ভোজসভার অগ্রগতির মধ্যে বার বার সেলিমের ক্ষুব্ধ দৃষ্টি আকবরের ঝলমলে অবয়বের উপর নিবদ্ধ হচ্ছিলো। গোয়ালিয়রের খ্যাতিমান বাজিয়েরা তাদের বাঁশিতে এবং তার বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্রে নরম মোহনীয় সুর মুছনা সৃষ্টি করছে। কয়েক মিনিট পর পর কোর্চিরা সম্রাটকে নওরোজের উপহার দিতে ইচ্ছুক সভাসদদের পথ দেখিয়ে তার কাছে নিয়ে যাচ্ছে, বেয়ারাগণ বারকোশে সাজিয়ে আরো খাদ্যদ্রব্য নিয়ে এসে টেবিলে পরিবেশন করছে। সেলিম মেঘ মুক্ত জ্যোৎস্না ঝরা রাতের আকাশের দিকে তাকালো। কখনো কখনো এ ধরনের ভোজসভাগুলি ভোর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সে মনে মনে ভাবলো কতো তাড়াতাড়ি সে এই কোলাহল থেকে সরে পড়তে পারবে।
বাজিয়েরা তাদের বাজনা থামিয়ে বাদ্যযন্ত্রগুলি একপাশে নামিয়ে রেখে নুয়ে পড়ে আকবরকে কুর্ণিশ করলো। নিশ্চয়ই অন্য কোনো বিনোদনের সময় উপস্থিত হয়েছে, সেলিম ভাবলো। সেটা আগুনখেকো বা দড়িবাওয়া বাজিকরদের কসরৎ হতে পারে কিম্বা একই খাঁচায় ছেড়ে দেয়া বন্যপ্রাণী যুগলের লড়াই।
আকবর উঠে দাঁড়ালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে উঠানটিতে নৈশব্দ নেমে এলো। আজকের রাত আমাদের নওরোজ উৎসবের শীর্ষ ক্ষণ। যদিও ইতোমধ্যে আমরা বহু রত্ন ও মণিমাণিক্যের উপহার আদান প্রদান করা সম্পন্ন করেছি, আমার কাছে একটি অমূল্য রত্ন রয়েছে যা অল্প সময়ের জন্য আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই। দুই মাস আগে তুরস্কের সুলতান আমাকে বিরল সৌন্দর্য এবং দক্ষতার অধিকারী একজন ইটালীয় নর্তকী পাঠিয়েছেন। ইটালী দেশটি আমাদের দেশ থেকে বহু দূরে অবস্থিত। আমি মেয়েটির নাম দিয়েছি আনারকলি যার অর্থ ডালিমের প্রস্ফুটন। আকবর তাঁর পাশে দাঁড়ানো পরিচারকটিকে আদেশ দিলেন, আনারকলিকে হাজির হতে বলো।
এমন কি আকবর যখন তার আসনে বসে পড়েছেন, তখনো নৈশব্দ বজায় রইলো, অতিথিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, তাদের সকলের দৃষ্টি কৌতূহলে উজ্জ্বল। সেলিমের মাঝেও ঔৎসুক্য দানা বেধে উঠলো এবং সে আরো কিছুক্ষণ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। ইতোপূর্বে সে কেবল ইউরোপীয় রমনীদের অঙ্কিত চিত্র দেখেছে, পরিব্রাজকগণ সেগুলি তার বাবাকে উপহার হিসেবে দিয়েছে। অবশ্য সে জেসুইটদের মুখে ইটালীর কথা শুনেছে, তাঁদের কেউ কেউ সেখানে জন্ম গ্রহণ করেছে। কিন্তু সে দেশের বিলাস-ব্যসন কিম্বা নারীদের সম্পর্কে গোঁড়া ক্যাথলিক বিশ্বাসের অনুসারী জেসুইটরা তাকে কিছুই বলেনি।
সেলিম তার বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলো তিনি মুখে সন্তুষ্টি এবং আত্মতৃপ্তির সূক্ষ্মহাসি নিয়ে উপস্থিত অতিথিদের জল্পনা-কল্পনার মৃদু গুঞ্জন শ্রবণ করছেন। ওদিকে পরিচারকগণ আগেই সমগ্র উঠান জুড়ে বিছানো পশমের সূক্ষ্ম গালিচার উপর নতুন করে পারসিক শতরঞ্জি বিছাতে ব্যস্ত। শতরঞ্জি বিছানোর কাজ শেষ হতেই অন্য ভৃত্যরা রাজকীয় আগরবাতিদান নিয়ে সারা উঠানময় ছুটোছুটি করে এক স্বপ্নীল সুগন্ধী ধূম্রজাল সৃষ্টি করলো যার মধ্য দিয়ে সেলিম আকবরকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলো না। হঠাৎ আকবরের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে আরেক দল পরিচারক এগিয়ে এসে উঠানে প্রজ্জ্বলিত সকল মোমবাতি নিভিয়ে দিলো। হালকা সুগন্ধে আচ্ছাদিত অন্ধকারে কেউ টু শব্দ করছে না। তারপর, পূর্বের আকস্মিকতাতেই মোমবাতিগুলি আবার প্রজ্জ্বলিত করা হলো এবং উঠানের কেন্দ্রে ফিকে হয়ে আসা ধোঁয়ার মাঝে আনারকলিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো। একটি অর্ধস্বচ্ছ ওড়নায় তার দেহ কোমরের নিচ পর্যন্ত আচ্ছাদিত যা তার পূর্ণস্তন যুগল এবং সমৃদ্ধ নিতম্বকে আড়াল করার পরিবর্তে আরো দর্শনীয় করে তুলেছে। তার ঋজু মস্তকে একটি মুক্তাখচিত বৃত্তাকার সোনার অলঙ্কার শোভা পাচ্ছে যা ওড়নাটিকে আটকে রেখেছে।
নর্তকীটি তার দুবাহু উপরে তুললো এবং সমগ্র দেহ দোলাতে আরম্ভ করলো। তার দেহের সর্পিল গতির সঙ্গে কোনো বাদ্যযন্ত্রের সহযোগীতা নেই। কেবল দুহাতের কব্জিতে পড়া ভারি চুড়িগুলির সংঘর্ষে সৃষ্ট মূৰ্ছনা এবং নুপুরের কিন্নরই তার সঙ্গী। তার নড়াচড়া আরো মুক্ত এবং বুনো রূপ ধারণ করতে লাগলো। তার মস্তক এক অপরিচিত শৈল্পীক ভঙ্গীমায় এদিক ওদিক কাত হতে লাগলো এবং এক সময় সে ঘুরতে শুরু করলো; স্তনযুগল প্রকম্পিত হচ্ছে, নগ্ন পা দুটি তীব্র বেগে শতরঞ্জিতে আঘাত করছে। সেলিম অন্য অতিথিদের মতোই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। প্রথমে তার বিপরীত দিকে বসে থাকা একজন তারপর আরেকজন, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে টেবিলে আঘাত করে তাল দিতে শুরু করলো। টেবিল চাপড়ানোর শব্দ আরো ব্যাপকতা লাভ করলো যখন আনারকলি আরো দ্রুতবেগে ঘুরতে লাগলো, তার দুবাহু দুদিকে প্রসারিত। তারপর একটি চিৎকারের সঙ্গে সে তার ওড়নাটি খুলে ছুঁড়ে ফেললো।
সেই মুহূর্তে সম্মিলিত শ্বাস টানার শব্দ পাওয়া গেলো। সেটা কেবল তার নিখুঁত গড়নের আকর্ষণীয় দেহের জন্যেই নয় যা এই মুহূর্তে প্রায় নগ্ন। বর্তমানে তার দেহে অবশিষ্ট রয়েছে আটসাট রত্নখচিত একটি কাঁচুলি ও প্রায় স্বচ্ছ মসলিনের পাজামা। দর্শকদের শ্বাস টানার আরেকটি উপলক্ষ্য তার চুল। চুলগুলি ফ্যাকাশে সোনালী বর্ণের এবং কোমর পর্যন্ত লম্বিত। চুল গুলি একরাশ সোনালী উজ্জ্বলতা নিয়ে চার দিকে উড়তে লাগলো যখন তার ঘুর্ণন অব্যাহত থাকলো। হঠাৎ নাটকীয় ভাবে মেয়েটি থেমে গেলো। তার ঠোঁটে মিষ্টি হাসি লেগে রয়েছে, যে উত্তেজনা তার নৃত্যকলা দর্শকদের মাঝে সৃষ্টি করছে সে বিষয়ে সে সম্পূর্ণ অবহিত। তারপর মেয়েটি মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়ে ধীরে আকবরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো এবং দুবার মাথা ঝাঁকালো। এর ফলে প্রথমে তার ভুবন ভুলানো চুলের গুচ্ছ তার দেহের সম্মুখে আছড়ে পড়ে তার বক্ষযুগল আবৃত করলো এবং পুনরায় পিছনে পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়লো। তারপর সে সম্রাটের দিকে দুবাহু প্রসারিত করে পিছন দিকে ঝুঁকতে লাগলো, এতে তার নমনীয় মেরুদণ্ড ধনুকের মতো পিছন দিকে বেঁকে গেলো এবং এক সময় তার মাথাটি শতরঞ্জি স্পর্শ করলো।
