আমার মনে আছে সেই ঘটনাটির কথা যখন আপনি ফতেহপুর শিক্রিতে এসেছিলেন, গিয়াস বেগ।
জেনে আমি সম্মানিত বোধ করছি জাহাপনা।
আপনার পরিবার কেমন আছে?
তারা সকলে সুস্থ সবল রয়েছে জাঁহাপনা। কাবুলের পাহাড়ী আবহাওয়া তাদের জন্য সহায়ক হয়েছে।
আর আপনার কন্যাটি? সেলিম মেয়েটির নামটি স্মরণ করার জন্য যুদ্ধ করতে লাগলো। মেহেরুন্নেসা, এটাই ওর নাম তাই না?
জ্বী, জাঁহাপনা। মেহেরুন্নেসা, নারীদের মধ্যস্থিত সূর্য। সেও ভালো আছে।
স্পষ্টতই আপনি এখানে ভালোই গুছিয়ে নিয়েছেন। আমার পিতা আপনাকে কাবুলে পাঠিয়েছিলেন একজন সহকারী হিসাবরক্ষক হিসেবে কিন্তু বর্তমানে আপনি একজন পূর্ণ কোষাধ্যক্ষ, সেলিম বললো, এবং একটু ইতস্তত করে আবার শুরু করলো: বাবা আমাকে কাবুলে পাঠিয়েছেন এর শাসন ব্যবস্থা পরিদর্শন করার জন্য এবং এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে এখান থেকে অর্জিত রাজস্ব রাজকীয় কোষাগারে ঠিক মতো পাঠানো হচ্ছে কি না।
আমি আমার জীবন বাজি রেখে বলতে পারি একটি মুদ্রাও অপচয় হচ্ছে না।
শুনে খুশি হলাম, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি আপনার হিসাব বহি গুলি পর্যকেক্ষণ করতে চাই।
নিশ্চয়ই জাহাপনা। আমি হিসাব বহিগুলি এখানে নিয়ে আসতে পারি, অথবা যদি আপনার মর্জি হয় তাহলে ঝড়ের প্রকোপ কমে আসার পর আপনি এই গরীবের গৃহ দর্শন করেও সেগুলি যাচাই করতে পারেন।
ঠিক আছে, আমি যাবো।
সেলিম এবং কাবুলের প্রশাসককে রেখে বাকিরা যখন প্রস্থান করলো, সেলিম কিছুক্ষণ অগ্নিকুণ্ডের দিকে তাকিয়ে রইলো। গিয়াস বেগ সম্পর্কে তার মনে কিছুটা কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে, প্রথম বার তাকে ফতেহপুর শিক্রিতে দেখার সময় যেমনটা হয়েছিলো। যেমন সহজ ভাবে তার মুখ থেকে মসৃণ বাক্যগুলি বেরিয়ে আসছিলো তা যে কোনো সভাসদের জন্যেই মানানসই। তথাপি, সে যখন গিয়াস বেগকে রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলো তখন তার চেহারা কেমন হয়েছিলো সেটা সেলিমের দৃষ্টি এড়ায়নি। পারসিকটিকে তার আত্মসম্মানবোধের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন মনে হয়েছে।
জীবনের বৈচিত্রময় ধরণ সম্পর্কে তার দাদী তাকে কিছু কথা বলেছিলেন এবং সেটা বিশেষভাবে গিয়াস বেগ সম্পর্কে, কথাগুলি সেলিমের মনে পড়লো। তিনি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন এই পারসিকটি একদিন হয়তো মোগল সাম্রাজ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেটা কেমন ভূমিকা? ভালো না মন্দ? পাশে তাকিয়ে সেলিম দেখতে পেলো সাইফ খান তাকে এতোক্ষণ কৌতূহল নিয়ে লক্ষ্য করছিলো। সে কি ভাবছে? এই যে, সম্রাটের বিপথগামী পুত্র কাবুলে প্রেরিত হয়েছে তার অপকর্মের শাস্তিস্বরূপ? সাইফ খানের জানার কথা যে সেলিমের পরিদর্শকের ভূমিকা নেহায়েত একটি অজুহাত এবং তাকে রাজধানী ত্যাগ করতে হয়েছে অত্যন্ত লজ্জাজনক ভাবে। গুজব অত্যন্ত দ্রুত অগ্রসর হয়, এমন কি আবুল ফজল যদি তাকে এই বিষয়ে কোনো চিঠি নাও লিখে থাকে (তবে সেলিম নিশ্চিত যে আবুল ফজল সাইফ খানকে চিঠি লিখেছে), হয়তো এমন নির্দেশনাও প্রদান করেছে যে সেলিমের আচরণ সম্পর্কে তর। আবুল ফজলকে অবহিত করতে হবে। নিজের মনের বিভ্রান্তি গোপন করতে সেলিম জিজ্ঞাসা করলো, আমাকে গিয়াস বেগ সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন। তিনি কি সত্যিই তেমন দক্ষ এবং সৎ কোষাধ্যক্ষ যেমনটা তিনি দাবি করেন?
