মোমবাতির প্রকম্পিত আলোতেও আনারকলির দৈহিক বৈশিষ্টগুলি স্পষ্ট ভাবে প্রত্যক্ষ করার মতো নিকটে সেলিম অবস্থান করছিলো। তার মুখমণ্ডল ডিম্বাকৃতি এবং থুতনিতে চিড় রয়েছে, নাকটি ছোট কিন্তু খাড়া। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় তার চোখ দুটি, যেমনটা সেলিম আগে কখনোও দেখেনি। সেগুলি গাঢ় নীল এবং বেগুনির মধ্যবর্তী কোনো রঙ সম্বলিত। মেয়েটির উপর পতিত তার পিতার অনুরাগী এবং পরিতৃপ্ত দৃষ্টিবাণও সেলিমের চোখ এড়ালো না। সেলিমের নিজ হৃৎপিণ্ডটি প্রচণ্ড গতিতে ধুকপুক করছে এবং তার মুখের ভিতরটা শুকিয়ে গেছে। আনারকলিকে তার পেতেই হবে, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই…
*
এতে অনেক ঝুঁকি রয়েছে জাহাপনা…আনারকলি বর্তমানে আপনার পিতার সবচেয়ে প্রিয় রক্ষিতা। জানাজানি হয়ে গেলে তাকে এবং আমাকে হাতির পায়ের নিচে মৃত্যুবরণ করতে হবে অথবা এর চেয়েও খারাপ কিছু ঘটতে পারে। গত সাত বছর ধরে আমি হেরেমের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত আছি, এর আগে আমাকে কেউ এমন প্রস্তাব দেয়নি। হেরেমের খাজানসারা, ছোটখাট গড়নের পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা নাক বিশিষ্ট একজন বৃদ্ধা, তার চেহারায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। সেলিম লক্ষ্য করলো তার কমে আসা পাকা চুলের নিচে কপালের ডান পাশের একটি শিরার সংকোচন সম্প্রসারণ ঘটছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাকে কিছুটা প্রলুব্ধও মনে হলো।
এর জন্য উপযুক্ত মূল্য দিতে আমি প্রস্তুত। তুমি যা চাইবে তাই দেবো। সেলিম তার জোব্বার ভিতর হাত ঢুকিয়ে তার গলায় চামড়ার সরু ফালির সাহায্যে ঝুলিয়ে রাখা একটি রেশমের থলে বের করে আনলো। থলেটির মুখ আলগা করে সে সেটার ভিতর থেকে একটি পদ্মরাগমণি(রুবি) বের করে আনলো এবং তার পাশের হস্তি-আস্তাবলের দেয়ালের ফোঁকরে রাখা তেলের প্রদীপটির আলোতে সেটিকে উঁচু করে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে অকর্তিত রত্নটির উজ্জ্বল দ্যুতি বিচ্ছুরিত হলো। এটি আমার অধিকারে থাকা সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন- এর মূল্য এক হাজার সোনার মোহর। আমার নির্দেশ মতো কাজ করলে এটি তোমার হবে। তুমি এবং তোমার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে ধনী থাকবে।
কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব জাঁহাপনা? খাজানসারার চোখ দুটি রত্নটির দিকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হয়ে আছে, সে চোখ সরাতে পারছে না। সম্রাট ব্যতীত আর কারো হেরেমে প্রবেশের অনুমতি নেই।
তুমি বাবার হেরেমের তত্ত্বাবধায়ক এবং সব সময় সেখানে যাওয়া আসা করো। তুমি তোমার একজন পরিচারিকার ছদ্মবেশে আনারকলিকে লুকিয়ে বের করে আনতে পার। রক্ষীরা তোমাকে সন্দেহ করবে না।
আমি ঠিক নিশ্চিত নই জাহাপনা… খাজানসারা করুণ স্বরে বললো। সম্রাট তাকে সবসময় ডেকে পাঠান…।
আজ থেকে তিন দিন পর আমার বাবা একটি দীর্ঘ শিকার অভিযানে যাবেন। তিনি রওনা হওয়ার পর ঐ দিন রাতে তুমি আনারকলিকে আমার কাছে নিয়ে এসো, তাহলে এই পদ্মরাগমণিটি তোমার হবে। সেলিম উত্তরের জন্য অপেক্ষা করার সময় রত্নটি সামান্য ঘুরালো এবং সেটির মধ্যভাগ আগুনের মতো আলোক বিচ্ছুরণ করলো। খাজানসারা তার ঠোঁট কামড়ে ধরলো, কিন্তু তারপর মনে হলো সে তার মনস্থির করে ফেলেছে। ঠিক আছে, আমি আপনার কথা মতোই কাজ করবো। নিজের কালো শালটি দিয়ে মাথা ঢেকে দ্রুত সে হাতিশালের পেছনে অবস্থিত নির্জন জায়গাটি ত্যাগ করলো এবং অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।
*
আকবরের শিকারে যাত্রার পূর্বের দিনগুলি সেলিমের জন্য খুব ধীরে কাটতে লাগলো। আনারকলি ব্যতীত অন্য কোনো চিন্তা তার মাথায় খেলছে না সেই নীলচে বেগুনি চোখ, সেই সোনালী চুল। মেয়েটি নিজেই একটি রত্নের মতো, কিন্তু তা নরম জীবন্ত রক্তমাংসে গড়া, কঠিন পাথরে নয়। সেলিমের মনে হচ্ছিলো আকবর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন, কিন্তু তৃতীয় দিন ভোর বেলায় সিংহদ্বারকে প্রকম্পিত করা ঢাকের শব্দের সঙ্গে আকবর আবুল ফজল এবং আরো কয়েক জন ঘনিষ্ট সফর সঙ্গী নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেন। আকবর তিন সপ্তাহ ব্যাপী সফরে থাকার পরিকল্পনা করেছেন। ফলে তার পিছু পিছু যে শোভাযাত্রাটি অগ্রসর হলো তাতে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে পঞ্চাশটি ষাড় টানা গাড়ি যাতে রয়েছে। তাবু, রান্নার তৈজসপত্র, পরিধেয় পোশাকের বাক্স, তীর-ধনুক এবং গাদাবন্দুক। সেই সঙ্গে রয়েছে রক্ষীদল, শিকারী ও খেদাড়ে। তারা অগ্রসর হওয়ার সময় যে সাদা ধূলার মেঘ সৃষ্টি হলো তা মিছিলটি শহর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হলো।
সেই রাতে সেলিম তার ব্যক্তিগত কক্ষে অপেক্ষা করছিলো। কক্ষের ভিতরে সূর্যাস্তের পর পরিচারকরা যে মোমবাতি জ্বালিয়ে গেছে সেগুলি জ্বলতে জ্বলতে অর্ধেক আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে সমগ্র প্রাসাদ জুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। অবশেষে মধ্যরাত অতিক্রান্ত হওয়ার এক ঘন্টা পরে সে তার কক্ষের দরজায় হালকা টোকা পড়ার শব্দ পেলো।
জাহাপনা। সে সেলিমের একজন দ্বাররক্ষী, তার সারা মুখে নিদ্রাচ্ছন্নতা বিরাজ করছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই মাত্র তাকে কেউ ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে। আপনার কাছে দুজন মহিলা এসেছেন। সেলিম তার রক্ষীদের আগেই জানিয়ে রেখেছিলো যে বাজার থেকে তার কাছে একটি মেয়ে আসবে। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে, ফলে রক্ষীরা বিষয়টি আলাদা দৃষ্টিতে দেখছে না।
