খুররমের শিশুসুলভ দৃষ্টিকে দূর্গের আকর্ষণীয়তা খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনি। আপনি কারিগরদের যা করতে বলেছেন তারা ঠিক তাই করেছে দাদু।
আকবর তার মাথাটি পেছন দিকে হেলিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন। তোমাকে সন্তুষ্ট করা কঠিন; তবে এ ধরনের বৈশিষ্ট একজন যুবরাজের জন্য যথার্থ। কিন্তু আমার বিশ্বাস আমি তোমাকে ঠিকই সন্তুষ্ট করতে পারবো। আকবর তার রেশমের জোব্বা এবং এর নিচে পরিহিত সূক্ষ্ম মসলিনের পিরানটি খুলে ফেললেন। বয়স হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শরীরের মাংসপেশী গুলি এখনোও মজবুত, কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত দেহের বাধুনী টানটান অনেকটা তার অর্ধেক বয়সী কোনো পুরুষের অনুরূপ। তোমরা দুজন, এদিকে এসো, আকবর উচ্চ স্বরে তাঁর দুজন তরুণ দেহরক্ষীকে কাছে ডাকলেন। তারা দুজন অবাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকালো, তারপর দ্রুত এগিয়ে এলো। তোমাদের অস্ত্র রেখে আমার মতো খালি গা হও।
লোক দুজন তাৎক্ষণিক ভাবে আদেশ পালন করলো। তার বাবা কি করছেন? সেলিম ভাবলো। উপস্থিত সকলে সপ্রশংস দৃষ্টিতে সম্রাটের দিকে তাকাচ্ছিল কিন্তু আকবর তখন দাঁত বের করে হাসছেন। আমার আরো কাছে এসো, আমি তোমাদের ভালো করে পরখ করতে চাই। দুই তরুণ যখন আকবরের মুখোমুখী দাঁড়ালো, তিনি তাদের কাঁধ এবং বাহুর উপর হাত বুলালেন তাঁদের মাংসপেশীর দৃঢ়তা পরখ করার জন্য। খারাপ নয়, কিন্তু আরো লম্বা ও শক্তিশালী লোক হলে ভালো হতো। তারপর, কোনো পূর্বধারণা না দিয়েই, দুজনের মধ্যে যে রক্ষীটি বেশি লম্বা চওড়া তার পেটে তিনি প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিলেন। রক্ষীটি ওক শব্দ করে বেঁকে সামনে দিকে ঝুঁকে পড়লো, সে দুহাতে তার পেট চেপে ধরেছে এবং জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। তোমাকে আরো শক্ত হতে হবে। তোমার বাড়ি কোথায়?
দিল্লী জাঁহাপনা, যন্ত্রণায় কাতর রক্ষীটি কোনো রকমে মুখ ফুটে বললো।
তুমি যদি পুরানো মোগল গোত্রগুলির একজন সদস্য হতে তাহলে এর থেকে দ্বিগুণ শক্তিশালি ঘুষি সহ্য করতে পারতে। এবার দেখো আমি নিজে কোনো ধাতুতে গড়া। আকবর এগিয়ে এসে তরুণটির কোমর নিজের বাম বাহুতে পেচিয়ে ধরে বোগলদাবা করে মাটি থেকে তুলে নিলেন। নিজ সামর্থে সন্তুষ্ট হয়ে রক্ষীটির পা আবার মাটি স্পর্শ করার সুযোগ দিলেন। তুমি, আমার ডান পাশে এসো, তিনি দ্বিতীয় তরুণটিকে আদেশ দিলেন, এক মুহূর্ত পর দেখা গেলো সে আকবরের ডান বাহুর আবর্তে বগলদাবা হয়ে আছে। আকবর তার পা দুটি ইষৎ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস নিলেন এবং একত্রে দুজনকে মাটি থেকে তুলে ফেললেন।
