সেলিমের এতোক্ষণ টানটান হয়ে থাকা কাঁধ দুটি শিথিল হয়ে এলো। তার দীর্ঘ নির্বাসন যাত্রা শীঘ্রই সমাপ্ত হতে যাচ্ছে।
৫.৩ কাবুলের কোষাধ্যক্ষ
২৫. কাবুলের কোষাধ্যক্ষ
নগর রক্ষাকারী দুর্গের বিশাল দেয়ালটি-যা বেশিরভাগ জায়গায় কমপক্ষে দশ ফুট পুরু-শীতকালীন ঝড়ঝঞ্ঝার বিরুদ্ধে কাবুল শহরটির জন্য উত্তম প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। দুই দিন আগে সেলিমের কাবুলে পৌঁছানোর পর থেকে ঝড়ো আবহাওয়ার খুব একটা উন্নতি হয়নি। সেলিম যে বড় আকারের দরবার হলটিতে বর্তমানে রয়েছে সেটার মধ্যস্থলে অবস্থিত অগ্নিকুণ্ডে খঞ্জক কাঠ পোড়ার ঠাস ঠাস শব্দ হচ্ছে এবং থেকে থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠছে। আগুনের তাপ থাকা সত্ত্বেও সেলিম হাড় পর্যন্ত শীতল কম্পন অনুভব করছে। সে আগুনের আরেকটু কাছে গিয়ে নিজের হাত দুটি গরম করতে করতে সাইফ খানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো, যে একটু আগে তার পরিচারকদের নির্দেশনা প্রদান করতে গেছে।
পরিচারকরা যখন অগ্নিকুণ্ডটির মধ্যে আরো কাঠ দিলো, সেলিম পাশ ফিরে লম্বা কক্ষটির শেষ প্রান্তের নিচু মঞ্চের উপর অবস্থিত সিংহাসনটির দিকে তাকাল। সেটার লাল মখমলের গদিটি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে এবং সোনা মোড়ানো পায়া গুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। লাহোর বা ফতেহপুর শিক্রির রাজপ্রাসাদ গুলিতে এমন মলিন সিংহাসন থাকার কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু সেলিম সিংহাসনটির দিকে সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো। এই সিংহাসনটিতেই তার প্রপিতামহ, ভবিষ্যত মোগল সাম্রাজ্যের মূল জনক বাবর কাবুলের রাজা হিসেবে আসন গ্রহণ করতেন এবং রাজ্য পরিচালনা করতেন। সম্ভবত এই আসনটিতে বসেই তিনি তাঁর হিন্দুস্তান অভিযানের সংকল্প ঘোষণা করেছিলেন। কক্ষের অমসৃণ পাথুরে দেয়ালের উঁচুতে অবস্থিত ধারকগুলিতে স্থাপিত মশালের কম্পিত আলোতে সেলিম তার কল্পনার দৃশ্যপটে যেনো বাবরকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো তিনি গর্বিত ভঙ্গীতে কোমর বন্ধনীতে যুক্ত আলমগীর সহ সিংহাসনে বসে আছেন। যেভাবে বাবর এতো দূরে অবস্থিত কাবুল থেকে নিজ উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য হিন্দুস্তান অভিযানে অগ্রসর হয়েছিলেন ঠিক অনুরূপভাবে তার প্রপৌত্রের পক্ষেও কি শেখ সেলিম চিশতির ভবিষ্যতবাণী বাস্তবায়ন করার জন্য একই রকম অভিযান করা সম্ভব নয়? সেলিম নিজেকে সান্ত্বনা দিলো। তুষারপাত কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে কাবুলের উত্তরের পাহাড়ী এলাকার বাগানে অবস্থিত বাবরের সমাধি দর্শন করবে…।
