মশাল গুলি নিভিয়ে ফেলো, সেলিম চিৎকার করে বললো। ওগুলো জ্বেলে রাখলে তোমরা সহজ নিশানায় পরিণত হবে এবং নিজেদের দৃষ্টিকে অন্ধকারের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলার চেষ্টা করো।
কিন্তু নির্দেশটি পালিত হওয়ার আগেই তৃতীয় আরেকজন রক্ষী পিঠে তীর বিদ্ধ হলো এবং সে হুমড়ি খেয়ে কাদার উপর পড়ে গেলো। মশালগুলি কাদাপানিতে গুঁজে দ্রুত নিভিয়ে ফেলা হলো।
জাহেদ বাট এবং সুলায়মান বেগ কোথায়?
আমি এখানে জাহাপনা, জাহেদ বাট চেঁচিয়ে উত্তর দিলো, সে সেলিমের রক্ষীদের অধিনায়ক।
আমি এখানে আছি, সুলায়মান বেগের আওয়াজ শোনা গেলো, পাশের একটি তাবু থেকে তলোয়ার ঝোলানো কোমর বন্ধনী বাঁধতে বাঁধতে মাথা ঝুঁকিয়ে সে বেরিয়ে এলো। ওদিকে সাধারণ সৈন্যরা এ সময় কাদা পানির মধ্যে এদিক ওদিক ছোটা ছুটি করছে এবং সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাচ্ছে, তবে সকলের হাতে কোনো না কোনো অস্ত্র রয়েছে।
কারা আমাদের আক্রমণ করলো? তীরগুলি কোনো দিক থেকে আসছে? সেলিম জানতে চাইলো।
তীরগুলি পূর্ব দিকের নদীতীর থেকে আসছে, কিন্তু শত্রুকে চেনার কোন উপায় নেই এবং তাদের শক্তি সম্পর্কে ধারণা করাও অসম্ভব। আমি ইতোমধ্যেই সেদিকে কিছু রক্ষীকে তদন্ত করতে পাঠিয়েছি যারা আপনার তাবুর পাহারায় ছিলো… জাহেদ বাট বললো, কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পর পর দুই ঝাঁক তীর শিবিরের কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করে ছুটে এলো ঘোর অন্ধকার এবং বৃষ্টির মধ্য দিয়ে। জাহেদ বাটের বক্তব্যের বিরোধীতা করতেই যেনো কিছু তীর পশ্চিম দিক থেকে এবং কিছু উত্তর দিক থেকে ধেয়ে এলো। আরেকজন সৈন্য পড়ে গেলো, তীরটি তার বাম উরুর পিছনে বিঁধেছে। এটা সম্ভবত ঝড়ে বক মড়ার মতো ঘটনা ঘটলো। চারদিকের ঘন অন্ধকার, বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়ার মধ্যে সঠিক লক্ষ্য ভেদ করা অসম্ভব।
সেলিমের মনে বহু প্রশ্ন এক সঙ্গে জেগে উঠলো। অজানা অদেখা শত্রুরা তার শিবির ঘিরে ফেলতে চেষ্টা করছে। কেনো? তারা যদি সাধারণ ডাকাত হতো তাহলে তারা নিশ্চয়ই প্রথমে মালামাল বহনকারী গাড়ি গুলিতে হামলা চালাত এবং মালামাল ও বিশ্রামরত ছোঁড়া গুলি নিয়ে সরে পড়ার চেষ্টা করতো। এই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কি সে নিজে? সেলিমের সমগ্র দেহ প্রকম্পিত হলো। এমন কিছু কি ঘটা অসম্ভব যে, আবুল ফজল তার বাবার সম্মতি নিয়ে বা তার অজান্তে এক দল আততায়ী পাঠিয়েছে তার দুর্ঘটনাসুলভ মৃত্যুর পরোয়ানা দিয়ে? এ ধরনের ঘটনা আকবরের শাসনের প্রথম দিকে বৈরাম খানের ভাগ্যে তো ঘটেছিলো।
