালিচা বিছান হয়েছে। এক পাশের দেয়াল থেকে রেশমের শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে এবং তার নিচে স্বল্প উচ্চতার ডিভানে একাধিক ছোট ছোট বালিশ সাজানো রয়েছে। সেলিম ডিভানটিতে আসন গ্রহণ করতেই গিয়াস বেগ হাত তালি দিলো। সঙ্গে সঙ্গে একাধিক পরিচারক এগিয়ে এলো, তাঁদের একজন সেলিমের হাত ধোয়ার পানি নিয়ে এসেছে এবং অন্যরা ডিভানের সম্মুখের নিচু টেবিলটিতে দামেস্কের চাদর বিছিয়ে তার উপর গোলাপের শুকনো পাপড়ি ছড়িয়ে দিলো।
আমি আমার জন্মস্থানের ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুত করিয়েছি। আশা করি আপনি সেগুলি উপভোগ করে তৃপ্ত হবেন, গিয়াস বেগ বললো।
সেলিমের জীবনে যতো রকম খাবার আস্বাদন করেছে গিয়াস বেগের পরিবেশিত কিছু কিছু পারসিক খাবার তার তুলনায় অনেক বেশি সুস্বাদু মনে হলো তার কাছে। খাদ্য তালিকায় রয়েছে বেদানার আখনিতে (সস) রান্না করা ফিজন্ট পাখির মাংস; খুবানি এবং পেস্তাবাদাম ঠাসা ভেড়ার রোস্ট; লম্বা সুগন্ধি জাফরান, ডালিমের উজ্জ্বল দানা, কিসমিস এবং বিভিন্ন সুস্বাদু বাদাম যুক্ত পোলাও; সেদ্ধ করা বেগুন এবং মটরসুটির ঘন ঝোলে ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য পাতলা মচমচে রুটি প্রভৃতি। গিয়াস বেগের পরিচারকরা সেলিমের পানপাত্রটি কাবুলের খাজা খোয়ান সাইদ অঞ্চলের উৎকৃষ্ট সুরায় সর্বক্ষণ ভরপুর রাখলো।
সেলিম লক্ষ্য করলো কোষাধ্যক্ষ নিজে পান আহারের ক্ষেত্রে মিতভোজী এবং সেলিমের ঘন ঘন প্রশংসা বাক্যগুলি মেনে নেওয়া ছাড়া তেমন কোনো কথাও সে বললো না। কিন্তু যখন প্রধান ভোজের তৈজসপত্র সরিয়ে নিয়ে আঙ্গুর, রূপার আস্তর যুক্ত কাঠবাদাম এবং রসাল তরমুজ পরিবেশন করা হলো, তখন গিয়াস বেগ বললো, জাঁহাপনা, আমি আপনার কাছে একটি উপকার প্রার্থনা করতে চাই। যদি সম্মতি দেন, আমার স্ত্রী আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
নিশ্চয়ই, সেলিম উত্তর দিলো, সে অনুভব করলো এটা তাদের বন্ধুত্বের প্রতি ব্যাপক সম্মান যোজক একটি প্রস্তাব। রীতি অনুযায়ী কেবল পুরুষ আত্মীয়রাই গৃহের মহিলাদের মুখদর্শন করতে পারে। সেলিম ভাবছে তাদের আসনের বিপরীতে অবস্থিত দেয়ালের উপরের দিকে আচ্ছাদিত কাঠের ঝালরের পিছন থেকে গিয়াস বেগের স্ত্রী এবং কন্যা তাঁদের এতোক্ষণ লক্ষ্য করছিলো কি না।
