প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হয় উটের দৌড়, হাতির লড়াই, নাচ-গান, আতশবাজী নিক্ষেপ এবং দৈহিক কসরত, আকবরের অনুগত সেনাপতি ও সভাসদদের রাশি রাশি অর্থ প্রদান এবং নতুন সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। বিগত রাত গুলিতে মহামান্য সম্রাট বিভিন্ন উচ্চপদস্থ অনুগামীর অতিথি হয়েছেন। কিন্তু আজ রাতের ভোজ উৎসব সম্রাটের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে তাঁর বিশেষ আস্থাভাজনদের সম্মানে যা নিশ্চিত ভাবেই অন্য সব আয়োজনকে অতিক্রম করবে। অতিথিগণ চুনি ও পান্না খচিত জেডপাথরের পাত্র থেকে পান করবেন। সেলিম একটি বালুপাথর নির্মিত স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, দেখছে সৌভাগ্যবান আস্থাভাজনদের কেউ কেউ উপস্থিত হওয়া শুরু করেছে। তাঁদের চকচকে দৃষ্টি মহামূল্যবান পানপাত্রগুলির উপর নিবদ্ধ, সন্দেহ নেই মনে মনে হিসাব করছে উৎসব শেষে সেগুলি তাদেরকে উপহার স্বরূপ প্রদান করা হবে কি না। উঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে সোনার কাপড়ে ঢাকা মঞ্চটি সবুজ মখমল এবং মুক্তার ঝালর বিশিষ্ট শামিয়ানার নিচে স্থাপিত হয়েছে। মঞ্চের নিচু সিংহাসনটিতে আকবর আসন গ্রহণ করবেন।
নওরোজ উৎসবের সময় বাবুর্চিদের বিশ্রামের সময় থাকে না। তারা ভোর বেলা থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মুরগী ও অন্যান্য সুস্বাদু পাখি এবং আস্ত ভেড়া ধাতব শলাকায় গেথে অগুনের উপর ঝলসানো হচ্ছে, তাতে যোগ করা হয়েছে জাফরান, লবঙ্গের নির্যাস, জিরা, ঘি এবং আরো বহু প্রকার মসলা। বাবুর্চিরা যখন শলাকাগুলি ঘুরাচ্ছে তখন মাংস ও মসলার মিশ্র উপাদেয় এবং রসনারোচক ঘ্রাণে চারদিকের বাতাস ভরে উঠছে। অল্প সময় পরেই তিনটি শিঙ্গার সম্মিলিত ধ্বনি মহামান্য সম্রাটের আগমন বার্তা জানান দিলো। সেলিম দূর থেকে পিতার জাঁকজমকপূর্ণ আগমন প্রত্যক্ষ করতে লাগলো। আকবর এগিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত অতিথিগণ তাঁকে ঝুঁকে সম্মান প্রদর্শন করছে, অনেকটা পাহাড়ের ঢালে জন্মে থাকা কাশ্মীরি ফুলগাছের বাতাসে নুয়ে পড়ার মতো। স্বয়ং তৈমুরকেও হয়তো কখনো এমন অভিজাত প্রেক্ষাপটে দেখা যায়নি। ব্যাপক বিস্তৃত সাম্রাজ্যের মহামান্য সম্রাট তার চোখ ধাঁধানো মহিমা নিয়ে মঞ্চে আসন গ্রহণ করলেন। মঞ্চের নিচে আকবরের সিংহাসনের ডান দিকে যে টেবিলটি পাতা হয়েছে সেটা সেলিম এবং দানিয়েলের জন্য। এর বরাবর বাম দিকে পাতা টেবিলটিতে বসবে আবুল ফজল এবং তার পিতা আব্দুল রহমান।
