সেলিম সামান্য চমকে উঠলো। গিয়াস বেগ কি তার অবস্থা সম্পর্কে পরোক্ষ ইঙ্গিত প্রদান করলো? অবশ্য সে অত্যন্ত সম্মানের সাথে কথা গুলি বলেছে। যাই হোক, সে নিজে এতো ধৈর্যশীল এবং দার্শনিক হতে পারবে না। যখনই কোনো রাজকীয় বার্তাবাহক কাবুল দুর্গের প্রবেশ দ্বার অতিক্রম করেছে, তার মনে হয়েছে এই হয়তো তার পিতা তাকে রাজধানীতে ডেকে পাঠিয়ে বার্তা প্রেরণ করেছেন, কিন্তু অদ্যাবধি আকবর তাকে একটি বাক্যও প্রেরণ করেননি। বরং তার কাছে যে প্রশাসনিক চিঠি গুলি এসেছে তার সবগুলিই আবুল ফজলের লেখা এবং যথারীতি সেগুলি নানা অপ্রাসংঙ্গিক প্রশ্নে জর্জরিত, যেমন কাবুলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে কেমন বা কান্দাহারে যাওয়ার রাস্তাটির বর্তমান অবস্থা কি, ইত্যাদি।
দয়া করে এখান থেকে একটি মিষ্টান্ন চেখে দেখুন। অতিথিদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা পারস্যের রেওয়াজ। আমার স্ত্রী নিজ হাতে এগুলো কাঠবাদাম ও মধু দিয়ে তৈরি করেছে।
আপনার স্ত্রী কি একটাই?
সে আমার দেহের একটি অঙ্গের মতো। ওকে ছাড়া আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই।
আপনি একজন সৌভাগ্যবান পুরুষ। খুব কম মানুষই এমন কথা বলতে পারে, সেলিম বললো, গিয়াস বেগের বক্তব্য তাকে তার দাদা এবং দাদীর সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিলো। আপনার স্ত্রীর পারস্যে ফিরে যাওয়ার জন্য মন খারাপ হয় না?
আমাদের বর্তমান অবস্থানে সে আমার মতোই পরিতৃপ্ত, আল্লাহ আমাদের যথেষ্ট আশীর্বাদ প্রদান করেছেন।
সেলিম কোষাধ্যক্ষের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার আত্মমর্যাদা বোধ এবং সহিষ্ণুতা তাকে অভিভূত করেছে। সে মনে মনে ভাবলো তার যে কোনো স্ত্রীর সঙ্গে তার বন্ধন এরকম বলিষ্ঠ হলে ভালো হতো। কিন্তু এ সময় তার মনে পড়লো সে এখানে এসেছে গিয়াস বেগের কাছ থেকে রাজস্বের হিসাব নিকাষ সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য, তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে জানার জন্য নয়। আপনার হিসাব বহি গুলি নিয়ে আসুন গিয়াস বেগ এবং সেগুলি আমার কাছে ব্যাখ্যা করুন। সাইফ খান আমাকে বলেছে আপনি কর আদায় পদ্ধতিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছেন…
*
রাতের উষ্ণ বাতাস ঘুঁটেপোড়া, মসলা এবং রুটি সেঁকার তীব্র ঘ্রাণে পূর্ণ হয়ে রয়েছে। কাবুলের নাগরিকরা তাদের সান্ধ্যভোজের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বাড়ির সমতল ছাদ গুলিতে। সেলিম শহরের রাস্তা দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে অগ্রসর হচ্ছে। সদ্য আরম্ভ হওয়া বসন্তের বিগত সপ্তাহ। গুলিতে সে এতো বার গিয়াস বেগের বাড়িতে যাওয়া আসা করেছে যে তার ধূসর রঙের স্ট্যালিয়ন ঘোড়াটি এখন হয়তো চোখ বাঁধা অবস্থায় সেখানে পৌঁছাতে পারবে। তুমি ঐ বুড়োটির সঙ্গে কি এতো আলাপ করো? তুমি তার সঙ্গে এতো সময় কাটাও যা আমি আমার নিজের বাবার সঙ্গে কখনো কাটাইনি, সুলায়মান বেগ সেই দিন আরো আগে এমন মন্তব্য করেছিলো, যেমনটা সে আগেও কয়েকবার করেছে। এ ঘটনা তাকে ভীষণ অবাক করেছে। যে সেলিম কাবুলের আশেপাশের জঙ্গলে বুনো গাধা শিকার বা পাহাড়ে বাজপাখি উড়ানোর বদলে গিয়াস বেগের সঙ্গই বেশি পছন্দ করছে।
বিষয়টি সেলিম নিজেও ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারছে না। গিয়াস বেগের মাঝে সে একটি সংস্কৃতিবান, সভ্য ব্যক্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। তিনি একজন বুদ্ধিমান এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা সম্পন্ন মানুষ যে তার মতোই সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা অনুভব করে। কিন্তু সেলিমের মতো অতৃপ্তিবোধ তার মাঝে নেই। বর্তমানে সেলিমের গিয়াস বেগের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য তার দক্ষতা এবং সততা যাচাই এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইতোমধ্যেই কোষাধ্যক্ষ তার হিসাবের স্পষ্টতা এবং নির্ভুলতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এবং এটাও পরিষ্কার ভাবে বোঝা গেছে যে তার বিলাস বহুল জীবন যাপন ব্যয় তার পদাধিকার অনুযায়ী প্রাপ্ত বেতনেই মিটানো সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া তিনি ব্যক্তিগত টুকটাক ব্যবসা করেও ভালোই রোজগার করেন। সেলিম আরো আবিষ্কার করেছে তাদের দুজনের মধ্যে বয়সের ব্যাপক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শিল্পকলা এবং প্রাকৃতিক অনেক বিষয়ে তাদের আগ্রহের মিল রয়েছে।
আজকের রাতটি অবশ্য কিছুটা ভিন্ন তাৎপর্য বিশিষ্ট। আজ প্রথম বারের মতো গিয়াস বেগ তাকে দাওয়াত করেছে তার সঙ্গে সান্ধ্যভভাজে অংশ নেয়ার জন্য। সেলিম দূর থেকে কোষাধ্যক্ষের বাড়িটির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো সেটি আলো ঝলমল করছে। লাল, সবুজ, নীল এবং হলুদ বর্ণের কাঁচের চিমনি যুক্ত লণ্ঠন বাড়িটির সম্মুখের বিভিন্ন গাছের ডাল থেকে ঝুলছে। বাড়িটির প্রবেশ পথের উভয় দিকে চারফুট উঁচু ঝাড়বাতিদান স্থাপন করা হয়েছে যাতে বহু সংখ্যক মোমবাতি প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে। রত্নখচিত আগরবাতি দানে স্থাপিত সুগন্ধী রজন মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে।
যথারীতি গিয়াস বেগ তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বাইরে অপেক্ষা করছিলো। যে কোনো সময়ের তুলনায় আজ তার পোশাক পরিচ্ছদ আরো বেশি জাঁকজমকপূর্ণ।
তার রেশমের আলখাল্লাটি ফুল এবং প্রজাপতির নকশা করা এবং তার কোমরে সোনার শিকলে বাঁধা রয়েছে হাতির দাঁতের হাতল বিশিষ্ট খঞ্জর যার খাপটি প্রবাল এবং টারকোয়াজ এর সমন্বয়ে তৈরি। তার মাথায় রয়েছে একটি লম্বা আকারের মখমলের টুপি। এমন টুপি সেলিম পারস্য থেকে আকবরের রাজসভায় আগত শাহ্ এর প্রতিনিধিদের মাথায় দেখেছে।
