দয়া করুন জাঁহাপনা…
আমার কান তোমার আর্জির প্রতি বধির। তোমাকে কীভাবে শাস্তি দেয়া হবে তা আমি নির্ধারণ করে ফেলেছি। তোমাকে প্রাসাদের কয়েদখানার ক্ষুদ্র একটি প্রকোষ্ঠে ঢুকিয়ে ইটের দেয়াল তুলে সেটি রুদ্ধ করে দেয়া হবে। যখন মিনিট গড়িয়ে ঘন্টা এবং ঘন্টা গড়িয়ে দিন অতিক্রন্ত হয়ে তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে তখন তুমি তোমার অপরাধ সম্পর্কে গভীর ভাবে ভাবার সুযোগ পাবে।
না! দোষ আমি করেছি, ওর কোনো অপরাধ নেই। আমি ওকে কামনা করেছি এবং খাজানসারাকে ঘুষ প্রদান করেছি ওকে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য, সেলিম চিৎকার করে বলে উঠলো।
আমি সব কিছু জানি, আকবর বললেন, অবশেষে এখন তিনি সেলিমের দিকে তাকালেন। তোমার কি মনে হয়, তোমার ঘৃণ্য অপকর্ম সম্পর্কে আমি জানলাম কীভাবে? খাজানসারা নিজেই আজ সন্ধ্যায় আবুল ফজলের কাছে গিয়ে সব কিছু স্বীকার করেছে। আমি তাকে দয়া প্রদর্শন করেছি….অত্যন্ত দ্রুত তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এই মেয়েটি রাজকীয় হেরেমের সকল নিয়মনীতি ভঙ্গ করেছে যাকে রক্ষা করার জন্য তুমি সাফাই গাইছো। এটা ওর সৌভাগ্য যে আমি জ্যান্ত ওর ছাল ছাড়িয়ে সেই চামড়া প্রসাদ দ্বারে ঝুলিয়ে রাখার আদেশ দেইনি। আকবর রক্ষীদের দলপতির দিকে তাকালেন। ওকে নিয়ে যাও।
দুই জন রক্ষী দুদিক থেকে আনারকলিকে ধরলো, আর্তচিৎকারের সঙ্গে সে মেঝের শতরঞ্জি আকড়ে ধরে থাকতে চাইলো, আশা করছে কোনো অলৌকিক উপায়ে সেখানে স্থির থেকে নিজের ভয়াবহ পরিণতি বিলম্বিত করতে পারবে। সেলিম সেদিক থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো, যে অপার সৌন্দর্য তাকে সীমাহীন ভাবে প্রলুব্ধ করেছিলো তার এই করুণ দশা সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তার কামনার কারণেই এই বিরল বৈশিষ্টের অধিকারী মেয়েটির অকালমৃত্যু ঘটতে যাচ্ছে। তাকে রক্ষা করার জন্য তার কিছুই করার বা বলার সামর্থ নেই, এই বোধ সেলিমকে আচ্ছন্ন করলো। কেবল আনারকলির চিৎকার এবং আহাজারি যখন অপসৃত হলো এবং দরবারের দরজাটি বন্ধ করা হলো তখনই সে আবার তার পিতার দিকে তাকালো। তাকে কতোই না নিষ্ঠুর দেখাচ্ছে, কতো ব্যাপক ক্ষমতা নিয়ে ঐ চাকচিক্যপূর্ণ সিংহাসনে বসে আছেন। তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের ভাগ্যে কি নির্ধারণ করে রেখেছেন? তিনি কি তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেবেন? কয়েক মুহূর্তের জন্য সেলিম তার গলায় শীতল ইস্পাতের ফলার স্পর্শ কল্পনা করতে পারলো। ভুল ত্রুটি সত্ত্বেও নিজ বাবাকে তার সর্বদা সম্মানিত এবং ন্যায় বিচারক বলে মনে হতো। কিন্তু আনারকলির প্রতি তাঁর প্রতিশোধমূলক আক্রোশ সেই অনুভূতিকে নড়িয়ে দিয়েছে।
