হাত, হাঁটু এবং পায়ের সম্মিলিত নির্দেশনার সাহায্যে সেলিম ঘোড়াটিকে চালিত করতে লাগলো এবং সম্মুখে অগ্রসর হওয়া শত্রুদের ধাওয়া করতে লাগলো যারা তারই মতো জিন বিহীন ঘোড়া ছোটাচ্ছে। প্রতিপক্ষের যোদ্ধারা তিন মাইল দূরবর্তী ছোট ছোট পর্বত সারির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে সেলিমের ডজন খানিক দেহরক্ষী তার সঙ্গে যোগ দিলো। প্রথম দিকে শত্রুপক্ষের ঘোড়সওয়ারদের সঙ্গে সেলিমের দলের দূরত্ব কমে আসার কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না। কিন্তু একটু পড়ে শত্রু ঘোড়সওয়ারদের একজন ক্ষুদ্র একটি জলপ্রবাহ লাফিয়ে পেরুনোর পর তার ঘোড়াটি কিছুটা পিছলে গেলো। যেহেতু তার কোনো লাগাম বা জিন ছিলোনা তাই সে ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে গেলো এবং পিচ্ছল মাটিতে গড়াতে লাগলো। তার পড়ে যাওয়া খেয়াল করে অগ্রবর্তী দলটি যাদের সংখ্যা আট নয় জন হবে, থমকে গেলো এবং তাঁদের দলপতি বলে যাকে মনে হলো সে আদেশ দিলো ঘোড়া গুলির মুখ ঘুরিয়ে ফিরে এসে তাদের সাথীকে উদ্ধার করার জন্য যাতে ধাওয়ারত সেলিম ও তার দলের হাতে সে না পড়ে।
দলপতিটি তলোয়ার হাতে নিয়ে তার বাদামি রঙের ঘোড়াটিকে সেলিমের দিকে ছোটালো। যখন তারা পরস্পরের কাছাকাছি হলো তখন উভয়েই একে অন্যকে লক্ষ্য করে তলোয়ার চালালো। উভয়েই ব্যর্থ হলো এবং মরিয়া হয়ে আবার পরস্পরকে আক্রমণ করার জন্য বড় আকারের বৃত্ত রচনা করে পরস্পরের দিকে ধেয়ে এলো। এবারে যখন তারা কাছাকাছি হলো সেলিম তার ঘোড়ার পিঠ থেকে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাকে সহ মাটিতে আছড়ে পড়তে সক্ষম হলো। মাটির সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তাদের উভয়ের তলোয়ারই হাত থেকে ছুটে গেলো। সেলিমের জিহ্বায় কামড় পড়ায় সে মুখের মধ্যে রক্তের স্বাদ পেলো।
যাইহোক, তারা উভয়ে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালো এবং পরস্পরকে জাপটে ধরে কুস্তি লড়তে লাগলো। তারা যখন আগুপিছু করছে তখন অচেনা শত্রুটি তার কোমর বন্ধনী থেকে একটি ছোট ছোরা বের করতে চেষ্টা করলো। সেই মুহূর্তে সেলিম তার মাথা দিয়ে লোকটির মুখের উপর তীব্র গুঁতো দিলো। লোকটির নাকটি মট করে ভেঙে গেলো এবং সে টলমল পায়ে কিছুটা পিছিয়ে গেলো। লোকটি তখনো বিমূঢ় অবস্থায় রয়েছে, সেলিম তার ছোরা ধরা হাতটি ধরে মোচর দিলো এবং ছোরাটি তার হাত থেকে পড়ে গেলো। তারপর তার রক্তাক্ত মুখে সজোরে দুটি ঘুষি মারলো। এর ফলে তার ঠোঁট ফেটে দুভাগ হয়ে গেলো এবং একটি দাঁত ভেঙে গেলো। এবারে সেলিম তার উরু এবং পেটের সংযোগ স্থলে সবুট লাথি হাকালো। তীব্র লাথি খেয়ে যেই সে ভাজ হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকলো সেলিম তার দুই মুষ্টি একত্রিত করে তার ঘাড়ের উপর আঘাত করলো ফলে সে মাটিতে আছড়ে পড়লো। আশে পাশে নজর বুলিয়ে সেলিম দ্রুত তার পারসিক তলোয়ারটি খুঁজে পেলো এবং সেটি তার যন্ত্রণাকাতর প্রতিপক্ষের গলায় ঠেকিয়ে ধরলো। ইতোমধ্যেই অধিকাংশ শত্রু যোদ্ধা হয় ধরাশায়ী হয়েছে নয়তো আত্মসমর্পণ করেছে। সেলিম তার প্রতিপক্ষের রক্তাক্ত মুখ পর্যবেক্ষণ করে এতোটুকু বুঝতে পারলো যে সে একজন তরুণ। তুমি কে এবং কেনো তুমি আমার শিবির আক্রমণ করেছো?