নিজের পিতাকে আসন গ্রহণ করতে দেখে সেলিম অতিথিদের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেলো দানিয়েলের পাশে নিজ আসনে বসার জন্য। ছোট করে মাথা ঝাঁকিয়ে আকবর তার উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দিলেন এবং তারপর তাঁর খাদ্যপরীক্ষকের দ্বারা সদ্য তাঁর সামনে রেখে যাওয়া খাবারের থালার দিকে দৃষ্টি দিলেন। সবসময় যেমনটা করেন তেমনি ভাবে আকবর পরিমিত আহার করলেন। সেলিম প্রায়ই শ্রবণ করে তাঁর বাবা, নরম এবং মোটা হয়ে যাওয়ার জন্য নিজ সেনাপতিদের সমালোচনা করছেন। ঐ রকম ভুড়ি নিয়ে তুমি কখনোই আমার দাদার সঙ্গে হিন্দুস্তান অভিযানের সময় ঘোড়া ছুটাতে পারতে না, তবে গোত্রপতিরা হয়তো তোমাকে একজন উত্তম ভাঁড় হিসেবে নিয়োগ দিত, অধুনা এভাবে তিনি তাঁর এক স্কুল তাজিক সেনাকর্তাকে তিরস্কার করেন যে তার তুলনায় কমপক্ষে পনেরো বছরের ছোট। যদিও আকবরের মুখে তখন হাসি ছিলো, কিন্তু সেলিম তাকে যতোটা জানে তাতে সে বুঝতে পারছিলো তিনি ঠাট্টা করেননি। এবং এর অল্প কয়েক দিন পরেই সেই সেনাকর্তাটিকে বাংলার কোনো এক সেনা শিবিরে বদলি করা হয় সম্ভবত সেখানকার জলাভূমি এবং মশা পরিবেষ্টিত পরিবেশে ঘর্মাক্ত হয়ে তার ভুড়িটি হ্রাস পাবে।
মাঝে মাঝে আকবরের অনুশীলন করা সেলিম দেখে। তলোয়ার দিয়ে আক্রমণ করা বা আক্রমণ প্রতিহত করা, প্রিয় সাদা পপলার কাঠে তৈরি ধনুকের ছিলা টেনে কবুতকে তীর বিদ্ধ করা, কুস্তি খেলা প্রভৃতি ক্রিড়ায় তিনি এখনো তার অর্ধেক বয়সের যোদ্ধাদের কুপোকাত করতে পারেন। সেলিম দানিয়েলকে এক পলক দেখলো, তার রক্তিম ও ঘর্মাক্ত মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সে সংযমী অবস্থায় ভোজসভায় আগমন করেনি। এছাড়াও তার প্রসারিত চোখের মণি এবং মুখের বোকা হাসি এটাও স্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে সে ওপিয়ামও সেবন করেছে। দানিয়েল তার তুলনায় অত্যন্ত দুর্বল, সেলিম ভাবলো। কিন্তু সে যখন দেখলো তার ভাই কম্পিত হাতে বহু চেষ্টা সত্ত্বেও নিজের পানপাত্রটি স্থিরভাবে ধরে রাখতে পারছে না তখন সে তার প্রতি করুণা অনুভব করলো। নেশাদ্রব্যের প্রলোভন সম্পর্কে সেলিমেরও অভিজ্ঞতা রয়েছে। মাঝে মাঝে হতাশার বশবর্তী হয়ে সেও অতিরিক্ত মদ্যপান করেছে; গাঁজা, ভাং বা ওপিয়ামের সাহায্যে নিজের স্বপ্নপূরণ না হওয়ার কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা কদাচিৎ। সে নিজের দেহ এবং মনকে সর্বদা ধারালো রাখার চেষ্টা করেছে এই ভেবে যে যদি হঠাৎ তার পিতা তাকে সেনাপতি বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করেন।
তবে বিলাসিতা এবং উপভোগ ব্যতীত দানিয়েলের মনে অন্য কোনো ভাবনা নেই। অন্যদিকে মালওয়া এবং গুজরাট থেকে সেলিমের কানে যে তথ্য এসেছে তা হলো মুরাদের মদ্যপানের প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। যে পদটি সেলিম আকাঙ্ক্ষা করেছিলো সেটা এতো অনায়াসে লাভ করা সত্ত্বেও মুরাদ আকবরকে সন্তুষ্ট করার সব সুযোগ হেলায় নষ্ট করছে। সেলিম এখনো মনে প্রাণে বিশ্বাস করে প্রাদেশিক প্রশাসকের পদটির জন্য সেই অধিক উপযুক্ত ছিলো। কিন্তু তার পিতা এবং আবুল ফজল তাকে এভাবে বঞ্চিত করলো কেনো? সে তার সৎভাইদের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম পুরুষ এবং তার বাবার মতোই সাহসী। কিন্তু আকবর তাকে মূল্যায়ন করতে চাচ্ছেন না কেনো?