সেলিম, তুমি নিজেই স্বীকার করেছে এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের পেছনে তোমার ভূমিকাই প্রধান। একটু থেমে আকবর আবার শুরু করলেন, এমন পুত্রের প্রতি আমি কীভাবে পুনরায় বিশ্বাস স্থাপন করবো যে এমন কুৎসিৎ ভাবে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে? তোমার জীবন আমার কাছে এবং মোগল রাজবংশের কাছে মূল্যহীন।
সেলিম অনুভব করলো তার গলার মাংসপেশি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যদি তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয় তাহলে সে কোনো ধরনের ভীতি প্রকাশ করতে চায় না, তাই সে বাবার চোখে চোখ রেখে তাকালো।
তুমি এখনোও তরুণ এবং তুমি মূল্যায়ন না করলেও আমি আমাদের মধ্যকার রক্তের বন্ধনকে কিছুটা মূল্যায়ন করি। তাছাড়া আমার নিজের মা তোমার জীবনের জন্য আমার কাছে আরজি পেশ করেছেন, তাই আমি তোমাকে ক্ষমা প্রদর্শন করবো। আগামীকাল সকালে রাজকীয় পরিদর্শন কাজ সম্পাদন করার জন্য তুমি কাবুলের পথে রওনা হবে এবং সেখানেই অবস্থান করবে যতোদিন পর্যন্ত না আমি তোমাকে পুনরায় ডেকে পাঠাই। তোমার স্ত্রীগণ এবং তোমার সন্তানেরা এখানেই অবস্থান করবে। এখন আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও তা না হলে আমার সিদ্ধান্ত পাল্টে যেতে পারে।
আপনি আমার প্রতি ঈর্ষা পরায়ণ কারণ আমি তরুণ এবং আপনি ক্রমশ বার্ধক্যে উপনীত হচ্ছেন। আপনি মনে মনে জানেন যে আপনি অমর নন এবং এই জন্য ভীত যে আপনার রক্ষিতার মতো একদিন আমি আপনার সিংহাসনও অধিকার করবো, কথা গুলি সেলিম চিৎকার করে বলতে চাইলো, কিন্তু তাতে কি লাভ? ঘুরে দাঁড়িয়ে শতরঞ্জির উপর দিয়ে হেঁটে সে দরবার কক্ষ ত্যাগ করার জন্য অগ্রসর হলো, যেখানে এখনো আনারকলিকে ছেচড়ে নিয়ে যাওয়ার দাগ দেখা যাচ্ছে। এখানেই কি তার সকল উচ্চাকাঙ্ক্ষা সমাহিত হলো?
.
২৪. ইন্দুজ নদী
তুমুল বর্ষণ হচ্ছে। সেলিম তার বিশাল আকারের তাবুর ভেতরের বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। তার গায়ে সূক্ষ্ম সুতির চাদর এবং আরামদায়ক কাশ্মীরি কম্বল। বৃষ্টির ছাট তাবুর উপর আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে লাহোর ত্যাগ করার পর থেকেই রাতে তার নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম হচ্ছে না। বার বার আনারকলির মোহনীয় মুখটি তার কল্পনার দৃশ্যপটে ফিরে আসছে যা একাধারে উষ্ণ, জৈবনিক এবং সতেজতা সম্পন্ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এতোদিনে সে নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। সেলিম দেখতে পাচ্ছে আনারকলির মুখটি ক্রমশ আঁটো হচ্ছে, ত্বক কুঁচকে গিয়ে মাথার খুলি উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে এবং একসময় গুড়ো গুড়ো হয়ে ধূলায় মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নীল চোখ দুটি অক্ষত থেকে তাকে ভর্ৎসনা করছে এক মুহূর্তের জন্য, তারপর সেগুলোও আধারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
