আনারকলি তাকে এতো আকৃষ্ট করে কেনো? এই প্রশ্নের উত্তরটি উদঘাটন করা সেলিমের জন্য বেশ কঠিন, কিন্তু সে অনুভব করে কারণটি আনারকলির সৌন্দর্যের চেও বেশি কিছু, সে তার পিতার রক্ষিতা এই বাস্তবতার চেয়েও গভীর, তবে এ দুটি উপাদান সুস্বাদু মসলার মতো তার কামনাকে উপাদেয় করে তোলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক ধরনের সজীবতা, তেজস্বিতা এবং আত্মনির্ভরশীলতা মেয়েটির মধ্যে উপস্থিত, হয়তো জীবনে নানা বিরূপ অভিজ্ঞতা এবং ঝড়ঝাপটা সহ্য করার ফলেই এই বৈশিষ্টগুলি তার মাঝে সৃষ্টি হয়েছে। আনারকলি তার ঘটনাবহুল জীবনের গল্প সেলিমকে শুনিয়েছে। সে খুব অল্প বয়সে তার সওদাগর পিতার সঙ্গে উত্তর আফ্রিকার উপকূল থেকে জাহাজে করে সমুদ্রযাত্রা করে। জলদস্যুরা তাদের জাহাজটি আক্রমণ করে এবং তার বাবাকে গলা কেটে হত্যা করে। তারপর তারা তাকে বন্দী করে নিয়ে যায় এবং ইস্তাম্বুলের ক্রীতদাস কেনাবেচার বাজারে একজন তুর্কি পতিতালয় মালিকের কাছে বিক্রি করে দেয়। পতিতালয় মালিকটি তাকে পুরুষের মনোরঞ্জন শিল্পে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। তবে সে তার কুমারীত্ব রক্ষার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে এবং একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেয় যখন তার বয়স পনেরো। এই লোকটি তাকে আবার তুরস্কের সুলতানের কাছে উপহার স্বরূপ প্রদান করে। সেটা বর্তমান সময় থেকে চার বছর আগের ঘটনা।
যখন সেলিম তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো এখনোও সে তার নিজের দেশের কথা ভাবে কি না, আনারকলি কাঁধ ঝাঁকিয়েছিলো। আমার মনে হয় অনেক কাল পেরিয়ে গেছে। আমার অসহায় বাবার ভাগ্যে কি ঘটেছিলো তা মনে পড়লে আমি মাঝে মাঝে কাদি। কিন্তু আমার বাবা যদি আমাকে নিয়ে ভেনিসে পৌঁছাতে পারতেন তাহলে আমার ভাগ্যে কি ঘটতো কে জানে। হয়তো বাবার পছন্দের কোনো ধনী ব্যক্তির সঙ্গে আমার ভালোবাসাহীন বিয়ে হতো। বাবা পূর্বেই এমন পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। কিন্তু এখানেতো আমি বিলাসবহুল জীবন যাপন করছি। বর্তমানে আমার কাছে এমন সব রত্ন রয়েছে যা দেখে ভেনিসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিও বিস্মিত হবে। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখটি ছায়া আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তারপর সে সেলিমের দিকে তাকিয়ে হেসেছিলো। এবং এই মুহূর্তে আমি স্ট্যালিয়নের মতো সবল এক তরুণ যুবরাজের শয্যাসঙ্গিনী-আমার মন খারাপ হবে কেনো?
