গিয়াস বেগের বাড়িটি বড় আকারের একটি দোতলা ভবন যা গাছে ঢাকা একটি চত্বরের একপাশ জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। কোষাধ্যক্ষ, সবুজ রেশমের পাগড়ি পড়ে এবং দুপাশে সারিবদ্ধ পরিচারক নিয়ে বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করছিলো সেলিমকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। সেলিম দেখতে পেলো যেখানে সে ঘোড়া থেকে নামবে সেখান থেকে শুরু করে বাড়ির চেস্টনাট(এক ধরনের বাদাম গাছের কাঠ) কাঠের পালিশ করা সিঁড়ি পর্যন্ত বরফ গলা ভূমির উপর লম্বা বেগুনি রঙের মখমল বিছানো হয়েছে।
জাহাপনা, আমার গৃহে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। গিয়াস বেগ একজন সহিসকে হাতের ইশারায় সরিয়ে দিয়ে নিজেই সেলিমের ঘোড়ার রেকাবটি শক্ত করে ধরলো যখন সে নামলো। দয়া করে আমার সঙ্গে আসুন।
সেলিম তার দেহরক্ষী এবং অন্য সৈন্যদের ইশারায় বাইরে থাকতে বলে গিয়াস বেগকে অনুসরণ করলো এবং বাড়ির প্রবেশ দ্বারের ভেতরে অবস্থিত উঠান পেরিয়ে একটি বড় আকারের বিলাসবহুল আসবাবপত্রে সজ্জিত কক্ষে উপস্থিত হলো। কক্ষের মধ্যে দুটি ধাতব ঝুড়ির মধ্যে কয়লা ধিক ধিক করে জ্বলে কক্ষটিকে উষ্ণ রেখেছে। কক্ষের দেয়াল গুলিতে ঘিয়া রঙের বাহারী কারুকাজ করা পর্দ ঝুলছে এবং দেয়ালের কাছাকাছি জায়গায় নীলা বর্ণের মখমলের বালিস ও কোলবালিস পরিপাটি করে সাজান। মেঝেতে বিছান সমৃদ্ধ বর্ণে বর্ণিল শতরঞ্জি যথেষ্ট পুরু এবং নমনীয়, এগুলো কাবুল দূর্গের তুলনায় নিঃসন্দেহে উন্নত এবং ব্যয়বহুল-বাস্তবে লাহোরের প্রসাদ ছাড়ার পর থেকে এর থেকে উত্তম কিছু সেলিম দেখেনি।
আপনি অত্যন্ত সৌখিন জীবনযাপন করেন, সেলিম মন্তব্য করলো। গিয়াস বেগের বাড়ির চমৎকারিত্ব আবারো তার মনে সন্দেহ প্রজ্জ্বলিত করেছে। সাইফ খানের ভাষ্য অনুযায়ী সে যদি শ্রেষ্ঠ কর আদায়কারী হয়ও, সে কি কিছু মাখন তার নিজের জন্যেও সরিয়ে রাখছে?
আমার গৃহ আপনার পছন্দ হয়েছে জেনে আমি আনন্দিত। পারস্যে আমার বাড়ি যেমন ছিলো তেমনি ভাবেই আমি সবকিছু সাজানোর চেষ্টা করেছি। নানা গড়নের কারুকাজ এবং নকশা করা টালী সহ অনেক কিছু আমদানী করেছি। বহু বাণিজ্য কাফেলা কবুলের উপর দিয়ে চলাচল করে, তাদের কাছে একজন মানুষ যে কোনো ভোগ্যপণ্য পেতে পারে। দয়া করে সামান্য জলখাবার গ্রহণ করুন। কাবুলে যে আঙ্গুর জন্মায় তা থেকে উত্তম মানের সুরা প্রস্তুত হয়- একেবারে গজনীল বিখ্যাত সুরার অনুরূপ। অথবা আপনি গোলাপের নির্যাস দিয়ে তৈরি শরবতও পান করতে পারেন। আমার স্ত্রী তার নিজের বাগানে উৎপাদিত গোলাপ থেকে এই শরবত তৈরি করে।
শরবতই দিন।
একজন পরিচারক সেলিমের সামনে রূপার পানি ভর্তি বাটি ধরলো হাত ধোয়ার জন্য এবং তারপর তাকে একটি সুগন্ধযুক্ত তোয়ালে দিলো হাত মোছার জন্য। অন্য আরেক জন পরিচারক একটি রূপার পান পাত্রে শরবত ঢেলে তার দিকে বাড়িয়ে দিলো। সেলিম পাত্রটি নিয়ে শরবতে চুমুক দিলো। গিয়াস বেগ ঠিকই বলেছে। শরবতের স্বাদ ও গন্ধ একদম গোলাপ ফুলের মতোই।
আমি হিসাব বহি গুলি আপনার পর্যবেক্ষণের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জাহাপনা। আপনি কোনো হিসাব আগে দেখতে চান? কাফেলা কর নাকি গ্রামীণ রাজস্ব?