আপনি অত্যন্ত সদয় জাহাপনা। গিয়াস বেগ তার একজন পরিচারককে ফিসফিস করে কিছু বললো এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রস্থান করলো। কয়েক মিনিট পর, একটি লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের অবয়ব উঠানটিতে উপস্থিত হলো। তার মুখমণ্ডল নেকাবে ঢাকা, কিন্তু সেই বস্ত্রখণ্ডের উপরে অবস্থিত নিখুঁত চোখ দুটি সেলিম দেখতে পেলো এবং চওড়া মসৃণ কপালটিও। নিশ্চিতভাবেই তার বয়স গিয়াস বেগের তুলনায় কম। মহিলাটি তার ডান হাতে বুক স্পর্শ করে সেলিমকে সংক্ষিপ্ত কুর্ণিশ করলো এবং তখন গিয়াস বেগ বললো, জাহাপনা এটি আমার স্ত্রী, আসমত।
আপনার আতিথেয়তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আসমত। আমি কাবুলে আসার পর এর থেকে উত্তম খাবারের স্বাদ আর পাইনি।
আপনি আমাদের ব্যাপকভাবে সম্মানিত করেছেন জাঁহাপনা। বহু বছর আগে আপনার পিতা মহামান্য সম্রাট আমাদের পরিবারকে দারিদ্র থেকে রক্ষা করেছিলেন কিম্বা তার থেকেও খারাপ কিছু থেকে। আপনাদের প্রতি আমাদের ঋণের অতি ক্ষুদ্রতম পরিমাণ আজ পূরণ করতে পেরে আমি তৃপ্ত। সে তার স্বামীর মতোই সম্ভ্রান্ত পারসিক ভাষায় কথা গুলি বললো এবং তার কণ্ঠস্বর একাধারে সুরেলা এবং নিচু।
আমার পিতা আপনার স্বামীকে নিয়োগ প্রদান করে একজন উত্তম এবং বিশ্বস্ত সেবক লাভ করেছেন। আমাদের কাছে আপনাদের কোনো ঋণ নেই।
আসমত তার স্বামীর দিকে এক পলক তাকালো। জাঁহাপনা, আপনার। কাছে আমাদের আরেকটি আর্জি রয়েছে। যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমাদের কন্যা মেহেরুন্নেসা আপনাকে তার নাচ দেখাবে। তার শিক্ষকগণ, যারা তাকে পারসিক ঢঙে নাচ শিখিয়েছে, তারা বলে সে নৃত্যকলায় ততোটা অদক্ষ নয়।
অবশ্যই তার নাচ দেখবো আমি। সেলিম গদিতে হেলান দিয়ে বসলো এবং গাঢ় লাল বর্ণের সুরায় ছোট করে চুমুক দিলো। সেই মেয়েটিকে দেখার জন্য তার ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে, যাকে একটি গাছের খোদলে রেখে চলে যাওয়া হয়েছিলো বুনো পশুর খাদ্য হওয়ার জন্য।
তিনজন বাজিয়ে হাজির হলো-দুইজন ঢুলি এবং একজন বংশীবাদক। ঢুলিগণ আসন গ্রহণ করেই তাদের বাদ্যযন্ত্রে শক্তিশালী বোল তুললো এবং বাঁশিওয়ালা তার মোহন বাঁশিতে অসাড়তা সৃষ্টিকারী এক রহস্যময় সুর সৃষ্টি করলো। তারপর বাজিয়েদের বাজানার সঙ্গে সমন্বিত তালে একাধিক ঘন্টার টুং টাং শব্দ এগিয়ে এলো যখন মেহেরুন্নেসা উঠানটিতে দৌড়ে আবির্ভূত হলো। সে তার মায়ের মতোই নেকাব পড়ে আছে কিন্তু নেকাবের উপরের অংশে উন্মুক্ত চোখ দুটি আসমতের মতোই দ্যুতিময় এবং বড় বড়। সে মাছরাঙার পালকের মতো নীল বর্ণের রেশমের ঢিলা আলখাল্লা পড়ে আছে। সে যখন তার হাত দুটি উপরে তুলে ঘোরা শুরু করলো তখন সেলিম তার দুহাতে দুটি সোনালি চাকতি দেখতে পেলো যার মাঝে ছোট ছোট রূপালী ঘন্টা যুক্ত রয়েছে।