কাবুলে মহামান্য সম্রাটের তার তুলনায় উত্তম সেবক আর কেউ নেই। তিনি কাফেলা, শহর এবং গ্রামগুলি থেকে কর আদায়ের পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেছেন। গত পাঁচ বছর ধরে আমি কবুলের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এ সময়ের মধ্যে তিনি রাজস্ব আয় অর্ধেকের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি করেছেন।
বহু বছর আগে আকবরের সামনে বক্তব্য প্রদানের সময় গিয়াস বেগ যতোটা নির্ভেজাল ছিলো আজো হয়তো তেমনই রয়েছে, সেলিম ভাবলো। সে আরো উপলব্ধি করলো সাইফ খান তার আচরণ সম্পর্কে কোনো বিবরণী আবুল ফজলকে পাঠালো কিনা অথবা সে সাইফ খান সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন তৈরি করলো কি না এ সম্পর্কিত চিন্তা ভাবনা অর্থহীন। তাকে একজন বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন পরিদর্শকের মতো কাবুলের রাজস্ব আদায় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে পিতার প্রতিনিধি হিসেবে। কেবলমাত্র এ কাজে সফল হলেই তার পক্ষে পুনরায় আকবরের নেকদৃষ্টি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।
*
তুষারপাত বন্ধ হয়েছে এবং দূর্গপ্রাচীরের উপর জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করেছে। সম্মুখে অগ্রদূত ঘোরসওয়ার এবং পিছনে জাহেদ বাট ও অন্যান্য দেহরক্ষীদের নিয়ে সেলিম ঘোড়ার পিঠে আসিন হয়ে দূর্গপরিখার উপর পাতা কাঠের ঢালু পাটাতন দিয়ে নেমে এলো। নিচের শহরে অবস্থিত গিয়াস বেগের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সে সুলায়মান বেগকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো। কিন্তু তার দুধভাই হাসতে হাসতে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে হিসাবনিকাষের ক্ষেত্রে তার তেমন মাথা নেই। ঠাণ্ডা বাতাসের ধাক্কায় শীতের ফ্যাকাশে নীল আকাশে ছোট ছোট তুলট মেঘ উড়ে চলেছে যখন সেলিম শহর প্রাচীরের সম্মুখে উপস্থিত হলো। প্রাচীরের ভেতরে অবস্থিত সরাইখানা গুলি থেকে রান্নার ধোয়া উঠছে যেখানে মুষ্টিমেয় কষ্টসহিষ্ণু ভ্রমণকারী যাত্রাবিরতি করছে। কিন্তু যখন শীতকাল শেষ হবে এবং সবগুলি গিরিপথ চলাচলের উপযুক্ত হবে তখন কাবুল লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠবে। তখন রাস্তা দিয়ে হাটলে কেউ হয়তো বিশ বা ত্রিশ ধরনের ভাষা শুনতে পাবে। সাইফ খান সেলিমকে এমনটাই বলেছে। সাইফ খান সেলিমের সঙ্গী হওয়ার জন্যে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো। অবশ্য কাবুলে এসে সেলিম যেখানেই যেতে চেয়েছে সেখানেই সে তার সঙ্গে যেতে চেয়েছে। কিন্তু সেলিম সাইফ খানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠে। সে কি তার উপর নজরদারী করার চেষ্টা করছে? সে যাই হোক, সেলিম প্রদেশিক প্রশাসকের ক্লান্তিকর সঙ্গ, একই গল্পের পুনরাবৃত্তি এবং স্থূল কৌতুকের বিষয়ে বিরক্ত হয়ে পড়েছিলো। সে তাই সিদ্ধান্ত নেয় গিয়াস বেগের সঙ্গে দেখা করার সময় তাকে সঙ্গে নেবে না।