একটু পরে হিসাব দেখবো, সেলিম বললো, সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আলাপচারিতার মাধ্যমে গিয়াস বেগের ভেতর থেকে কোনো বোস তথ্য বের করে আনার। প্রথমে এখানে আপনার জীবনযাপন ধরণ সম্পর্কে কিছু বলুন। এ বিষয়ে আমি জানতে আগ্রহী।
কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে জাহাপনা?
আপনি একজন শিক্ষিত এবং সংস্কৃতিবান লোক। আপনি কাবুলের মতো জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিলেন কীভাবে? এখানকার বিবাদমান গোত্রগুলি, তাঁদের আমরণ ঝগড়া লড়াই এবং লোভী সওদাগরদের মাঝে আপনি কীভাবে পরিতৃপ্ত জীবন কাটাচ্ছেন?
একজন মানুষ তার মনকে স্থির করতে পারলে যে কোনো ক্ষেত্রেই পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারে। এবং স্মরণ করুন জাঁহাপনা, এমন দুর্গম অঞ্চলে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমার কৃতজ্ঞ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যখন আপনার পিতা আমাকে সপরিবারে এখানে পাঠালেন তখন তিনি আমাকে চরম দারিদ্র থেকে উদ্ধার করেছিলেন এবং ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশা প্রদান করেছিলেন। এই অঞ্চলটি ইসফাহান বা লাহোরের মতো নয়, কিন্তু আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, আমার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি এবং তার পরিণতিতে আমার জীবনে সমৃদ্ধি এসেছে। মহামান্য সম্রাট তার সেবকদের উত্তম পারিশ্রমিক প্রদান করেন। ইতোমধ্যে আমি যতো সম্পদ অর্জন করেছি তার সাহায্যে আমি অনায়াসে পারস্যে ফিরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারি। কিন্তু আমি আপনার পিতার একজন বিশ্বস্ত ভৃত্য এবং আমি এখানেই থাকতে চাই যতোদিন পর্যন্ত আমর পক্ষে তাকে উত্তম সেবা প্রদান করা সম্ভব। হয়তো একদিন তিনি আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে দিল্লী বা আগ্রার মতো সমৃদ্ধ কোনো নগরীতে নিয়োগ প্রদান করবেন।
গিয়াস বেগের চিন্তা ভাবনা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত, সেলিম ভাবলো। কিন্তু যদি তিনি আপনাকে সেরকম কোনো নিয়োগ না দেন? সেলিম জিজ্ঞাসা করলো।
আমি আমার বর্তমান পদ নিয়ে যথেষ্ট পরিতৃপ্ত রয়েছি জাঁহাপনা। যখন কোনো মানুষ দেখতে পায় মৃত্যু তাকে এবং তার পরিবারকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে এবং এর থেকে পরিত্রাণ পায় তখন সে তার যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা অনুভব করে এবং যা সে অর্জন করতে পারবে না তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে না। এটা আমাদের সকলের জন্যই একটি উত্তম শিক্ষণীয় বিষয় জাঁহাপনা, আমাদের জীবনের গন্তব্য যাই হোক না কেনো।
