তার আশেপাশে ভয়ঙ্কর লড়াই চলছে। উপরের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেলো কিছুটা বামে কর্দমাক্ত পারের উপর দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা একটি লোক স্পষ্টতই শত্রু পক্ষের কোনো সেনাপতি হবে- হাতে থাকা তলোয়ারটি নাড়িয়ে নিজের দলের লোকদেরকে মোগল সেনাদের আক্রমণ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেলিম তার কোমর বন্ধনীতে গুঁজে রাখা একটি খাজকাটা ছুঁড়ে মারার ছোরা টেনে বের করলো, তারপর সতর্কভাবে লক্ষ্যস্থির করে লোকটির দিকে ছুঁড়ে মারলো। যোদ্ধাটি শেষ মুহূর্তে খেয়াল করলো ছোরাটি তার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে, একপাশে সরে সে সেটাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে চাইলো। তবে পুরোপুরি এড়াতে পারলো না, ছোরাটি তার বাম বাহুর উপরের অংশের মাংস কেটে বেরিয়ে গেলো। নির্ভিক চিত্তে, সে সেলিমের দিকে ধেয়ে এলো, তারপর সেলিমকে লক্ষ্য করে তার তলোয়ার চালালো। তলোয়ারটির অগ্রভাগ সেলিমের মুখের সামনে দিয়ে বাতাস কেটে বেরিয়ে গেলো, কারণ সে খানিকটা পিছনে হেলে পড়েছিলো। গতি জড়তার কারণে আক্রমণকারীটি আরেকটু সামনে এগিয়ে এলো, সেই মুহূর্তে সেলিম তার ডান পাটি এগিয়ে দিলো তাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়ার জন্য এবং তাতে কাজ হলো। লোকটি হাত পা ছড়িয়ে মাটির উপর আছড়ে পড়লো। সেলিম তার পারসিক তলোয়ারটির বাট দুহাতে শক্ত করে ধরে লোকটির ঘাড় বরাবর সজোরে কোপ মারলো এবং সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হলো।
মুচড়ে তলোয়ারটি বের করে আনার সময় লোকটির মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সেলিম তার নিজের ছুঁড়ে মারার ছোরাটির শূন্যতা পূরণ করার জন্য লোকটির বাঁকা আকৃতির তলোয়ারটি এক হাতে তুলে নিলো। তারপর, দুহাতে দুটি অস্ত্র নিয়ে সে সেদিকে এগিয়ে গেলো যেখানে তার একজন রাজপুত দেহরক্ষী দুজন আক্রমণকারীকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে এবং তখন উষা লগ্নের হালকা আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। নিজের পারসিক তলোয়ারটিকে বর্শার মতো করে সামনের দিকে বাড়িয়ে ধরে ছুটে গিয়ে সে একজন আক্রমণকারীরে নিতম্বের মাংসল অংশে সেটি ঢুকিয়ে দিলো। আহত লোকটি ঘুরে লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই সেলিমের দিকে তার ছুরি চালালো। এতে সেলিমের জোব্বার ডান বাহুর হাতা ছিঁড়ে বাহুর অগ্রভাগে ছুরিটির আচড় লাগলো। সেলিম পাল্টা তার বাম হাতে থাকা বাকা তলোয়ারটি দিয়ে আঘাত করলো। যদিও বাম হাতে ধরা অনভ্যস্ত অস্ত্রের দুর্বল আঘাত, তবুও অস্ত্রটির ভারসাম্য ভালো এবং ফলাটিও খুব ধারালো। সেটা লোকটির দেহের একপাশ গভীরভাবে কর্তন করলো এবং সে মাটিতে পড়ে গেলো। তার চুড়ান্ত ব্যবস্থা রাজপুতটি করবে, ইতোমধ্যেই সে অন্য শত্ৰুটিকে পরাজিত করেছে।