বাবর যে কঠিন রুক্ষ পরিবেশে থেকে হিন্দুস্তান জয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন তার তুলনায় বাহারী অংকরণ এবং বিলাসিতায় পরিপূর্ণ হিন্দুস্ত নের মোগল রাজপ্রাসাদ গুলির বালুপাথরের কারুকাজ, সুগন্ধী জলের ফোয়ারা এবং জাকজমকপূর্ণ উৎসব আয়োজনের বৈপরীত্য দুই স্থানের বিশাল দূরত্বের চেয়েও বেশি কিছুর জন্য পৃথক। অবশ্য কাবুলের দুর্গপ্রাসাদটি শহর থেকে অনেক উপরে একটি শৈলান্তরীপের উপর নির্মাণ করা হয়েছিলো রুচিবানদের প্রশংসা অর্জনের জন্য নয়। এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো এই অঞ্চলের বেপরোয়া গোত্র গুলির মাঝে ত্রাস সৃষ্টির জন্য এবং এই এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাণিজ্য পথ গুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। বড় বড় বাণিজ্য কাফেলা যার মাধ্যমে সারা বছর ধরে মণিমাণিক্য থেকে শুরু করে চিনি, বস্ত্র, মসলা সহ আরো বহু কিছু পরিবাহিত হয় সেগুলির কাছ থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের উপরই কাবুলের উপার্জন নির্ভরশীল এবং এজন্য সেগুলির নিরাপত্তা বিধান করাও কাবুলের প্রশাসকের দায়িত্ব। এমনকি বর্তমানে কাবুল থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব মোগল কোষাগারের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। মাফ করবেন জাহাপনা, আপনাকে একা রেখে যাওয়ার জন্য আমি দুঃখিত। সাইফ খান তার জেল্লাদার শিয়ালের চামড়ার আস্তরণ বিশিষ্ট আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় পুনরায় আবির্ভূত হলো। সে একজন মজবুত গড়নের সদয় চেহারার মধ্যবয়সী লোক, যদিও তার বাম গালে একটি সাদা বর্ণের লম্বা ক্ষতচিহ্ন রয়েছে এবং তার বাম কানের স্থলে অসমতল গোলাপি মাংস ব্যতীত আর কিছু নেই। এসব ক্ষত দেখে অনুমান করা যায় সে একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, তবে সেলিম জানতো না সে বহু বছর ধরে মোগল সম্রাটের পক্ষে সীমান্তবর্তী এলাকায় কৃতিত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়েছে এবং এর পুরস্কার স্বরূপ আকবর তাকে কাবুলের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি আমার অন্যান্য সভাসদদের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।
নিশ্চয়ই।
সাইফ খান ফিসফিস করে তার পরিচারককে কিছু বললেন এবং সে দরবারে প্রবেশের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটি খুললো। তারপর ছয়জন মন্ত্রীকে পথ দেখিয়ে কাছে নিয়ে এলো। প্রশাসক একে একে সকলকে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন-ইনি আমার অশ্বসংগ্রাহক, ইনি রসদ সংগ্রাহক, ইনি সেনাপতি… প্রত্যেকে সেলিমকে কুর্ণিশ করতে লাগলো, সেলিম কেবল ভদ্রতা বশত তাদের পর্যবেক্ষণ করলো। কিন্তু এরপর সাইফ খান এমন একজনের নাম উচ্চারণ করলো যার প্রতি সেলিম বিশেষ আগ্রহ নিয়ে তাকালো। ইনি গিয়াস বেগ, কাবুলের কোষাধ্যক্ষ। গিয়াস বেগ…নামটি আগে যেনো কোথায় সে শুনেছে? সেলিম কুর্ণিশরত লম্বা আড়ষ্ট লোকটিকে ভালো মতো লক্ষ্য করলো। লোকটি যখন আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালো সেলিম তার সূক্ষ্ম চোয়াল বিশিষ্ট মুখটি চিনতে পারলো- সর্বশেষ তাকে যখন দেখেছে সে তুলনায় তার মুখটি অনেক কম অনাহারগ্রস্ত মনে হলো কিন্তু এখনোও সে রোগাই আছে। সেলিমের কল্পনার দৃষ্টিতে সময় পিছিয়ে গেলো। সে সেই বালকটিতে পরিণত হলো, যে ফতেহপুর শিক্রির দরবার কক্ষে আকবরের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা গিয়াস বেগের বক্তব্য শ্রবণ করছে।
