সেলিম অকস্মাৎ ঝাঁকি খেয়ে কম্বল খামচে ধরে বিছানায় উঠে বসলো। আনারকলির করুণ পরিণতির জন্য সৃষ্ট অপরাধ বোধ তার বুকের উপর ভারী পাথরের মতো চেপে বসে আছে। দুঃসহ বেদনা যুক্ত বহু নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে তার মাঝে এই উপলব্ধি সৃষ্টি হয়েছে যে মেয়েটি তার জন্য একটি উন্মাদনা সৃষ্টিকারী খেলনা ছিলো এবং নিজ অংঙ্কারকে তৃপ্ত করতে সে তাকে আকবরের কাছ থেকে চুরি করার চেষ্টা করেছিলো। সে যদি সত্যিই আনারকলিকে ভালোবাসতো তাহলে নিজের কর্মকাণ্ডকে নিজের কাছে তার আরো কম ঘৃণ্য বলে মনে হতো তার। সে এমন লোভী এবং অসতর্কভাবে আনারকলিকে হস্তগত করার চেষ্টা করেছে যেনো সে কোনো গাছের পাকা আম বা থালায় সাজানো লোভনীয় মিষ্টান্ন ভক্ষণ করতে চেয়েছে। তবে এই দীর্ঘ অস্থির দিন গুলির মাঝেও কিছুটা স্বস্তির বাতাস তার মনে প্রবাহিত হয়েছে। লাহোর থেকে যাত্রা করার তিন দিন পর দাদী হামিদার কাছ থেকে একটি বার্তা তার কাছে এসেছে যেটা থেকে সে জানতে পেরেছে আনারকলিকে দীর্ঘ মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি। তার বুদ্ধিমতি দাদীমা লিখেছেন সেলিমের আকুল আবেদন অনুযায়ী কোনো উপায়ে একটি বিষ ভরা ছোট শিশি তিনি গোপনে আনারকলির কাছে পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন। সেলিম আশা করছে খবরটি সত্যি হোক এবং এটা যাতে তার দাদীর নিছক সান্ত্বনা বাক্য না হয়।
ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি সম্পর্কিত অপরাধবোধ এবং এর পরিণতি বিষয়ক চিন্তা তার মনকে আরেকবার আন্দোলিত করলো। ঘটনার অমোঘ পরিণতিতে সে এখন তার পরিবার পরিজন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু রাজধানী থেকে শত শত মাইল দূরে নির্বাসিত হয়েছে। তাকে যেতে হবে খাইবার গিরিপথ পেরিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের শেষ প্রান্তে। তার লালসাপূর্ণ আচরণের সাহায্যে আকবরকে বিক্ষুব্ধ করে সে কেবল আনারকলির মৃত্যুই ঘটায়নি। বরং শেখ সেলিম চিশতি তার সম্পর্কে যে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে একদিন সে সম্রাট হবে সেই সম্ভাবনাকেও পদদলিত করেছে। তার সকল আশা আকাঙ্ক্ষা নিশ্চিত ভাবেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন তার সৎ ভাইরা তার অপকর্মের অজুহাতকে কাজে লাগিয়ে সিংহাসনের প্রতি নিজেদের দাবি আরো জোরালো ভাবে উত্থাপন করতে পারবে। এবং এখন হঠাৎ যদি আকবরের মৃত্যু হয় তাহলে কি হবে? তার কাছে সেই মৃত্যু সংবাদ পৌঁছানোর আগেই আবুল ফজল এবং তার ঘনিষ্ট অনুগামীরা পরবর্তী উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে ফেলবে।
গর্জনরত দমকা হাওয়া যখন তার তাবুর ভারী তিরপলকে বারংবার আঘাত করে দাবিয়ে দিচ্ছে তখন সেলিম নিজের হতাশা ব্যঞ্জক চিন্তা গুলি থৈকে মনকে অন্য দিকে ফিরাতে চাইলো। সে তার সম্মুখের ভ্রমণ কৌশল নিয়ে ভাবতে শুরু করলো। গতকাল সে এবং তার সঙ্গে থাকা সাড়ে তিনশো সৈন্যের দলটি ইন্দুজ নদীর প্রবল ঘূর্ণিযুক্ত ঠাণ্ডা জল পেরিয়েছে। একটি অল্প বয়সী হাতি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যখন সেটিকে বহনকারী ভেলাটি মাঝ নদীতে আরেকটি ভেলার সঙ্গে ধাক্কা খায়। হাতিটি নদীতে গড়িয়ে পড়ে এবং প্রবল স্রোতের তোড়ে ভেসে যায়। সেটার পিঠে রান্নার মূল্যবান তৈজসপত্রের বোঝা ছিলো। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাকি দলটি নিরাপদে নদীটির উত্তর পারে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। শেষ ভেলাটি পার হয়ে মাল খালাস করার সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিলো। ইতোমধ্যেই বাতাসের তাড়নায় বৃষ্টিসমৃদ্ধ কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যাচ্ছিলো। কর্দমাক্ত নদীতীরের ছোট ছোট পাহাড় ঘেরা বেলাভূমিতে সেলিম তখন হুকুম দেয় দ্রুত শিবির প্রস্তুত করার জন্য। নদী অতিক্রম করতে যথেষ্ট দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে এবং সৈন্যরা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই জন্য আজ সে তাদের একটু বেশি সময় ঘুমানোর সুযোগ দেবে। তারপর নির্বাসনের গন্ত ব্যের দিকে আবার অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করবে। তাদের সম্মুখে রয়েছে পেশোয়ার এবং তারপর খাইবার গিরিসংকটের প্রবেশ পথ। এই ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে সেলিম ধারণা পেয়েছে তার দাদীমার বলা গল্প থেকে এবং সেইসব সেনাপতিদের কাছ থেকে যারা এই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছে।
সেলিমের চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো, কিন্তু যেই মুহূর্তে সে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়তে নিলো একটি চিৎকারের শব্দ শুনে সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠলো। সেটা কি কোনো বুনো প্রাণী যে অন্য কোনো শিকারী জানোয়ারের ধারালো দাঁতের কবলে আটকা পড়ে মরণ চিৎকার দিলো, নাকি কোনো মানুষ? কয়েক মুহূর্ত পর আরেকটি চিৎকার এবং তাকে অনুসরণ করে উচ্চ কণ্ঠের আদেশ অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হও সকল সন্দেহ দূর করে দিলো। তার শিবির আক্রান্ত হয়েছে। সে বিদ্যুৎ বেগে বিছানার পাশে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কোনো রকমে সে তার বাইরের পোশাকের নুন্যতম অংশগুলি পড়ে নিলো এবং বিদায় উপহার হিসেবে হামিদার পক্ষ থেকে পাওয়া দুদিকে ছোট ছোট সোনার জিহ্বার নকশা বিশিষ্ট পারসিক তলোয়ারটি হাতে নিলো। তাবু থেকে বেরিয়ে সে দেখতে পেলো তার কিছু দেহরক্ষী অন্ধকারের দিকে উত্তেজিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অন্যরা এক জায়গায় ভিড় করে মাটিতে পড়ে থাকা তাঁদের দুজন সাথীর উপর ঝুঁকে আছে, তাদের হাতে ধরা মশালের আগুন বৃষ্টি এবং দমকা বাতাসে কেঁপে কেঁপে জ্বলছে। আহত হয়ে পড়ে থাকা একজন তার পেটে গেঁথে থাকা তীরটি চেপে ধরে ব্যথায় আর্তচিৎকার করছে। অন্যজন নিশ্চল হয়ে পড়ে আছে।