বর্তমান পরিস্থিতি যাই হোক না কেনো এখন তার লোকেরা তার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছে এবং তাদেরকে নিরাশ করা চলবে না। দ্রুত চিন্তা করে সেলিম আদেশ দিলো, আমরা সকলে কাছাকাছি থেকে একটি বেষ্টনী তৈরি করে শত্রুদের দিকে এগিয়ে যাবো এবং অগ্রসর হওয়ার সময়ে কিছুটা দূরে আমাদের যেসব রক্ষী পাহারায় ছিলো তাদের কেউ যদি এখনোও বেঁচে থাকে তাহলে তাদের সঙ্গেও দেখা হবে। আমাদের পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে চলবে না, তাই সকলের দায়িত্ব থাকবে তার ডান পাশে অবস্থিত সঙ্গীর দিকে খেয়াল রাখা। আমি নিজে মাঝা মাঝি জায়গায় থাকবো যেখান থেকে অগ্রসর হলে মালপত্র এবং বিশ্রামরত ছোঁড়াগুলির দেখা পাওয়া যাবে। সুলায়মান তুমি পূর্ব অংশের নেতৃত্ব দিবে এবং আপনি জাহেদ বাট, পশ্চিম দিকের। সকলে যথাসম্ভব নিঃশব্দে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবে।
দ্রুত সেলিমের লোকজন পাশাপাশি অবস্থান নিয়ে মোটামুটি সারিবদ্ধভাবে একটি বেষ্টনী তৈরি করলো এবং সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলো, তাঁদের সকলের হাতে উদ্যত অস্ত্র। সারির দুই প্রান্ত কিছুটা দ্রুত নদীতীরের দিকে এগিয়ে গেলো, কিন্তু মধ্য অংশটি, যেখানটা সেলিমের নেতৃত্বে অগ্রসর হচ্ছিলো তাদের গতি অত্যন্ত ধীর এবং তারা হামাগুড়ি দিয়ে পিছলে কিছুটা উঁচু ঢাল বিশিষ্ট কর্দমাক্ত নদীপারে উপস্থিত হলো। এ সময় সেলিমের পায়ের সঙ্গে নরম কিছুর সংঘর্ষ হলো- এটা তার একজন রক্ষীর দেহ, সেটা হাত পা ছড়িয়ে উপুর হয়ে পড়ে আছে। সেলিম হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো। তার এই পতনই তার জীবন রক্ষা করলো, কারণ যখন সে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো এক ঝাঁক তীর তার মাথার দুই ফুট উপর দিয়ে ছুটে গেলো এবং যে দুজন লোক তার দুপাশে ছিলো তারা তীর বিদ্ধ হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো।
সেলিম চিৎকার করে উঠলো, সকলে নদীপারের আড়ালে আশ্রয় নাও। কিন্তু পারের নিচ থেকে ভেসে আসা রণহুঙ্কারের উচ্চ শব্দে তার কণ্ঠ ঢাকা পড়ে গেলো। অতর্কিত ভাবে আত্মগোপনে থাকা হামলাকারীরা এখন একত্রে তার সৈন্যদের বেষ্টনী বরাবর এগিয়ে আসছে। একজন দৈত্যাকৃতি শত্রু হাতে উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে সেলিমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। সেলিম তার তলোয়ারের আঘাত প্রতিহত করলো এবং তার তলোয়ার ধরা হাতটি আকড়ে ধরে টান দিলো। ফলে তারা দুজনে নদীর ঢালু পার বেয়ে এক সঙ্গে গড়িয়ে পড়লো। গড়াতে গড়াতে দুজনে সমতল জায়গায় গিয়ে স্থির হলো। গড়ানোর সময় দৈত্যটির তলোয়ারটি খোয়া গেছে, এখন সে তার বিশাল আকৃতির থাবার মধ্যে সেলিমের গলাটি আকড়ে ধরার চেষ্টা করলো। ওদিকে সেলিম তার পারসিক তলোয়ারটি আবার সুবিধা জনক মুষ্টিতে ধরতে পেরেছে। তবে ততোক্ষণে দৈত্যটির বিশাল আঙ্গুল গুলি তার কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে। কিন্তু সেলিমের তলোয়ার তার কোমর ভেদ করে গভীরে ঢুকে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে সেলিম অনুভব করলো উষ্ণ রক্ত শত্রুটির ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে আসছে এবং তার কণ্ঠনালী চেপে ধরা আঙ্গুল গুলি শিথিল হয়ে পড়েছে। দ্রুত দশাসই ওজনের শরীরটিকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে সেলিম উঠে দাঁড়ালো এবং গলা ডলতে ডলতে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো।
