সেলিম একটি স্তম্ভের গায়ে হেলান দিয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো এবং রবি নদীর কলধ্বনি শ্রবণ করতে লাগলো। কোনো ছোট আকারের প্রাণী সম্ভবত ইঁদুর- তার সবুট পায়ের উপর দিয়ে দৌড়ে পালালো এবং সে ঘাড়ের উন্মুক্ত অংশে হুল ফুটানো একটি মশাকে চাপড় মারলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো চাঁদ উঠেছে। প্রায় পূর্ণ চাঁদ, সতেজ কমলা রঙের দীপ্তি ছড়াচ্ছে। সময় বয়ে যাচ্ছিল। সেলিম কান খাড়া করলো, এই ভেবে যে হয়তো নদীর পার থেকে কোমল পদক্ষেপের আওয়াজ শুনতে পাবে। কিন্তু তেমন কিছু শোনা গেলো না। কিছু ঘটেছে কি? খাজানসারা কি ভীত হয়ে তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে? আরো কিছুক্ষণ সে অপেক্ষা করবে, সেলিম ভাবলো। সেলিম একই জায়গায় বসে রইলো, সে রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করছে এবং সেই মুহূর্তটিকে কল্পনায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। যখন আবার সে আনারকলির সমৃদ্ধ গিরিখাদের মাঝে নিজের মুখটি সমাহিত করবে। খাজানসারা যদি আজ রাতে আনারকলিকে তার কাছে নিয়ে আসার ব্যাপারে মতো পরিবর্তন করে থাকে সেলিম জানে সে আবার তাকে রাজি করাতে পারবে…
হঠাৎ খানিকটা দূরে ঘন ঝোঁপের মাঝে টিমটিমে আলো দেখা গেলো হয়তো মশাল-সেলিমের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। খাজানসারা অসতর্ক আচরণ করছে- পথ দেখে অগ্রসর হওয়ার মতো যথেষ্ট চাঁদের আলো চারদিক পাবিত করে রেখেছে। সম্ভবত আগে কখনো এদিকে আসেনি বলে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে এমনটা করছে। সেলিম উঠে দাঁড়ালো এবং আরো ভালো করে আলোর দিকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলো। তারপর সিদ্ধান্ত নিল তাঁদের কাছে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু যেই মাত্র সে স্তম্ভের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঝোঁপ ঝাড় পেরিয়ে অগ্রসর হতে নিলো, দেখলো একাধিক মশালের আলো তার দিকে ধেয়ে আসছে। একই সঙ্গে সে একাধিক পুরুষ কণ্ঠের আওয়াজ শুনলো এবং নল-খাগড়ার জঙ্গল পেরিয়ে কিছু রক্ষী তার দিকে এগিয়ে এলো।
কি হচ্ছে এসব? তার সঙ্গে কি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে…? সেলিম তার কোমরে গোজা ছোরাটির দিকে হাত বাড়ালো এবং ঘুরে অন্ধকারে আত্মগোপন করার প্রস্তুতি নিলো, কিন্তু দেখলো একটি পরিচিত অবয়ব তার পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
জাহাপনা, আপনার পিতা আপনাকে এই মুহূর্তে প্রাসাদে ফিরতে বলেছেন। আবুল ফজলের ছোট আকারের চোখ দুটি তার পাশে এই মাত্র উপস্থিত হওয়া একজন রক্ষীর মশালের আলোতে ফোয়ারার মতো উজ্জ্বল দেখালো।
বজ্রাহত সেলিম নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এখন আর আবুল ফজল তার অনুভূতি গোপন করার চেষ্টা করছে না এবং সেলিম আগে কখনোও তার মাঝে এমন স্পষ্ট বিজয়োল্লাস দেখতে পায়নি। সে তার প্রতি তার ঘৃণা প্রকাশের ভাষা খুঁজতে লাগলো, কিন্তু আবুল ফজলই আবার কথা বলে উঠলো।
জাহাপনা, আমাকে বলা সেই কথা গুলি কি আপনার মনে আছে? আপনি বলেছিলেন আপনি জানেন আমার আসল রূপ কি, এবং যে দিন আপনার বাবা তা বুঝতে পারবেন আপনি সেই দিনের অপেক্ষাতেই থাকবেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি কথা গুলিকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলো, তাই না? আপনার পিতা বুঝতে পেরেছেন আপনার আসল রূপ কি…
*
বেশ্যাটাকে এখানে হাজির করো। আকবর তার সিংহাসনে উত্তেজিত ভঙ্গিমায় বসে আছেন, তার পরনের গাঢ় লাল বর্ণের আলখাল্লাটিকে কালচে দেখাচ্ছে। তিনি যখন উপস্থিত সভাসদদের দিকে দৃষ্টি হানলেন মনে হলো তিনি মুখোশ পড়ে আছেন। সিংহাসনবেদীর নিচে খালি মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা সেলিমের উপস্থিতি তিনি আমলে নিচ্ছেন না। তার পরনে এখনো নিশি অভিসারের পোশাকপরিচ্ছদ।
বাবা, আমি কিছু বলতে চাই…
কোনো সাহসে তুমি আমাকে বাবা বলে সম্বোধন করছো যখন তোমার আচরণের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্কের প্রতি ঘৃণা ব্যতীত আর কিছুই প্রকাশ পায়নি। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো, তা না হলে আমি তোমাকে নিশ্চুপ করানোর ব্যবস্থা করবো। আকবর পুঞ্জিভূত প্রচণ্ড ক্রোধে ফেটে পড়লেন। কয়েক মিনিট পর দরবারের পার্শ্ববর্তী একটি দরজা দিয়ে আনারকলিকে নিয়ে আসা হলো, পেছন থেকে দুজন স্কুল গড়নের মহিলা হেরেম রক্ষী তার পিঠে ধাক্কা দিচ্ছিলো। তার দুহাত একত্রে বাধা এবং সোনালী চুলগুলি উস্কোখুস্কো হয়ে কাঁধের উপর ছড়িয়ে আছে। তার সাদা মুখের এখানে সেখানে চোখের জলের সঙ্গে কাজল লেপ্টে গিয়ে কালো দাগ সৃষ্টি করেছে। সেলিম দেখতে পাচ্ছিলো আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তায় মেয়েটি প্রচণ্ড ভাবে থরথর করে কাঁপছে। ধীরে অগ্রসর হয়ে সে আকবরের সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে আছড়ে পড়লো।
তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে প্রিয় রক্ষিতা। তুমি যতোটুকু আশা করেছো তার তুলনায় অনেক বেশি ঐশ্বর্য আমি তোমাকে প্রদান করেছি। কিন্তু তারপরেও তুমি তোমার সম্রাটের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং এই বদমাশটি যে নিজেকে আমার সন্তান বলে দাবি করছে তার লালসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে। এর শাস্তি হতে পারে একটাই-মৃত্যুদণ্ড।
আনারকলির চেহারাটি প্রচণ্ড ভীতি এবং আতঙ্কে দুমড়ে মুচড়ে গেলো। একটি বিক্ষুব্ধ থরকম্প তার সমগ্র দেহে আক্ষেপ সৃষ্টি করলো যখন সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। একজন মহিলা রক্ষী তাকে ধাক্কা মেরে বসিয়ে দিয়ে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে নির্দয় ভাবে তার নিতম্বে খোঁচা মারলো।