খুররম বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো, কিন্তু আকবর থেমে থাকলেন না। তিনি রক্ষী দুজনকে শূন্যের উপর আরেকটু সুবিধাজনক ভাবে আকড়ে ধরলেন, তার দেহের মাংসপেশী এবং সাদা হয়ে উঠা যুদ্ধের ক্ষতগুলির মধ্যস্থিত শিরাগুলি ফুলে উঠলো। তারপর তিনি খাড়া সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে দূর্গ প্রাচীরের দিকে উঠতে লাগলেন। দাঁড়িয়ে আছো কেনো খুররম? কাঁধের উপর দিয়ে মুখ ফিরিয়ে তিনি চিৎকার করে বললেন। আমার সাথে এসো। তৎক্ষণাৎ খুররম তার দাদার পিছন পিছন দৌড়াতে লাগলো। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সেলিম তাকে অনুসরণ করলো, তার পেছনে তার অন্য পুত্ররা এবং সভাসদগণ। বাবা পাগল হয়ে গেছেন, ছুটন্ত আকবরের দিকে তাকিয়ে সেলিম ভাবলো। এ সময় দুর্ঘটনা বশত একজন রক্ষীর মাথা সিঁড়িতে ঠুকে গেলো।
একগুয়ে ছুটন্ত মানুষটির দিকে তাকিয়ে সেলিম অনুমান করার চেষ্টা করলো আকবরের উদ্দেশ্য কি তিনি কি দূর্গের দেড় মাইল পরিধি এভাবে দৌড়াবেন? কিন্তু আত্মবিশ্বাসী আকবর কিছুটা ধীর গতিতে দৌড়ে দূর্গের সমগ্র পরিধি চক্কর মেরে যেখান থেকে আরম্ভ করেছিলেন সেই উঠানে ফিরে আসার আগপর্যন্ত একটুও টললেন না। তিনি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলেন এবং তাঁর গা বেয়ে দরদর করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিলো যখন থেমে তিনি দুই রক্ষীকে মুক্তি দিলেন। তাঁদের একজনের কপাল তখন দশাসই ভাবে ফুলে উঠেছে, কিন্তু তার মুখে ফুটে রয়েছে। গৌরবের হাসি।
জাহাপনা আপনি এখনো আপনার যৌবনের শক্তির অধিকারী, আবুল ফজল বললো, সেও আকবরের পিছু পিছু পুরো দূর্গ চক্কর দিয়েছে এবং সেলিম যা ভেবেছিলো তার চেয়ে কম পরিশ্রান্ত হয়েছে। তার স্কুল গড়ন দেখে বোঝার উপায় নেই সে এতোটা সক্ষম।
এবার বলো খুররম, এখন তোমার মন্তব্য কি? তোমাকে কি আমি সন্তুষ্ট করতে পেরেছি?
শিশুটি মাথা ঝাঁকালো। আপনি আমার জানা মতে সবচেয়ে শক্তিশালী মনুষ দাদু। কিন্তু আপনি কবে আমাকে আপনার মতো শিকার করা শিখাবেন যার প্রতিশ্রুতি আপনি আমাকে দিয়েছেন?
নিশ্চয়ই তুমি একদিন আমার মতো শিকার করা শিখবে। তোমাকে আমি আরো শিখাবো কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়। যখন তুমি আরেকটু বড় হবে তখন তুমি আমার যুদ্ধসভায় অংশ গ্রহণ করবে এবং আমি তোমাকে বিজয়াভিযানে নিয়ে যাবো। আমি একটি বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি, কিন্তু সবকিছু অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি আমার বংশধরদের একে আরো সমৃদ্ধশালী করে তোলার যোগ্যতা না থাকে। আর সেই শিক্ষা এতো অল্প বয়সে আরম্ভ করা যায় না।
৫.২ ডালিমের প্রস্ফুটন
২৩. ডালিমের প্রস্ফুটন
নওরোজের অষ্টম দিন, সবে মাত্র সূর্যাস্ত হয়েছে। মেষ রাশিতে সূর্যের আবির্ভাবের এই ক্ষণে নববর্ষের উৎসব উদযাপন করা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাজপ্রাসাদের উঠানে আবার ভোজ সভা আরম্ভ হবে। ভৃত্য এবং পরিচারকরা নিচু টেবিল গুলির চারদিকে বসার গদি এবং প্রজ্জলিত মোমবাতি স্থাপনে ব্যস্ত। সন্ধ্যার অনুষ্ঠান উপলক্ষে সেলিম উপযুক্ত সাজসজ্জা পরিধান করে নিরুৎসাহী দৃষ্টিতে আয়োজন প্রত্যক্ষ করছে। নওরোজের উৎসব একটি পারসিক প্রথা যা আকবর হিন্দুস্তানে প্রচলন করেছেন। সম্রাটের জন্মদিনের উৎসবের পরে এটাই সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং দৃষ্টিনন্দন অনুষ্ঠান, যার প্রতিটি পর্ব আকবর স্বয়ং পরিকল্পনা এবং প্রত্যক্ষ করেন।