আমার নাম হাসান, আমি গালদিদ এর রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র, তরুণটি উত্তর দিলো, সেই সঙ্গে থুতুর সঙ্গে মুখের ভেতর থেকে ভাঙা দাঁতের ভগ্নাংশ বের করলো। আমি তোমার শিবির আক্রমণ করেছি কারণ আমি অনুমান করেছিলাম নিশ্চিত ভাবেই তোমার শিবিরে কোনো উচ্চপদস্থ মোগল রয়েছে এবং তাকে জিম্মি করা আমার উদ্দেশ্য ছিলো।
কেনো?
তার বিনিময়ে আমার বাবাকে মুক্ত করার জন্য যে মুরজাদ এর দূর্গে মোগলদের হাতে বন্দী রয়েছে।
তার অপরাধ কি?।
তার অপরাধ তিনি সিকান্দার শাহ্ এর প্রতি অনুগত যিনি হিন্দুস্তানের সিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকারী ছিলেন। মোগলদের হাতে সিকান্দার শাহ্ এর মৃত্যুর পর আমার পিতা মোগল শাসনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে অস্বীকৃতি জানান… নিজের রক্তাক্ত নাক মুখ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছার জন্য হাসান একটু থামলো তারপর আবার বলা শুরু করলো, তিনি পাহাড়ী অঞ্চলে পালিয়ে যান এবং যাযাবর জীবন যাপন শুরু করেন। কয়েক দশক ধরে তিনি এভাবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হোন। কিন্তু ছয় সপ্তাহ আগে তিনি এই অঞ্চলের একজন মোগল সেনাপতির পরিকল্পিত ফাঁদে আটকা পড়ে বন্দী হোন।
তুমি নিজে বুঝতে পারোনি যে তোমার বাবার এই বিরোধীতা অর্থহীন?
আমি বুঝেছি এবং তাকে এ কথা বলেওছি, কিন্তু তিনি তো আমার বাবা। তিনি যতো বড় ভুলই করুন না কেনো আমি আমার জন্মের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা আমার নৈতিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব বোধের কারণেই তাকে উদ্ধার করার জন্য আমি সর্বাত্বক চেষ্টা চালিয়েছি।
ছেলেটি সত্যি কথাই বলছে জাঁহাপনা, জাহেদ বাট বললো, সে একটু আগে সেলিমের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলো। এই অঞ্চলে আমার অনেক আত্মীয় স্বজন রয়েছে এবং ছেলেটির পরিবার এই এলাকায় সুপরিচিত।
জাহাপনা?
হাসানের চেহারায় বিস্ময় ফুটে উঠলো। আপনি কে?
তোমার ভীষণ অবাক লাগছে তাই না? আমি সেলিম, সম্রাট আকবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র।
কথাগুলি শোনা মাত্র হাসানের মধ্যে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হলো, হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে সে দশ ফুট দূরে পড়ে থাকা তার ছোরাটি হস্তগত করতে চাইলো। কিন্তু অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করার আগেই, সেলিম তার ধারালো পারসিক তলোয়ারটির অগ্রভাগ হাসানের পাঁজরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হাসান, একজন অনুগত সন্তান, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। অথচ পিতার প্রতি অবাধ্যতা প্রদর্শনের জন্য সে নিজে নির্বাসনের পথে যাত্রা করেছে, সেলিম মনে মনে ভাবলো।