এ সময় বহু আক্রমণকারী রণে ভঙ্গ দিয়ে ঘুরে পলায়ন করতে শুরু করেছে এবং সেলিম যখন হামাগুড়ি দিয়ে কর্দমাক্ত নদীপারের উপরে উঠলো দেখতে পেলো কিছু শত্রু পক্ষের লোক একশো গজ দূরে সারিবদ্ধ ভাবে বেঁধে রাখা মোগলদের ঘোড়া গুলির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যেই কিছু লোক মরিয়া ভাবে দড়ি কেটে ঘোড়াগুলির পিঠে চড়ে দ্রুত সরে পড়ার চেষ্টা করছে।
সকলে আমাকে অনুসরণ করো! ঘোড়া গুলির কাছ থেকে শত্রুদের সরিয়ে দিতে হবে যাতে তারা পালাতে ব্যর্থ হয়, পারের উপর থেকে পিছলে : নামতে নামতে সেলিম চিৎকার করে আদেশ দিলো। জল কাদা পেরিয়ে সে ঘোড়া গুলির দিকে দৌড়াতে লাগলো।
সেলিমকে এগিয়ে আসতে দেখে, বেগুনি পাগড়ি পরিহিত বেটে গড়নের গাট্টাগোট্টা একটি লোক, যে ইতোমধ্যেই একটি সাদাকালো রঙের ঘোড়ার গলার বাঁধন কাটা শেষ করে মরিয়া হয়ে সেটার সামনের পায়ের বাধনও কাটার চেষ্টা করছিলো সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁধে ঝোলান দ্বিবক্র ধনুকটি হাতে নিয়ে তাতে তীর পড়িয়ে সেলিমকে লক্ষ্য করে ছুড়লো। কয়েক ইঞ্চির জন্য তীরটি সেলিমকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। অস্থিরভাবে কম্পিত আঙ্গুলে সে আরেকটি তীর ধনুকে পড়ালো, সেলিম তখন প্রায় তার কাছে পৌঁছে গেছে, কিন্তু সেলিম তাকে ধরতে পারার আগেই সে তার হাতের ধনুকটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে একটি ঘোড়ার পেটের আড়ালে মাথা নিচু করলো। সেলিম তাকে লক্ষ্য করে তলোয়ার চালালো কিন্তু বিফল হলো।
শরগোল এবং চিৎকারের কারণে আতঙ্কিত হয়ে ঘোড়াটি ছেড়ে কিছুটা পিছিয়ে গেলো। হঠাৎ সেটার সামনের পায়ের অর্ধেক কর্তিত বাঁধন ছিঁড়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়াটি উন্মত্তের মতো সামনের পা দুটি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পিছনের দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালো। সেটার একটি পায়ের লাথি বেগুনি পাগড়ির লোকটির পেটে আঘাত করলো এবং সে সামনে দিকে কুজো হয়ে মাথার পেছনে ঘোড়াটির আরেকটি লাথি খেলো। লোকটির পাগড়ি মাথা থেকে ছিটকে পড়ে গেলো, তার খুলি ফেটে গেলো এবং সে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়লো। সেলিম দ্রুত এক পলক তাকে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলো লোকটির পক্ষে আর হুমকি সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। সাদাকালো ঘোড়াটির ছুঁড়তে থাকা পয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সেলিম সেটার গলার দড়ি ধরে ফেলতে সক্ষম হলো। একহাতে দড়ি টেনে সেটার আন্দোলনরত মাথাটিকে স্থির করার চেষ্টার পাশাপাশি সে অন্য হাতে সেটার ঘাড়ের উপর চাপড় মারতে লাগলো এবং মোলায়েম কণ্ঠে সেটার সঙ্গে কথা বলতে লাগলো। ঘোড়াটি দ্রুত শান্ত হয়ে এলো। এই সব কিছু ঘটলো মাত্র দুই এক মিনিটের মধ্যে এবং সেলিম ঘোড়াটির পিঠে চড়ে বসলো।