এমন মসৃণ প্রশংসা বাক্য খুব সহজেই আনারকলির মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, সেলিমের মনে হলো, নিদ্রা এখনো তার চোখে ধরা দিচ্ছে না। মিলনের সময় সে সেলিমের পৌরুষ এবং তাকে তার প্রদান করা সুখানুভূতি নিয়ে চাটুকারিতা করে, বলে সেই তার শ্রেষ্ঠ প্রেমিক। তবে সেলিম জানে তার এসব বক্তব্য মেকী হতে বাধ্য এবং তার প্রতি আনারকলির সত্যিকার কোনো আকর্ষণ নেই, কিন্তু এই বাস্তবতা আনারকলির প্রতি তার আকর্ষণে একটুও ঘাটতি সৃষ্টি করে না। মেয়েটি তার জীবনে এমন প্রশিক্ষণই পেয়েছে এবং এর সাহায্যেই সে পৃথিবীতে টিকে আছে। এই মুহূর্তে সে হয়তো আকবরের কানে ফিসফিস করে একই বুলি আওড়াচ্ছে।
সেলিম উঠে বসলো। সে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সে আবার আনারকলির সঙ্গে মিলিত হবে। কোনো উপায় নিশ্চয়ই রয়েছে এবং সেটা তাকে খুঁজে বের করতে হবে।
রবি নদীর তীরে একটি ঝোঁপঝাড়ে আচ্ছাদিত বালুপাথরের ভগ্ন্যুপ রয়েছে, যেখানে এক সময় খেলাধূলা হতো। জায়গাটির দূরত্ব প্রাসাদ থেকে মাত্র আধ মাইল। পাখি শিকার করতে গিয়ে আমি মাঝে মাঝে ওখানে বিশ্রাম করি। এই দেখো… সেলিম এক টুকরো কাগজের উপর কাঠকয়লা দিয়ে একটি মানচিত্র অংকন করলো। আজ রাতে আনারকলিকে ওখানে নিয়ে আসবে যখন আমার বাবা ওলামা পরিষদের সঙ্গে সভায় ব্যস্ত থাকবেন। নিশ্চয়ই তিনি তার মাওলানাদের সম্মুখে নাচার জন্য তাকে ডাকবেন না।
আপনি সাক্ষাৎটি অবশ্যই সংক্ষিপ্ত করবেন। সম্রাটের উপস্থিতিতে আনারকলি হেরেম থেকে দীর্ঘক্ষণ অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। এবং, জাঁহাপনা…এটাই শেষ বার। আমার পক্ষে আর এতো ঝুঁকি সামলানো সম্ভব নয়…বিষয়টি আমাদের সকলের জন্যই অত্যন্ত বিপদজনক। দুর্ভাবনায় খাজানসারার চোখা নাকটি প্রায় প্রকম্পিত হচ্ছিলো।
সেলিম সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে জানে ভবিষ্যতে তাকে আরো অভিসার করতে হবে। সে আকবরের চোখে ধূলো দেবার নতুন নতুন বুদ্ধি উদ্ভাবন করবে। এটা নাও। কিন্তু মনে রেখো, ব্যর্থ হলে চলবে না। সেলিম খাজানসারার হাতে মোহর ভর্তি একটি থলে চালান করলো। আমি তোমাদের অপেক্ষায় থাকবো।
সেই রাতে, নদীতীরের কোমল ছায়ার মধ্য দিয়ে নল-খাগড়ার জঙ্গল এবং অন্যান্য ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে সেলিম ভগ্নপটির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। জায়গাটি এক সময় নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর ছিলো। বর্তমানে সেখানে সরু সরু স্তম্ভ এবং ভগ্নগম্বুজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেলিম একটি তেলের প্রদীপ জ্বাললো, আবছা আলোতে উল্টে পড়ে থাকা একটি প্রস্তর মূর্তি তার নজরে পড়লো। সেটি সম্ভবত কোনো হিন্দু দেবী বা নর্তকীর মূর্তি, অলংকার ব্যতীত সেটার দেহে আর কোনো আচ্ছাদন নেই, আকর্ষণীয় হাত পা গুলিতে কোনো উচ্ছল নৃত্যের মুদ্রা বিধৃত হয়ে রয়েছে। সেটা দেখে তার আনারকলির ছিপছিপে গড়নের পূর্ণ শরীরের কথা মনে পড়ে গেলো এবং সে যতরকম দেহভঙ্গীমা করতে পারে। সেলিমের হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হলো।
